খুব খারাপ কাজ করেছিস, বললাম আমি–নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখা অত্যন্ত কুরুচি। তোকে মানায় না। যাক, দেখেই যখন ফেলেছিস, তখন আমাকে জড়াচ্ছিস কেন?
পৈতে পুড়িয়ে ব্রহ্মচারি হতে যাসনি, নরহরি। দোব হাটে হাঁড়ি ভেঙে। বিনয় মালাকার খুনি কিনা সেটা প্রমাণ করতে হবে। তুই ওর ঘরে যাবি জার্নালিস্ট সেজে। টিপিক্যাল জার্নালিস্টদের মতোই তুই কদাকার, পোশাকও সেই রকম, জার্নালিজম-ও করিস কিন্তু কল্কে পাসনি, তবে ইন্টারভিউ নিতে হয় কী করে তা জানিস। এই নে আমার ক্যামেরা। এক গেলাস জল এনে দিতে বলবি বিনয়কে–সেই গেলাস হাতসাফাই করে কাঁধের ঝোলায় ফেলবি ফিংগারপ্রিন্টের ফটো নিয়ে মিলিয়ে দেখব ক্ষুরের ফিংগার-প্রিন্টের সঙ্গে মিলে যায় কিনা। ক্ষুরের ফিংগারপ্রিন্ট কাল সকালেই পেয়ে যাব–সে লাইন করে রেখেছি। এলোমেলো খানকয়েক ফটো তুলবি। আর জেনে নিবি, সাহানার সঙ্গে আর যে তিনজন ছোকরা ঘুরঘুর করত, তাদের নাম কী? ধাম কোথায়?
আমি বললাম, বিনয় মালাকার সাহানাকে খুন করতে যাবে কেন? মোটিভ কী?
জেলাসি। এক মেয়ে চার নাগর–নিশ্চয় বিনয়কে কাট করতে চেয়েছিল সাহানা। তুই যা–এখন বিনয় একা আছে।
ফ্ল্যাটে আর কেউ থাকে নাকি?
ওর বউ থাকে। বাঁজা মেয়েছেলে। হস্তিনী বললেই চলে। কিন্তু রোজগার করে ভালো। নইলে এ ফ্ল্যাট কিনতে পারত না। অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে। নাম তার হাসি। দেখে হেসে ফেলিসনি যেন। যদিও এখন নেই। যা, যা।
প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়েই আমাকে বের করে দিল নারায়ণী।
.
হাসি কিন্তু ফ্ল্যাটেই ছিল। আমার ধারণা ছিল, সৃষ্টিকর্তা শুধু আমাকেই অমাবস্যার অন্ধকার দিয়ে গড়েছেন। এখন তো দেখছি হাসি মেয়েটাও কম যায় না। আমি তো মশাই হাঁ করে চেয়েছিলাম দরজা খোলার পরেই। বেল টিপতেই ইলেকট্রনিক মিউজিক শুরু হয়েছিল। শুনছিলাম আর তৈরি হচ্ছিলাম মানব-দানব বিনয় মালাকারের সঙ্গে মোলাকাতের জন্যে। তার বদলে দরজা খুলে দিল হাসি মালাকার স্বয়ং। রক্ষেকালীর বাচ্চা বললেই চলে। দাঁত ছরকুটে রয়েছে। মোটা-মোটা কাফ্রী ঠোঁট ফেটেফুটে রয়েছে। নাক থ্যাবড়া–প্লাস্টিক সার্জারি করে একটু উঁচু করা হয়েছে কিনা ঈশ্বর জানেন। উটকপালী নাম্বার ওয়ান। অনায়াসে ফুটবল খেলা যায় যেন সেই কপালে। চুল এতই পাতলা যে নেই বললেই চলে। চোখ গোল-গোল। মুখও গোল। কালো হাঁড়ি বলা চলে। পুরো বডিখানাও বোধহয় গোল। তাই গলা থেকে পা পর্যন্ত ম্যাক্সি দিয়ে ঢেকে রেখে দিয়েছে। গোটা অবয়ব থেকে এমনই একটা বিশ্রী ব্যাপার বিচ্ছুরিত হচ্ছে যে আমি হাসতে ভুলে গিয়ে হাঁ করে চেয়ে রইলাম। হাসিও আমার দিকে হাঁ করে চেয়ে রইল। সে-ও তো আমার মতো কদাকার পুরুষ কখনও দেখেনি।
দুজনেই যখন হাঁ, তখন পেছনে এসে দাঁড়াল মানব-দানব বিনয় মালাকার। দানবদেহী হলেও মানব তো বটে। চব্বিশ ঘণ্টাও হয়নি পরকীয়া প্রেমের পাত্রীটি নৃশংসভাবে নরকে প্রস্থান করেছে। তার প্রতিক্রিয়া চোখেমুখে ফুটে উঠেছে। উদ্বেগে কালো, উৎকণ্ঠায় টানটান।
আটঘাটের জল-খাওয়া ঘোড়েল মাল আমি। নিমেষে ম্যানেজ করে নিলাম নিজেকে। জার্নালিস্টের জয় যে সর্বত্র, তার আর একদফা প্রমাণ হাতেনাতে জুটিয়ে নিলাম। আমি যে কাগজের লোক এবং বিশেষ তদন্তে বেরিয়েছি–একথা জানামাত্র দুজনেরই মুখ আরও শুকিয়ে গেল। হাসিদেবী এমনিতেই কান্নাকান্না মুখ করেছিল। এখন তা শুকনো আমড়া হয়ে গেল। সাহানাকে ক্ষুর দিয়ে চেরা হয়েছে শুনে ইস্তক ভয়ে আধমরা হয়ে রয়েছে হাসিরাশি দেবী। (পুরো নামটা তাই রাশি রাশি হাসি-কে উলটে নিলেই হাসিরাশি!) ভীষণ টেনশন চলছে। মানব-দানব স্বামী তাকে অনেক বুঝিয়ে গেল আমার সামনেই। বাড়ি থেকে বেরোনো বন্ধ করলে কী হয়? সব কাজ চলুক। সবসময়ে ব্যালকনি থেকে ১২৩ নম্বর ফ্ল্যাটের দিকে তাকিয়ে থাকলে টেনশন তো বেড়েই চলবে। মডার্ন জ্যাক দ্য রিপার অন্তত এ ফ্ল্যাটে ঢুকবে না–শিরদাঁড়া টেনে ছিঁড়ে দেবে বিনয় মালাকার।
কিন্তু তাতেও স্বস্তি পাচ্ছে না হাসিরাশি দেবী। আরও শুনলাম, এই ফ্ল্যাটবাড়ির ঘরে-ঘরে আতঙ্ক ঢুকে গেছে। প্রত্যেকেই ম্যাজিক আই দিয়ে আগে দেখছে, কে বেল টিপছে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকেও ম্যাজিক আই দিয়ে দেখে নিয়েছে হাসিরাশি। চিনেছে বলেই তো দরজা খুলেছে। একটু আগেই আমি নিচের ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলাম তো? নিচের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে দেখছিলাম ১২৩ নম্বর ফ্ল্যাট। রূপসি মেয়েটার সঙ্গে যখন আমার এতই ভাব, তখন আমাকে দরজা খুলে দিতে ডর লাগেনি।
অথচ ভয়ডর কাকে বলে, এতদিন তা জানত না হাসিরাশি। ছেলেবেলা থেকেই ডানপিটে। বড়লোকের মেয়ে। কনভেন্টে পড়া মেয়ে। ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ, জার্মান ভাষা জানা মেয়ে। কাজ করে বিভিন্ন এমব্যাসিতে। ফরেনার এলে কলকাতা ঘুরিয়ে দেখায়। বাড়ি ফেরার সময়ের ঠিক নেই। কখনও মাঝরাতে, কখনও রাতভোরে। বাপ-মার অমতে বিনয়কে মালা পরিয়েছে বলে ত্যাজ্যকন্যা হয়েছে। তাতে ওর বয়ে গেল। রোজগারের টাকায় ফ্ল্যাট তো কিনেইছে। টাকাও জমিয়েছে। কাল সকালেই লাখ টাকার ইনসিওর করেছে নিজের নামে, রাতেই ফাঁই হল সাহানা। এর পর কে হবে? ভাবতে ভাবতেই একরাতেই খানকয়েক চুল পাকিয়ে ফেলেছে হাসিরাশি দেবী।
