আমি বললাম, সে কবিতাটা এই :
Im not a butcher,
Im not a yid,
Nor yet a foreign skipper,
But Im your own light-hearted friend,
Yours truly, Jack the Ripper.
নারায়ণী বললে, তোর গরিলা ব্রেনের শার্পনেস দেখে অবাক হয়ে যাচ্ছি। নরহরি, জ্যাক দ্য রিপার আত্মহত্যা করেছিল আজ থেকেঠিক একশো চার বছর আগে। মেয়েখুনের অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে সে নিশ্চয় ফের জন্ম নিয়েছে ধরাধামে–এবার এই কলকাতায়।
আমি গালে হাত দিয়ে বললাম, একদিক দিয়ে ভালোই করেছে। বড্ড এডস রোগ ছড়াচ্ছে। বেশ্যারা।
বেশ্যা নয়, ধরেছে বাড়ির বউদের।
সত্যিই আঁতকে উঠলাম–কটা খুন হয়েছে? কোথায়? কাগজে বেরোয়নি কেন?
হয়েছে আপাতত একটা। কাল রাতে। কাগজওয়ালারা এখনও খবর পায়নি। কাল ছিল শনিবার। কথায় আছে, শনিবারের মড়া দোসর চায়, তাই আরও মৃত্যু আসন্ন বলেই আমার বিশ্বাস। অবলা মেয়েদের এইভাবে যে খুন করে, আমিও তাকে খুন করব। তোকে শুধু একটা কাজ করতে হবে।
আমি বললাম, হয় তুই বেশি হুশিয়ার, না হয় বাতিকে ভুগছিস। আইবুড়ো থাকলে ও রোগ হয়। ধরে নিয়েছিস, জ্যাক দ্য রিপার নতুন জন্ম নিয়ে মেয়ে খুন শুরু করেছে। যেহেতু শনিবারে মড়া পড়েছে অতএব আরও খুন হবে। কিন্তু তোকে তো খুন করবে না। তুই বয়ে একার, শয়ে য-ফলা আকার নস, তুই কারও বউও নস, তোর ভয় কী?
নারায়ণী বললে, ব্যাপারটা আগে শোন। তারপর ফুট কাটিস। এই যে বাড়িটায় বসে আছিস, এটা ইংরেজি E অক্ষরের প্যাটার্নে তৈরি। এই কমপ্লেক্সে মোট ফ্ল্যাটের সংখ্যা ২৯৩। এত বড় ফ্ল্যাটবাড়ি গোটা ওয়েস্ট বেঙ্গলে আর নেই। এখানে ব্যবসা চলছে, ফ্যামিলি নিয়ে থাকাও হচ্ছে। এক ফ্ল্যাট থেকে আর এক ফ্ল্যাট দেখা যায়। ইচ্ছে করেই তা করা হয়েছে যাতে ২৯৩টা ফ্ল্যাট মালিকদের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই বিল্ডিংয়েরই ১২৩ নম্বর ফ্ল্যাটে মিসেস সাহানা সিকদারকে কাল রাতে জন্মান্তরিত জ্যাক দ্য রিপার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ক্ষুর চালিয়ে সরু-সরু করে ফালি করে রেখে গেছে। গলাও দু-টুকরো করেছে। শুধু রেপ করেনি। রক্তমাখা ক্ষুরখানা রেখে গেছে। কাঠের বাঁটে তার বুড়ো আঙুলের ছাপও পাওয়া গেছে।
সাহানা সিকদারের স্বামী তখন কোথায় ছিলেন? ছেলেমেয়ে?
স্বামী রয়েছেন ব্যাঙ্গালোরে–অফিস থেকে পাঠিয়েছে সেখানকার হেড-অফিসে–ফেরার কথা পনেরো দিন পর–কিন্তু খবর চলে গেছে। আজকের ফ্লাইটেই ফিরছেন। ওঁদের কোনও ছেলেমেয়ে নেই। সাহানার বয়স ছাব্বিশ। স্বামী সুজন সিকদার মাত্র দু-বছরের বড়। সাহানাকে আমি দেখেছি। খুব একটা আহামরি রূপসি নয়। হিংসে করে বলছি, ভাবিসনি যেন, সাহানার রং মাঝারি, অতিরিক্ত স্মোকিং-এর ফলে দাঁতে ছোপ পড়েছে, হাসলে চোখের কোণ আর ঠোঁটের কোণে চামড়া ইকড়িমিকড়িভাবে ভাঁজ খেয়ে যায়। স্বামীকে মাসের মধ্যে দিন পনেরো কলকাতার বাইরে থাকতেই হয়। তখন সাহানা একপাল পরপুরুষ নিয়ে গাড়ি নিয়ে বেরোয় মানে বেরোত। বাড়িতেও অনেক রাত পর্যন্ত হুল্লোড় চলত।
তুই জানলি কী করে?
হাসল নারায়ণী, হাজার হোক মেয়ে হয়ে জন্মেছি, কেচ্ছা জানবার কৌতূহল তো আছেই। এই ঘর থেকেই দেখা যায় ১২৩ নম্বর ফ্ল্যাট। আয় দেখাচ্ছি।
গদিচেয়ার ছেড়ে ওঠবার আগে বেঁকে গিয়ে, টেবিলের ড্রয়ার টেনে একটা বাইনোকুলার বের করল নারায়ণী। তারপর গেল পশ্চিম দিকের দেওয়ালের কাছে। এখানে কাঁচ নেই। ইটের দেওয়ালে সারি-সারি তাকে বিস্তর বই। সবই ক্রাইমের বই। খাড়াইভাবে রাখা বইয়ের ভিড়ের ওপর শুইয়ে রাখা হয়েছে ফ্রেডরিক ফোরসাইথ-এর লেখা দ্য নিগোসিয়েটর বইখানা। এই বইয়ের প্লট নকল করেই খুন করা হয়েছে রাজীব গান্ধীকে। বুঝলাম নারায়ণী বইটা ফের পড়ছিল।
আমি যখন বই দেখছি, নারায়ণী তখন তাক-ভর্তি দেওয়াল ধরে টানছে। কাঠের পাল্লার ওপর বই রাখায় দরজা দেখা যাচ্ছিল না। এখন তা খুলে গেল। এসে দাঁড়ালাম ব্যালকনিতে। চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে ফোকাস করে নিল নারায়ণী। তারপর আমার হাতে তুলে দিয়ে বললে, দ্যাখ।
১২৩ নম্বর ফ্ল্যাটের দরজা-জানলা সব বন্ধ।
নারায়ণী বললে, জানলা যখন ভোলা থাকত, তখন তো আমি দেখেছি ওদের কীর্তি। চারজনকে নিয়ে ফুর্তি করত সাহানা। পুলিশ তাদের খবর পাবে না। কারণ সাহানা আর নেই। প্রতিবেশীরা মুখ খুলবে বলে মনে হয় না–মার্ডার কেসে আন্দাজে মার্ডারারের নাম কেউ বলতে চায় না। সুজন সিকদারও জানে না, এই চারজন কে-কে। কিন্তু আমি চিনি এই চারজনের একজনকে।
এই বলে নারায়ণী আমাকে ঘরের ভেতর টেনে নিয়ে এল–তাকভর্তি পাল্লা বন্ধ করতে করতে বললে, ওই ফ্ল্যাটের ঠিক ওপরকার ফ্ল্যাটে সে থাকে।
তার নাম?
বিনয় মালাকার। ছবি আঁকতে জানে। কিন্তু রোজগার তেমন নেই। আমার নারায়ণী স্কেচ দেখে নিজে এসে আলাপ করে গেছিল–তাই আমি এই সময়ে লোকটার কাছে ঘেঁষতে চাই না। লম্বায় সে ছফুটের কাছাকাছি। আগের জন্মের জ্যাক দ্য রিপার ছিল বেশ ছিপছিপে সুশ্রী ছোকরা। বেশ্যাপ্রিয় পুরুষ। আর এই লোকটা মানুষ-দানব। চোখের তারা দেখলেই বুঝবি মেয়ে-পটানো চাহনিটা কি মারাত্মক। আমাকেও হিপনোটাইজ করতে চেয়েছিল। ওরকম চেহারা দেখলে সব মেয়েই ঢলে পড়ে। সাহানার দোষ কী। মাসের পনেরো দিন স্বামীছাড়া থাকা একটু কষ্টকর ব্যাপার বইকি। বিনয় ওই ফ্ল্যাটে প্রায় যেত। এক বিছানায় শুতেও দেখেছি।
