এসব কথা বলেছিল ওর তেরোতলার অফিসঘরে বসে। এইরকম খানদানি এলাকায় এরকম একটা ঘর ম্যানেজ করল কী করে, ভেবে অবাক হয়ে গেছিলাম। লিফট থেকে নেমেই বাঁ-হাতি দরজা। কালো কাঁচের পাল্লা। ভেনেসিয়ান ব্লাইন্ড দিয়ে ঢাকা। ওপরে কাঁচের ওপর সোনালি সুতো দিয়ে আঁকা ওর সেই নারায়ণী স্কেচ। তলায় কিছু লেখা নেই। আমি ইতিউতি তাকাচ্ছিলাম কলিংবেল এর বোতাম টিপব বলে, এমন সময় প্রায় কানের কাছে শুনলাম নারায়ণীর হাসি আর বিদ্রূপবচন, ওরে-ওরে মর্কট, চলে আয় ভেতরে, দরজা খোলাই আছে, হেলেদুলে আয় রে!
নারায়ণীর এরকম ফচকেমি আমার গা-সওয়া। তাই কিছু মনে করলাম না। পাল্লা ঠেলোম। খুলে গেল। ভেতরে ঢুকে ছেড়ে দিলাম, আপনিই বন্ধ হয়ে গেল। দেখলাম খাঁটি কাশ্মিরী কার্পেটে মোড়া একটা দারুণ ঘরে দাঁড়িয়ে আছি। এ ঘরের মেঝেতে কাপের্ট, দেওয়ালে কার্পেট, কড়িকাঠে কার্পেট। প্রকৃতই কার্পেটকক্ষ। নেই শুধু নারায়ণী। কেউই নেই।
শুনলাম আবার সেই খিলখিল হাসি আর বিচ্ছিরি ইয়ারকি, ওরে আয়, ওরে আয়, ওরে আয়দরজা ঠেলে চলে আয়!
তাকিয়ে দেখি, সামনে দরজার মতো কী একটা রয়েছে বটে, আমি তো ভেবেছিলাম পারস্যের কার্পেট। সোনালি হাতল চোখে পড়তেই সেটা আঁকড়ে ধরলাম। অমনি গোটা পাল্লাটা সাঁৎ করে বাঁ-দিকের দেওয়ালে ঢুকে গেল!
চমকে উঠেছিলাম। দরজার এরকম ব্যবহার আমি আশা করিনি।
তারপরেই দেখেছিলাম এই কাহিনির নায়িকা গোয়েন্দানী নারায়ণীকে (আমাকে নায়ক যদি মনে করে থাকেন, তাহলে মস্ত ভুল করলেন–আমি যে কী তাই আমি জানি না)।
নারায়ণী ওর ভুবন-ভোলানো হাসি হেসে আমার দিকে তাকিয়েছিল। এতদিন পরে দেখে আমার তাক লেগে গিয়েছিল। মেয়েদের একটু মেজে-ঘষে দিলে দেখতে আরও ভালো হয়। নারায়ণী কী দিয়ে মেজেছে নিজেকে? এরকম অপ্সরার মতো লাগছে কেন? কাঁচের ঘরের জেল্লার জন্যেও চেহারা হয়তো আরও খুলে গেছে। পাজামা পাঞ্জাবি পরা এই হাফ-গরিলা যে নিতান্তই বেমানান এখানে!
নারায়ণী বললে, নরহরি, তোর বাঁকা পা আরও বেঁকে গেছে। বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বলছে, তুই ঘাবড়ে গেছিস–মুখ যদিও নির্বিকার। বোস। এ ঘর আমি ম্যানেজ করেছি খোদ পুলিশ কমিশনারের কৃপায়–তাঁর একটা ছোট্ট উপকার করে দিয়েছিলাম। উনিই দরজার বাইরে টিভি ক্যামেরা বসিয়ে রেখেছেন–এই দ্যাখ স্ক্রিন–এখানে বসেই আমি দেখতে পাই এল কোন মক্কেল। কোড ল্যাঙ্গুয়েজটা ভুলে যাসনি দেখে আই অ্যাম গ্ল্যাড।
মেসবাড়ি থেকে টেলিফোনে ডেকে পাঠিয়েছিল নারায়ণী। তিনতলা বাড়িতে ফোন একটাই। ওর ফোন যখন গেছিল, আমি তখন আমার মাসিক ২৬২ টাকার তক্তপোশে শুয়ে দৈনিক গল্প পত্রিকা পড়ছিলাম। বেড়ে গল্প লেখে প্রতিদিন মনে হয় যেন টাটকা খবর। এমন সময়ে শুনলাম কে একটা মেয়েছেলে আমাকে ডাকছে।
মেসের চাকর এসেই দিয়ে গেল খবরটা। মেয়েছেলেদের পাতে পড়বার যোগ্য আমি নই, তা সে জানে। তাই মুচকি হাসল না।
লুঙ্গি সামলে নিয়ে গিয়ে রিসিভার তুলে নিয়ে যেই বলেছি হ্যালো, অমনি নারায়ণীর কোড ল্যাঙ্গুয়েজে কলকলিয়ে উঠেছিল খোদ নারায়ণীর কণ্ঠস্বর
রকারদ ইকেমাতো
সয়ে লেচ রেক টচ
রকারস রিহরন
রেমাতো ছিনেচি ছিনেচি।
একবার শুনেই শিহরণ বয়ে গেছিল শিরদাঁড়া দিয়ে। এ যে মদ্দানি নারায়ণীর পেটেন্ট ভাষা। বলেছিলাম, আর একবার হোক, আর একবার।
তখন নারায়ণী টেলিফোনের তারের মধ্যে দিয়ে যে হাসিখানা পাঠিয়েছিল, তা শুনলে (আমি গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। যে-কোনও মুনি-ঋষির শরীরে উত্তেজনা ঘটে যেত। আমি কিন্তু রইলাম নির্বিকার (জিনিসই আলাদা) এবং শুনলাম আজব ভাষার পুনরাবৃত্তি। মানেও করে নিলাম তক্ষুনি। নারায়ণী ছড়া কাটছে এইভাবে?
চিনেছি চিনেছি তোমারে
নরহরি সরকার
চট করে চলে এস
তোমাকেই দরকার।
ঠিকানা নিলাম। চলে এলাম এই তেরোতলার মুকুরমহলে।
.
আমি চেয়ার টেনে নিয়ে বসতেই নারায়ণী টেবিলের তলা দিয়ে নিজের পা দুখানা ছড়িয়ে দিল সামনে। শিরদাঁড়াটাকেও হড়কে নামিয়ে নিল পিঠ-উঁচু গদি চেয়ারের ওপর দিয়ে। কাঁধের হলুদ শাড়ির আঁচল খসে পড়ল হেঁচড়ানির ফলে। ওর তাতে ভ্রূক্ষেপ নেই।
আমি বললাম, আমাকে কি নাগর পেয়েছিস? ওইভাবে বুকের আঁচল খসালি কেন? খোলা বুক উঁচিয়ে বসাটা বেহায়া মেয়েদের সাজে।
ও বললে, তোকে আমি ছেলে বলেই মনে করি না। তাই তো এত ভালোবাসি।
আমিও বললাম, তোকেও আমি মেয়ে বলে মনে করি না, তাই তো এত কাছে আসি।
ও বললে, এটা আচ্ছায় জায়গা নয় কাজের জায়গা।
আমি বললাম, কী কাজ?
ও বললে, মন্টেগু জন ডুইট খুব সম্ভব কলকাতায় পুনর্জন্ম নিয়েছে। চিনিস মন্টেগুকে? গুড। স্কটল্যান্ডের সন্দেহ, এই ছোঁড়াই জ্যাক দ্য রিপার নাম নিয়ে লন্ডনের ইস্ট এন্ডে পরপর ছজন বেশ্যাকে খুন করে কেটে ছিঁড়ে ফালাফালা করেছিল। মাংস কেটে নিয়ে নিয়ে ছবি ঝোলানোর পেরেকে টাঙিয়ে রেখেছিল, নাড়িভুড়ি চেঁচে বের করে নিয়েছিল, হার্ট, কিডনি, ব্রেস্ট কেটে নিয়ে টেবিলের ওপর পাশাপাশি সাজিয়ে রেখেছিল, মুখ চিরে ফালাফালা করেছিল, নাক আর কান কেটে রেখেছিল, গলা কেটে দু-টুকরো করেছিল। কসাই-এর অধম হলেও ছিল তার কবিত্ববোধ। তার লেখা একটা কবিতা আজও রেখে দিয়েছে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড।
