জলপথে ভ্ৰমণবীরদের মুখে এরকম আস্ফালন ঢের-ঢের শুনেছি–আর এ তো বীরাঙ্গনা। কাজেই বিশ্বাস করতাম না একবর্ণও। তবে অবাক হয়ে যেতাম অকপট কথাবার্তা শুনে। মনের মধ্যে কোনও কপাট তো রাখেইনি লজ্জা-ফজ্জারও ধার ধারত না। সিগারেট টানতে টানতে কামসূত্র নিয়েও দিব্যি আড্ডা চালিয়ে গেছে। বাৎস্যায়ন মুনি কত রকম আসনের বর্ণনা দিয়ে গেছেন এবং কোনটা কোনদিক দিয়ে উৎকৃষ্ট, তার নিপুণ ব্যাখ্যা দিয়ে তাক লাগিয়ে দিত আমাদের। আমি আমার গরিলা-চোয়াল ঝুলিয়ে ফেলে তাজ্জব গলায় বলতাম, তুই তো বিয়েই করিসনি– এত খবর জানলি কী করে?
অমনি প্রাণখোলা হাসি হেসে নারায়ণী বলত, তুই কী করেছিস?
এই হল নারায়ণী। দেখলে মনে হয় মা লক্ষ্মীবাংলার বধু, মুখে তার মধু, নয়নে নীরব ভাষা। কিন্তু জমে গেলেই ঠেলা বুঝবেন। তখন সে জীবন্ত শতঘ্নী। মা দুর্গার রূপটা দেখেছিলাম পরে। ক্রমে-ক্রমে আসছি সে প্রসঙ্গে।
সে ব্যাপারে হোতা ছিলাম কিন্তু আমিই। গুচ্ছের বিলিতি বই পড়তাম। কলেজ স্ট্রিটের পুরোনো বইয়ের দোকান থেকে জলের দামে লোমহর্ষক রহস্য উপন্যাস কিনতাম। একদিন পড়লাম সাইমন টেম্পলারের কাহিনি। সেন্ট অর্থাৎ সন্ত নামে যে দুর্জনদের কাছে একটা বিভীষিকা। সমাজের দুগ্রহদের সে টাইট দিত আইন-ছাড়া পথে–রেখে যেত একটা স্কেচ।–সেন্ট-এর নিজের হাতে একটানে আঁকা দেহরেখা।
নারায়ণী বইটা আমার কাছ ছেকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছিল। দুদিন বাদে ফেরত দিল। সেই সঙ্গে দেখাল পেনসিলে আঁকা একটা স্কেচ।
স্কেচ দেখেই বুঝেছিলাম সেন্ট-এর প্রভাব ওর ওপর পড়েছে। নিজেও তাই বললে, নরহরি, এই হল আমার প্রতীক। সমাজের আঁচিলদের শায়েস্তা করব এই প্রতীক পাঠানোর পর।
আমার নামটাই এতক্ষণ বলা হয়নি। নরহরি সরকার। জাতে কায়স্থ। কিন্তু গরুর মাংসও খেয়েছি। শুওর আরও ভালো লাগে। ভালো লাগে নারায়ণীকেও। নারায়ণীও আমাকে দারুণ পছন্দ করে। কিন্তু তাই বলে যেন কেউ ভাববেন না আমরা প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি। ওসব ছেনালিপনা আমাদের মধ্যে নেই। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও একটা আড়াল থাকে সব কথা বলা যায় না; ভাইবোন আর বন্ধুবান্ধবীদের মধ্যেও রেখে ঢেকে কথা বলতে হয়। কিন্তু নরহরি আর নারায়ণীর মধ্যে কোনও কথাই আটকায় না। দুজনেই দুজনের কাছে দুটো তেপান্তরের মাঠ। তাই তো আমাদের জলপথের পথিক প্রকাশক বন্ধুটি আমাদের নাম দিয়েছেন নর-নারায়ণী।
.
আমি আগেই নিজের গাওনা গেয়ে নিচ্ছি এই কারণে, যে এর পর থেকে শুধু নারায়ণী স্তোত্রপাঠই করতে হবে। নারায়ণীর গায়ের রঙের সঙ্গে আমার গায়ের রঙের আশমান-জমিন ফারাক আছে, সে কথা আগেই লিখেছি। কালার কমপিটিশনে আমি দাঁড়কাককেও হারিয়ে দিতে পারি। উপরন্তু এই গরিলা-ফিগার। কাজের মধ্যে ভ্যারান্ডা ভাজা। ট্যাঙস-ট্যাঙস করে কলকাতায় চক্কর না মারলে আমার বেঁটে আর বাঁকা পা কটকট করে। পাঁচজনের চোখে আমি একটা পয়মাল। কিন্তু নিশ্চয় নারায়ণীর কাছে নয়। তাই সে একদিন আমাকে বলেছিল, নরহরি, আমি হব কলকাতায় প্রথম মেয়ে ডিটেকটিভ। আমি বলেছিলাম, তোকে কেটে ফেলবে, খুবলে-খুবলে খাবে, ধর্ষণ পর্যন্ত করে ফেলতে পারে। কলকাতায় দোগলাবাজদের তুই চিনিস না। নারায়ণী হেসে গড়িয়ে পড়ে বলেছিল, তুই সত্যিই আর জন্মে গরিলা ছিলিস। মানুষ মেয়েদের এখনও চিনতে পারিসনি। মেয়েদের বুদ্ধি, মেয়েদের হিসেব, মেয়েদের সাহস তোদের চেয়ে বেশি। ঘাটতি ছিল শুধু গায়ের জোরে। মার্শাল আর্ট শিখে সেদিকেও মেরে দিয়েছি। মেয়েদের সবচেয়ে বড় গুণটা কী বলতো? আমি বলেছিলাম, চোখ মারা। ভদ্রভাষায় কটাক্ষ। ও বলেছিল, তুই একটা গাধা। মেয়েদের মোক্ষম মারণাস্ত্র হল তাদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়। ইনটিউশন। এর সঙ্গে আমি আরও দু-চারটে বিদ্যে শিখে নিয়েছি। এক নম্বর হল বডি ল্যাঙ্গুয়েজ। যে-কোনও মানুষের হাত-পা-চোখ-মুখের ভঙ্গিমা দেখেই আঁচ করতে পারি তার মনের চেহারা এর জন্যে টেলিপ্যাথি জানার দরকার হয় না। এই সঙ্গে জানি আর একটা বিদ্যে। পৃথিবীর যে কোনও ভাষা একবার শুনেই উলটোদিক থেকে বলে যেতে পারি–বলার শব্দটাকেই শুধু নকল করি। এটা আমার কোড ল্যাঙ্গুয়েজ। নারায়ণী গোয়েন্দানীর সাংকেতিক ভাষা।
আমি বলেছিলাম, নারায়ণী গোয়েন্দানী। এটা একটা নাম হল?
ও বললে, মাই ডিয়ার হাফ-গরিলা, আমার এই অভিযানে তোকে মাঝে-মাঝে শাগরেদি করতে হবে। কেননা, তোর মতো ভিজে বেড়াল চট করে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার কোড ল্যাঙ্গুয়েজটা তোকে শিখে নিতে হবে। শত্রুদের সামনেই হয়তো এই ভাষায় কথা বলব–লোকে ভাববে ভয়ের চোটে আবোলতাবোল বকচি। ট্রেনিং এখুনি শুরু করছি নায়ন তাকিচ নিরীহ লাঞ্চ। কী বুঝলি?
আমার কানের মধ্যে ঝমঝমাঝম করে যেন একটা অজানা গানের পশলাবৃষ্টি হয়ে গেল। কিছু না বুঝে গজাল দাঁত বের করে হেসে ফেললাম। রেগে নিয়ে নারায়ণী বললে, তুই একটা আস্ত মর্কট। নায়ন তাকিচা নিরীহ লাঞ্চচ। শুধু শব্দ শুনে উলটোদিক বুঝতে পারছিস না? চঞ্চলা হরিণী চকিতা-নয়না। হল?
নারায়ণী কিন্তু এই ভাষা আমাকে শিখিয়ে ছেড়েছিল।
এর পর থেকেই নারায়ণীর সঙ্গে কলেজ স্ট্রিটের জলপথ জাহাজঘাটায় তেমন আর দেখাসাক্ষাৎ হত না। বেশ কিছুদিন যেন উবেই গেছিল। তারপর পরপর দুটো পিলেচমকানো ঘটনা ঘটিয়ে ছেড়েছিল এই কলকাতায় আর আশেপাশে। আক্কেল গুড়ুম করে ছেড়েছিল পুলিশমহল আর মুখোশধারী শয়তানদের। সে দুটো ব্যাপারে আমার কোনও হেল্প নেয়নি। বলেছিল, এখন হাত পাকাচ্ছি। ইনকাম ভালোই হচ্ছে। সমাজের বুকে বসে যারা গরিবদের রক্ত শুষে খাচ্ছে পুলিশ প্রোটেকশন নিয়ে তাদের রক্তমোক্ষণ করিয়ে দেওয়ার মধ্যে একটা চার্ম আছে। সেই রক্ত মানে বস্তাপচা কালো টাকা দিয়ে সর্বহারাদের উপকার করে যাচ্ছি। আমার একটু কমিশন রেখে দিচ্ছি অবশ্য। নইলে এসটাব্লিশমেন্ট চালাব কী করে।
