নারায়ণী তখন ওর দাঁতের ঝিলিক দেখিয়ে বলেছিল (দাঁত তো নয়, কোথায় লাগে সিংহলী মুক্তো), গালটা একটু চেটে দেখবেন?…
শুধু আমিই লজ্জায় লাল, মানে বেগুনি হয়ে গেছিলাম। (কারণ আমি কালো মহাদেশের মানুষদের মতোই তিমির বর্ণের অধিকারী)।
যাক সেই প্রথম পরিচয়ের কথা। নারায়ণী গোয়েন্দানীর অভিনব কীর্তিকলাপ আমাকে এমনই অভিভূত করেছে যে, তার সর্বশেষ কীর্তিটি সবিস্তারে আপনাদের সমীপে উপস্থিত করার অনুমতি প্রার্থনা করছি।
আবেদন মঞ্জুর? তাহলে শুনুন!
.
নারায়ণীর কথা লিখতে গেলে আমার কথাও একটু বলতে হবে। আমি লোকটা একেবারেই ছাপোষা। আমার এমন কিছু এলেম নেই যে পাঁচজনের মধ্যে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারি। অথচ চেষ্টার কসুর করিনি। আমার মা-বাবা পটকে গেছে কোনকালে; ভাইবোন আত্মীয়স্বজন কেউ নেই। আমি থাকি মুচিপাড়ার নেবুতলা পার্কের কোণের মেসবাড়িতে। আমি চেষ্টা করেছিলাম ফিল্ম ডিরেক্টর হতে, সাংবাদিক হতে এবং লেখক হতে–যেগুলো হতে গেলে মগজের পুঁজি বেশি দরকার হয় না–পকেটে টাকা না থাকলে হওয়া যায় (এর ব্যতিক্রম আছে নিশ্চয়–আমি সে দলে পড়ি না)। এত ঘাটে জল খাওয়ার ফলে আমার যোগাযোগ অনেক সাদা বাংলায়, আমার আড্ডাখানার শেষ নেই। ছেলেদের সঙ্গে যেমন রকবাজি করি, ঠিক তেমনি মেয়েদের সঙ্গেও গুলতানি চালাই। সবাই আমাকে পছন্দ করে। ফিল্ম লাইন আর লেখাজোখার লাইনে একটা ম্যাজিক আছে। এ লাইন যে ছুঁয়ে থাকে, তাকেই সবাই ম্যাজিশিয়ান মনে করে।
আমাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ করে মেয়েরা। আমাকে দেখলেই দাঁত বের করে হেসে গায়ে ঢলে পড়ে কতরকম রগড়ই না করে। কারণ কী জানেন? আমি নির্বিষ। আমি কুৎসিত। গরিলা আর মানুষের মধ্যে আমি একটা মিসিং লিঙ্ক। আমার হাইট সাড়ে চার ফুট। গুহামানবদের কপাল যেরকম কার্নিশের মতো সামনে ঝুঁকে থাকত, আমার বিরাট কপাল ঠিক সেইভাবে অনেকখানি এগিয়ে এসে দুটো চোখের ওপর ঝুলে থাকে। কার্নিশ থেকে লম্বা-লম্বা ভুরুর নোম যখন ঝুলে পড়ে, তখন চোখে ঢুকে গিয়ে চোখের মধ্যে কড়কড়ানি শুরু করে দেয়। সে এক বিচ্ছিরি অবস্থা। আমার গালের হনু দুটোও ছোট টিলার মতো উঁচিয়ে থাকে। এমনকী আমার চোয়াল বেধড়ক বড় হওয়ায় ওপরের দাঁতের পাটিকে পেছনে রেখে এগিয়ে থাকে সামনে আধইঞ্চির মতো। আমার ঘাড় আছে কিন্তু গর্দান নেই। তাই বিশাল চিবুক ঠেকে থাকে লোমশ বুকে। কাঁধ দুটো ষাঁড়ের কাঁধের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। ধড়টা যে অনুপাতে নিরেট আর বিরাট–পা দুটো সেই অনুপাত মেনে চলেনি; দুটো পা-ই বেঁটে আর বাঁকা। আমি অষ্টপ্রহর পাঞ্জাবি আর পাজামা পরে থাকি গরিলা আকৃতিটাকে কিঞ্চিৎ সভ্যভব্য করে তোলার জন্যে।
এ রকম চেহারার ব্যাটাছেলেকে কোনও মেয়েছেলেই ভালোবাসতে পারে না মানে, প্রেমের পুরুষ করে তুলতে পারে না কিন্তু তাকে নিয়ে অনায়াসে রঙ্গপরিহাস করা চলে। আমিও আমার গজালের মতো দাঁত বের করে হাসি। তাই আমি সবার প্রিয়।
কলেজ স্ট্রিটে আমার একটা ডেরা আছে। এক প্রকাশকের খাস কামরায়। এখানে জলপথের বিহার করতে অনেক কেষ্টবিষ্টু আসেন। জলপথে মানে বুঝলেন না? বড় ব্যাকডেটেড আপনি। কলেজ স্ট্রিটে লক্ষ্মী, সরস্বতী আর গণেশের উপাসকরা দুটো পথে পরিভ্রমণ করেন। একটা বিদ্যাসাগরীয় পথ–সেটা স্থলপথ; রঙিন জলের স্কোপ এ পথে নেই। আর একটা মধুসুদনীয় পথ–এটা জলপথ; এখানে রঙিন জলের ফোয়ারা ছোটে। রঙিন জলের ব্যাখ্যা নিশ্চয় করতে হবে না। সিরাজি এখন কালচারের ওপিঠ।
আমি এই আড্ডায় প্রায় যেতাম অফুরন্ত সময়ের কিছুটা কাটানোর জন্যে। প্রকাশক ছোটখাট কাজ দিতেন আর লাল-হলুদ-সাদা জল খাওয়াতেন। এই আড্ডাতেই একদিন জমে গেলাম নারায়ণীর সঙ্গে।
নারায়ণীর যে রূপ পরে দেখেছিলাম, প্রথম পরিচয়ে কিন্তু তার ছিটেফোঁটাও চোখে পড়েনি। ভারি ভদ্র, ভারি মিষ্টি, নিপাট সুন্দরী মেয়ে। চোখ-মুখ-দাঁত-নাক-চিবুক সবই যেন সাদা পাথর কেটে বানিয়েছে এক ভাস্কর যিনি কামিনীকে দামিনী করার গুপ্ত কৌশল রপ্ত করে ফেলেছেন। এই দামিনীর ঝলক মাঝে-মাঝে টের পেতাম নারায়ণীর বড়-বড় চোখের মধ্যে। কণ্ঠ তখন রণরণিয়ে উঠত– এর বেশি কিছু না। এই মেয়েই যে পরে তার ভয়ঙ্করী রূপ দেখিয়ে থ করে দেবে দুর্জনদের তা কল্পনাও করতে পারিনি।
আমার সঙ্গে বিলকুল জমে গেছিল নারায়ণী। বিউটি অ্যান্ড দ্য বীস্ট উপন্যাসটা যাঁরা পড়েছেন, তাঁরা আমাদের মুখোমুখি ছবিটা আন্দাজ করে নিতে পারবেন। আমাদের প্রকাশক বন্ধুটি বিলক্ষণ রসিক পুরুষ এবং জলপথে দীর্ঘকাল ভ্রমণ করছেন। তাঁর আপ্যায়নকে আমরা অপমান করতে পারতাম না। আমি আর নারায়ণী দুজনেই জলপথের পথিক হয়ে যেতাম। সেই সময়ে খুলে যেত ওর মনের আগল। হুড়হুড় করে বলে যেত নিজের কথা। দিদি মরে যাওয়ার পর জামাইবাবুর আশ্রয় থেকে চলে এসেছে। দিদির শেষ ইচ্ছে ছিল যেন জামাইবাবুর হাতে সিঁথিতে সিঁদুর পরে নেয়। কিন্তু নারায়ণী তো অন্য ধাতু দিয়ে তৈরি হয়েছিল। অত্যাচারী এই সমাজটার ওপর সীমাহীন আক্রোশ বুকের মধ্যে নিয়ে ও ঘরছাড়া হয়েছিল। থাকত একটা মেয়েদের হস্টেলে–ভবানীপুরে। খরচপত্র জুটিয়ে নিত টিউশনি আর প্রুফ দেখে। এরই মধ্যে পড়াশোনা চালিয়েছে আর গড়েছে নিজেকে। আজকাল মার্শাল আর্ট অনেক রকম বেরিয়েছে। নারায়ণী সেই বিদ্যে দিয়ে ওর নরম তুলতুলে শরীরটাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে শতঘ্নী অস্ত্র বানিয়ে তুলতে পারে–একই সময়ে একশো লোককে নাকি ঘায়েল করতে পারে। ওর হাত আর পা তখন চারখানা গদা হয়ে যায় হাতের মুঠো দুটো হয়ে যায় দুটো লোহার বল।
