সিঙ্কারো এখন ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। হাতে সেই ভয়াল অস্ত্র।
বলছেন, অজানা এক দো-আঁশলা ধাতু দিয়ে এর বডি তৈরি হয়েছে। সামান্য তাপ পেলেই রবারের মতো ফুলে উঠতে থাকে। তারপর আগের অবস্থায় ফিরে যায় হঠাৎ। চেম্বারে যে অ্যাটমিক রিঅ্যাকশন ঘটে, তার পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দেয় প্রচণ্ড প্রেসার দিয়ে। এক সেন্টিমিটার ডায়ামিটারের গোল বুলেট ঠিকরে গিয়ে ফাটে ছোট্ট অ্যাটম বোমার মতো কিন্তু শব্দ হয় না। নিশ্চিহ্ন করে দেয় টার্গেট।
চোয়াল ঝুলে পড়েছিল গজাননের। রবারের মতো বেড়ে যায় এ আবার কী ধাতু?
রামভেটকি কিন্তু চোয়াল শক্ত করে বললে, এরকম কটা গুলি আছে ভেতরে।
আরও ছত্রিশটা।
মাই গড।
এই ট্রিগারটা টিপলেই–
ঘরে ঢুকল একটি মূর্তি। পুরুষ। ভাবলেশহীন মুখে রামভেটকির দিকে তাকিয়ে বললে, মেসেজ এসেছে জিরো ওয়ান ফোর টু থেকে।
গজাননের ঝোলা চোয়াল উঠে এসেছিল লোকটাকে দেখেই। আচমকা সুড়সুড় করে উঠেছিল গালের কাটা দাগটা। অজান্তেই হাত বুলিয়ে ফেলতেই মাথার মধ্যে সব লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল।
রামভেটকি আর সিঙ্কারো দেখলেন শুধু আশ্চর্য দৃশ্য। দাঁড়িয়ে থেকেই বডি থ্রো করল গজানন। দু-হাত সামনে প্রসারিত। কাঁক করে পুরুষমূর্তির গলা টিপে ধরে হেঁকে উঠল ছাদ কাঁপানো স্বরে– অত উঁচু থেকে পড়েও মরিসনি?
রহস্য! রহস্য! রহস্য!
কে এই আগন্তুক যাকে দেখেই গজাননের তাৎক্ষণিক পাগলামি চাগিয়ে উঠল?
এই সেই আততায়ী–বোম্বাই হোটেলে যে বিকট হাতিয়ার নিয়ে গজাননকে কবন্ধ বানাতে গেছিল–গজাননের হাতে হাতিয়ার দেখেই জানলা দিয়ে লাফ মেরেছিল। কিন্তু সে কি মরেনি?
মরেছিল। হাড়গোড় ভেঙে পিণ্ডি পাকিয়ে গেছিল।
তবে এ লোকটা কে?
তারই ডবল।
রহস্য পরিষ্কার হয়েছিল আস্তে-আস্তে অনেক জেরা এবং অনেক কাণ্ডকারখানার পর।
অবতার সিং-এর নকল সাজিয়েছিল ত্রিশূল আসল অবতার সিংকে বাঁচাবার জন্যে। বিকট হাতিয়ারের কোপটা তাই গেছে নকল অবতারের মুন্ডুর ওপর দিয়ে।
কিন্তু যারা এই নৃশংস কাণ্ড করে চলেছে, তারা নকল মানুষ বানানোর ব্যাপারে এগিয়ে গেছে আরও কয়েক ধাপ। যে-কোনও প্রাণীর দেহকোষ থেকে সম্পূর্ণ সেই প্রাণীটাকে সৃষ্টি করতে পারে ল্যাবরেটরিতে। এক কথায় যাকে বলে ক্লোনিং। আফ্রিকান ব্যাঙকে ক্লোন করে নকল ব্যাঙ তৈরির পর নোবেল পুরস্কার বিজয়ী এক বৈজ্ঞানিক হুঁশিয়ার করেছিলেন–খবরদার। মানুষ ক্লোন করতে যেও না। দানব তৈরি হয়ে যেতে পারে।
গুপ্ত শত্রুরা ঠিক তাই করেছে। রামভেটকির এই বিশ্বস্ত অনুচরটিকে মদের আড্ডায় ঘুম পাড়িয়ে তার হাতের চামড়া চেঁচে নিয়ে সেই কোষ থেকে বানিয়েছিল হুবহু দুই অনুচর। একজনকে পাঠানো হয়েছিল গজানন নিধনে। আর একজন মোতায়েন রয়েছে ত্রিশূলেরই এই গোপন আস্তানায়। গজানন যদি তাকে চিনে না ফেলত, না জানি আরও কত নৃশংস কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়ত দানব-মগজওলা এই নকল পুরুষটি।
আসল অনুচরটি তাহলে এখন কোথায়?
সব চেয়ে কঠিন প্রশ্ন!
জবাব পেতে কালঘাম ছুটে গেছিল ত্রিশূলবাহিনীর। নিষ্ঠুর নিপীড়নে প্রাণটাকে শুধু টিকিয়ে রেখেছিল নকল অনুচরদের মধ্যে। তারপর হিপনোটিক সাজেশানের পর বেরিয়ে এল জবাবটা।
আন্দামান আর নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের যে কটি দ্বীপে আগ্নেয়গিরি আছে, তারই একটিতে নিবিড় বনানীতে ভারত-শত্রুদের ঘাঁটিতে বন্দি রয়েছে ত্রিশূলের পরম বিশ্বস্ত এই অনুচরটি। হয়তো তার দেহকোষ থেকে অ্যাদ্দিনে তৈরি হয়ে গেছে আরও অনেক চলমান দানব।
.
ডুবো জাহাজ চলেছে আন্দামানের জলতল দিয়ে। ভারত সরকারের সাবমেরিন। যেন একটা তিমি মাছ।
আগ্নেয়দ্বীপে দিবালোকে বা নিশীথ রাতে ডাঙায় নামা বিপজ্জনক, এ খবরটা আগেই দিয়ে রেখেছিল নকল অনুচর। তাই এই ব্যবস্থা।
গজানন গ্যাঁট হয়ে বসে ছোট্ট একটা চেম্বারে। বেপারীটোলা লেনের অফিসে বসে থাকার মতোই পোজ মেরে রয়েছে। মুখ দেখে মনে হচ্ছে যেন বেড়াতে বেরিয়েছে। মাথার কোটরে যে চিন্তাকীট রাশি-রাশি কুরেকুরে খাচ্ছে, তা প্রকাশ পাচ্ছে না মোটেই। একেই বলে গুরুর ট্রেনিং।
গুরুর নির্দেশটাও সুরুৎ করে চলে যাচ্ছে মগজের অযুত নিযুত রন্ধ্রের মধ্যে দিয়ে। দেশের সেবায় এই দেহমন্দিরকে উৎসর্গ করে চলেছে গজানন দ্য গ্রেট। শত্ৰুপুরীতে প্রবেশ করবে একা।
তারপর?
তারপর নাস্তি।
রামভেটকি এসে দাঁড়াল সামনে। গরিলাআননে সংশয়। পারবে তো গজানন দুর্ভেদ্য দুর্গকে। ভেতর থেকে উড়িয়ে দিতে?
গজানন সটান চাইল রামভেটকির চোখে-চোখে। মাথার মধ্যে চিন্তাকীট রাশি রাশি ফুসফাস করে মিলিয়ে গেল তৎক্ষণাৎ। রামভেটকির ওই সংশয় ভরা চাহনি নিমেষে পালটে দিয়েছে গজাননের মুখচ্ছবি। কঠিন প্রত্যয় আর সর্বনাশা জেদ ফের মাথাচাড়া দিয়েছে।
বললে সংক্ষেপে, নামবার সময় হয়েছে?
হ্যাঁ।
.
গজানন এখন দ্বীপে দাঁড়িয়ে। সাবমেরিন বিদায় নিয়েছে। ইষ্টমন্ত্র জপ করতে গিয়ে পুঁতিবালার নাম স্মরণ করে ফেলেছে গজানন বেশ কয়েকবার। ভাবনাটা যে শুধু ওকে নিয়েই। ছাতার তলায় ছিল এতদিন। গজানন অক্কা পেলে ভেসে যাবে বেচারি। রূপ আর যৌবন…
অন্ধকার অন্ধকার…চারিদিকে নিঃসীম অন্ধকার। আশেপাশে ছোট-বড় গাছের ভিড়। পেছনে সমুদ্রের বিরামবিহীন কলরব। রাতজাগা প্রাণীও কি নেই ছাই এই ভয়ঙ্কর দ্বীপে?
