চার মূর্তিমানকে ওইভাবে শার্দুলবিক্রমে ধেয়ে আসতে দেখেই মনে পড়ল অ্যাবেলের কথা। আহারে! ঠিক এই সময়ে হতভাগাকে যদি পেতাম পাশে…
আচম্বিতে ঝনঝন করে বারান্দার দিকের জানলার কাঁচ ভেঙে ঠিকরে বেরিয়ে এল ভেতর দিকে। নিমেষ মধ্যে পুলিশ গিজগিজ করতে লাগল ঘরময়। অ্যাবেল চলে এল আমার পাশে সবার আগে।
আদালত থেকে কী শাস্তি দেওয়া হয়েছিল বিরাট এই দলটাকে, আজ আর তা হুবহু মনে নেই। পুলিশের ইতিহাসে কুখ্যাত এই তস্কর বাহিনীর যে নাম লেখা আছে, সেটা অবশ্য মনে আছে– ওয়েস্টবোর্ন পার্ক গ্যাং।
জড়োয়া চুরিতে সিদ্ধহস্ত দলের প্রত্যেকেই। পালের গোদা ছিল মিসেস ক্যাভানাগের স্বামী সেই বেঁটে বুড়ো কালো জুলপিওলা লোকটা। হুইটি তার নাম। জেমস থর্নর্ডাইক কোম্পানির ম্যানেজার ছিল এককালে। টটেনহ্যাম কোর্টে এদের অফিস। দুনিয়ায় যা কিছু বস্তু সরবরাহ করা ছিল বিশেষ এই কোম্পানির কাজ। মাল সাপ্লাই করতে গিয়ে হুইটি দেখলে কারবারটা তো মন্দ নয়; লন্ডনের নাচের আসরগুলোয় নিমন্ত্রিতদের ছদ্মবেশে চোর সাপ্লাই করলে কেমন হয়?
চাকরি ছেড়ে দিয়ে লোভনীয় এই ব্যবসা ফেঁদে বসল হুইটি। তেইশজন পুরুষ আর আটজন মহিলাকে দিয়ে নানারকম চোরাই মাল এনে ফেলতে লাগল নিজের ডেরায়। সবই জড়োয়া গয়না। দাম যা হত তার এক তৃতীয়াংশ পেত চোর বা চোরনী। সিংহ বখরা ঝেড়ে দিত নিজে।
হুইটি এখন পোর্টল্যান্ড জেলের হাওয়া খাচ্ছে বলেই শুনেছি। তরুণ-তরুণী সাগরেদগুলো পাথর ভেঙে মরছে। বউটা শুনেছি আমার নাম শুনলেই দাঁত কিড়মিড় করে।
(ম্যাক্স পেমবারটন-এর গল্প অবলম্বনে)
*কিশোর মন পত্রিকায় প্রকাশিত। ১৬.৪.৮৬ অরিখের সংখ্যা।
শনিবারের মড়া
নারায়ণী গোয়েন্দানীর এই তেরোতলার অফিসঘর থেকে পাতালরেলের খোঁড়াখুঁড়ি দেখা যায়। এ ঘরের পুরো পশ্চিমের দেওয়ালটা অদ্ভুত পুরু কাঁচ দিয়ে তৈরি। পশ্চিমে যখন সূর্য অস্ত যায় গঙ্গার ওদিকে, কালচে কাঁচ পড়ন্ত রোদ্দুরকে ফিলটার করে ঘরে ঢোকায়। পুরো ঘরখানায় তখন গোধূলির রহস্য ভাসতে থাকে। দিনের বেলায় এ ঘরে নকল আলোর দরকার হয় না। সূর্য তার আলো পাঠান কালচে কাঁচের মধ্যে দিয়ে। মোটা পরদা দিয়ে ইচ্ছে করে খানিকটা কাঁচ ঢেকে রেখে দেয় নারায়ণী গোয়েন্দানী–যাতে বেশি আলো চোখের মধ্যে দিয়ে ঢুকে মাথা গরম না করে দেয়।
নারায়ণী গোয়েন্দানীর চোখ দুটো অবশ্য বেশ বড়ই–জগতের আলো আর অন্ধকার দুটোই একটু বেশি করে ঢুকে পড়ে–চোখের সুড়ঙ্গ দিয়ে পৌঁছয় মগজে। সমাজের ওপরমহল আর নিচের মহল–দুটো মহলের খবর রাখে। রাঘববোয়াল আর চুনোপুঁটি–সব্বাই তাই তাকে যমের মতো ভয় পায়।
কারণ, নারায়ণী গোয়েন্দানী রহস্যের কিনারা করে দেয় বটে কিন্তু সোজাপথে করে না। এক পয়সা দক্ষিণাও নেয় না। আইন-টাইন কিছু মানে না। উঁচবুদ্ধি, গণ্ডারের গোঁ, সিংহের সাহস, আর হাতির শক্তি নিয়ে ও বদমাশ ঘায়েল করে, ষড়যন্ত্র ছিন্নভিন্ন করে, ছদ্মবেশীর মুখোশ ছিঁড়ে উড়িয়ে দেয়–গরিবকে বাঁচায়, অত্যাচারের অবসান ঘটায়।
হ্যাঁ, এতগুলো গুণের সঙ্গে আরও একটা উপাদান ও মিশিয়ে দেয় কাজ উদ্ধারের সময়ে। ওর রূপ। শান্তশিষ্ট অবস্থায় মা লক্ষ্মী বলে মনে হয় বটে, কিন্তু রণক্ষেত্রে যখন নামে, তখন ওর বড়-বড় চোখ দুটো দিয়ে ধকধক করে আগুন ছিটকোয়, তখন ওর দশবাই চণ্ডীরূপ দেখে মূৰ্ছা যেতে পারলে বেঁচে যায় কুটিলকরাল কুচক্রীরা।
মানুষ গড়ার কারিগর নারায়ণী গোয়েন্দানীকে বানিয়েছিলেন আরও অনেক বিচিত্র উপকরণ দিয়ে। সেসব একটু-একটু করে প্রকাশ পাবে। হাতির মতো বিরাট দেহ তো ওর নয়–ছিপছিপে হিলহিলে যেন এক নাগিনী। কিন্তু ক্যারাটে ফ্যারাটে শিখে একাই দশজনের মহড়া নিতে পারে। অবিশ্বাস্য বেগে ঘুরতে থাকে তখন ওর মা লক্ষ্মীর মতো বডিখানা–শত্রুদের হাড়গোড় ভেঙে পঙ্গু করে দেয় চক্ষের নিমেষে।
কলকাতা এখন একটা আজব জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোটা দেশটাই তাই হয়েছে– কলকাতার আর দোষ কি। এ দেশে এখন যে যত কুকর্ম করতে পারবে–সে তত শিরোপা পাবে। কুকাজের অবসান ঘটানোর জন্যে অলিতে-গলিতে এখন ডিটেকটিভরা দোকান খুলে বসেছে। কেউ বলছে আমি গোমেশ গোয়েন্দা। এরা যে-যার পাড়ার রহস্যসন্ধানের ব্যবসায় নেমেছে।
নারায়ণী গোয়েন্দানী কিন্তু ব্যবসা-ট্যবসা বোঝে না। ও স্রেফ ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ায়। যেহেতু গোঁফ দেখলেই ও শিকারি বেড়াল চিনতে পারে–তাই ওর হাতে রক্ষে নেই দুর্জনের।
আজব শহর কলকাতায় ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটাতেই আবির্ভূত হয়েছে গোয়েন্দানী নারায়ণী। অপকর্ম দিয়ে অপকর্মের অবসান ঘটাতে তার তিলমাত্র অরুচি নেই। এইসব কারণেই তার কীর্তিকাহিনি লিখতে চাইনি এতদিন। হয়তো অপকর্মকেই প্রশ্রয় দেওয়া হয়ে যাবে। কিন্তু উদ্দেশ্য যখন সাধু হয়, তখন…
নারায়ণীর মতো রূপসী মেয়ে সচরাচর চোখে পড়ে না। কিন্তু বিখ্যাত সেই প্রবাদের মতো তার রূপ নয়। প্রবাদটা যাঁদের এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না, তাঁদের অবগতির জন্যে জানাই ।
ইষ্টকালয়, শ্যামা নারী, বটচ্ছায়া, কৃপাবারি।
এইসব কে না চায়? ইটের বাড়ি, কালো মেয়ে, বটের ছায়া আর দয়ার দান।
নারায়ণী কিন্তু এই ফরমুলায় পড়ে না। সে মোটেই কালো নয়, অথচ তাকে দেখলেই সব পুরুষই ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে। তার গায়ের রঙটা কীরকম জানেন? এরকম গাত্রবর্ণ শুনেছি নাকি শুধু রূপকথার রাজকন্যেদেরই থাকে। প্রথম পরিচয়ের সময়ে আমি কিন্তু নারায়ণীর গায়ের রং দেখে ফস করে বলে ফেলেছিলাম, এক বাটি দুধে একটু আলতা মিশিয়ে দিয়ে গায়ে মেখেছেন নাকি?
