গাঁট্টাগোট্টা লোকটা তখন হলঘরের দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে–আমিও পৌঁছেছি চৌকাঠের সামনে। লোকটার পানে এক ঝলক সন্ধানী চাহনি বুলিয়ে নিয়েই বুঝলাম, প্ল্যান সফল হবেই একে দিয়ে কাজ শুরু করলে। লোকটা গায়ে গতরে ভারী হলেও বিনীতসততাও আছে বলে মনে হল। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আচমকা হাত থেকে দরজার হাতল ছিনিয়ে নিয়ে দড়াম করে বন্ধ করে দিলাম কপাট–দুজনেই রইলাম কিন্তু হলঘরের মধ্যেই।
পরক্ষণেই পিস্তল ঠেকালাম হেল্কার মাথায় (জানি না এই অপকর্মটির জন্যে জজসাহেব আমাকে মাসখানেক শ্রীঘর দর্শন করিয়ে ছাড়বেন কিনা), কানে কানে বললাম ফিসফিস করে, পুলিশ ঘিরে ফেলেছে বাড়ি। একদম চুপ। দোতলার ভদ্রমহিলা গ্রেপ্তার হবেন এখুনি। যা বলব, তা না করলে তোমাকে ওঁর সাগরেদ বলে চালান দেব জেলে। আমি বেরিয়ে গেছি কিনা জানতে চাইলে চেঁচিয়ে বলে দেবে, হ্যাঁ। ওপরে ডাকলে ওপরেই যাবে। ঠিক যা বললাম, তাই বলবে। তারপর ফিরে আসবে আমার কাছে। নইলে জেলখানা আছে কপালে।
শুনেই কাগজের মতো সাদা হয়ে গেল বেচারা। কাঁপতে লাগল ঠকঠক করে।
বললে অবরুদ্ধ স্বরে–যা বললেন, তাই হবে হুজুর। এই নাক কান মলছি, আর এদের গোলামি করব না।
ঠিক আছে। ওদিকের ঘরটা বেশ অন্ধকার–ওখানেই লুকোচ্ছি। তুমি বরং ওপরেই যাও গিয়ে বলে এসো, আমি বিদেয় হয়েছি।
পাশের ঘরটা সকালে প্রাতরাশ খাওয়ার ঘর। ডাইনিং টেবিলের তলায় ঢুকে পড়ে দেখলাম, সিঁড়ির গোড়া পর্যন্ত দিব্বি দেখা যায়। হেক্কা লোকটা যেই প্রথম ধাপে পা দিয়েছে ওপরে যাবে বলে, মিসেস ক্যাভানায় নিজেই নেমে এলেন বিদেয় হয়েছেন ভদ্রলোক?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
আর আমাকে না জিগ্যেস করে কক্ষনো আর অচেনা কাউকে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে দেবে না। কাজ শেষ হলে সটান শুয়ে পড়। মাথায় ঢুকেছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
গজগজ করতে করতে ওপরে চলে গেলেন মিসেস ক্যাভানাগ। হোঁৎকা লোকটা অমনি ছুটে এল আমার কাছে।
স্যার, বলুন এখন কী করব। আপনি যা বলবেন, তাই হবে। বিশ বছরের ক্যারেকটার সার্টিফিকেট দিয়েছেন লর্ড ওয়ালি। আপনি স্যার একটু বলে দেবেন। আগে জানলে কে আসে এখানে–
ঠিক আছে, ঠিক আছে, যা বলবার আমি বলে দেব। আর কেউ আসবে?
সেই ক্যাপ্টেন আর একজন পুরুতমশায়। দুজনেই নিশ্চয় একই কারবার করে, তাই না, স্যার?
তোমাকে তা ভাবতে হবে না। এলেই ঢুকিয়ে নাও। তারপর ওপরে গিয়ে আলোটা নিভিয়ে দেবে এমন ভাবে যেন হাত লেগে হঠাৎ নিভে গেল। তারপর যাবে শোওয়ার ঘরে।
পুলিশগুলো কোথায়, হুজুর?
সব জায়গায়। ছাদে, রাস্তায়, বারান্দায়। বাধা পেলেই তছনছ করে ছাড়বে গোটা বাড়ি।
ঠিক এই সময়ে কড়া নড়ে উঠল দরজার। পরপর দুজন লোক ঢুকল ভেতরে। একজনের পরনে যাজকের পোশাক। আর একজনের গায়ে নিউমার্কেট কোট–ভীষণ শক্তিশালী বপু।
দ্রুত চরণে দুজনেই উঠে গেল ওপরে–পেছন-পেছন হোল্কা বাটলার। সেকেন্ড কয়েক পরেই নিভে গেল সিঁড়ির গ্যাসবাতি। বসবার ঘরে কথাবার্তার ধ্বনি আর প্রতিধ্বনি ছাড়া বাড়ি নিস্তব্ধ।
রাতের খেল দেখানোর সময় এবার হয়েছে। বুটজোড়া খুলে ফেললাম পা থেকে। পিস্তলের ঘোড়া অর্ধেক তুলে রাখলাম। বেড়ালের মতো পা-টিপে টিপে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গিয়ে বসবার ঘরের পেছন দিকের ঘরে ঢুকলাম।
এ ঘরের ফোল্ডিং দরজার একটা পাল্লা খোলা। একটু জোরে পা ফেললে বা হোঁচট খেলেই খাঁচাছাড়া হবে প্রাণটা। পুলিশ কোথায় এখন কে জানে। রাস্তায় আছে কি থানায় বসে আছে, তা তো জানি না।
তবে আমার কপাল ভালো। ঘরের লোক কজন বেশ জোর গলায় কথা বলে চলেছে। মনে হল যেন ঝগড়া লেগেছে।
খোলা পাল্লার ফাঁক দিয়ে প্রথমেই দেখে নিলাম, মিসেস ক্যাভানাগ ঘরে নেই। চার সাগরেদ রয়েছে ঘরের মধ্যে। ল্যাম্পের কাছে দাঁড়িয়ে রয়েছে তিনজন। কালো জুলপিওলা বেঁটে বুড়ো লোকটা বসে রয়েছে হাতলওলা চেয়ারে।
সবচেয়ে খুশি হলাম টেবিলের ওপর একটা বস্তু দেখে।
বনাত পাতা রয়েছে টেবিলে। ব্রোচ, লকেট, হিরের হার ছড়ানো রয়েছে বনাতে। আলোয় ঝলমল করছে রত্নরাশি।
সবচাইতে ঝলমল করছে লেডি ফেবারের চুনির পেনড্যান্ট!
যাক, সূত্র তাহলে পাওয়া গেল, কিন্তু কাজে লাগাই কী করে মোক্ষম এই ক্লু-কে?
চারজনের কেউই নিশ্চয় নিরস্ত্র নয়। ঘরে ঢুকলেই গুলি চালাবে। পুলিশ এসে পড়ার আগেই আমি তো অক্কা পাবই–এরাও সটকান দেবে।
মিনিট পাঁচ দশ দাঁড়িয়ে যাব? উঁকি মেরে রাস্তায় দেখব, অ্যাবেল পুলিশ নিয়ে এল কিনা?
আচমকা আলো দেখলাম সিঁড়ির ডগায়। পরমুহূর্তেই দরজায় হাজির হলেন মিসেস ক্যাভানাগ স্বয়ং। সবিস্ময়ে চেয়ে রইলেন আমার দিকে সেকেন্ড কয়েক।
তারপরেই গলার শির তুলে সে কী চিৎকার! আমিও তাই চাইছিলাম। প্রভঞ্জনের বেগে পিস্তল উঁচিয়ে ঢুকে গেলাম বসবার ঘরে এবং চক্ষের নিমেষে এক গুলিতে উড়িয়ে দিলাম কাঁচের ল্যাম্প।
লক্ষ্যভেদী পিস্তলবাজ হিসেবে আমার সুনাম আছে বিলক্ষণ। চরম মুহূর্তে সে সুনাম রাখতে পেরেছিলাম বলেই কাঁচের ফানুস খানখান হয়ে ছিটকে গেল ঘরময়। চিলের মতো চেঁচাতে চেঁচাতে ওপর তলায় শোওয়ার ঘরের দিকে দৌড়োলেন মিসেস ক্যাভানাগ। লোক চারটে কিন্তু বিকট গর্জন ছেড়ে বাঘের মতো লাফ দিয়ে তেড়ে এল আমাকে যেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিল ঠিক সেই দিকে।
