গাছের ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। এ যে সেই ছোকরা, নাচের আসরে না গিয়ে গাছপালার ঘরে দাঁড়িয়ে যে সুগন্ধী বরফ গিলছিল–মিসেস ক্যাভানাগ রঙ্গচ্ছলে যাকে চোর ঠাউরেছিলেন। এমন ভান করেছিলেন, কস্মিনকালে দেখেননি ছোকরাকে।
বুঝলাম, সময় হয়েছে নিকট।
বললাম–অ্যাবেল, এবার যাও। থানার লোকদের বলবে সঙ্গে করে একটা ছোট মই যেন নিয়ে আসে। আমার সঙ্কেত না পাওয়া পর্যন্ত বাড়ির ধারেকাছেও যাবে না–তারপর মই লাগিয়ে উঠতে হবে বারান্দায়। টেবিলের ওপর কাঁচের ল্যাম্পটা দেখতে পাচ্ছ? ওই ল্যাম্প গুঁড়িয়ে গেলেই জানবে সঙ্কেত দিলাম। পিস্তল এনেছ?
ও ভুল কখনও আমার হয় না, স্যার। দুটো পিস্তলই এনেছি–দুটোই দরকার হতে পারে। অবস্থা দেখছেন তো!
হলেও হতে পারে তবে সেটা নির্ভর করছে তোমার ওপর। যাও, এখুনি যাও। লোকজন নিয়ে এস। সঙ্কেত না পেলে টু শব্দ করবে না। কু কমপ্লিট না হওয়া পর্যন্ত সঙ্কেত দেব না– খেয়াল থাকে যেন।
নিঃশব্দে উধাও হয়ে গেল অ্যাবেল গাড়ির দিকে। আমি কিন্তু সোজা গেলাম বাড়ির দিকে। জোরে কড়া নাড়লাম সদর দরজায়। সঙ্গে-সঙ্গে খুলে গেল পাল্লা। এত চট করে খুলবে, ভাবতে পারিনি। উর্দিপরা গাঁট্টাগোট্টা একটা লোক দাঁড়িয়ে সামনে। মোটেই অবাক হয়নি আমাকে দেখে। বরঞ্চ বললে অমায়িক স্বরে, ওপরে সবাই আপনিও যান।
তা তো যাবই। পথ দেখাও।
দ্বিধায় পড়ল লোকটা।
বলল, ভুল করেছি মনে হচ্ছে। একটু দাঁড়ান, মিসেস ক্যাভানাগকে জিগ্যেস করে আসি।
আমার জবাবের জন্যে না দাঁড়িয়েই লোকটা তিনতলা উঠে গেল সিঁড়ি বেয়ে; আমিও আঠার মতো লেগে রইলাম পেছনে। চাতালে উঠেই দেখতে পেলাম সামনের বসবার ঘরের ভেতর পর্যন্ত। মিসেস ক্যাভানাগ তো রয়েছেনই, রয়েছে একজন খর্বকায় বুড়োটে লোক–গালে লম্বা কালো জুলপি। সুগন্ধী বরফ প্রিয় সেই ছোকরাকেও দেখলাম। বসবার ঘরের লাগোয়া ঘরটায়, কিন্তু আলো জ্বলছে না–এ ঘরের আলোয় ফোল্ডিং দরজার ওপর দিয়ে দেখা যাচ্ছে সে ঘর ফাঁকা।
এত কিছু দেখলাম চকিতের মধ্যে। গাঁটাগোট্টা লোকটা মিসেস ক্যাভানাগের কানে কানে ফিসফিস করতেই ছিলে ছেঁড়া ধনুকের মতো ছিটকে সোজা হয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা, ছোকরাটাকে ঠেলে বার করে দিলেন বারান্দায়, ঝড়ের বেগে চলে এলেন চাতালে দাঁড়ালেন আমার মুখোমুখি।
তার আগে অবশ্য বসবার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিতে ভুললেন না।
আরে! মিস্টার সাটন যে! কী সৌভাগ্য! কিন্তু আমি যে এখুনি শুতে যাচ্ছি। কী নিপুণ অভিনয়ই জানে এই মেয়েরা। চোখেমুখে আনন্দ যেন উপচে পড়ল। সুপার ফাইন আকটিং!
যতদূর সম্ভব মোলায়েম হাসলাম। হেসে-হেসে বললাম, আমি তো ভেবেছিলাম, এতক্ষণে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেছেন। কিন্তু না এসে যে পারলাম না। লেডি ফেবারের নাচঘরে একটা হিরের ব্রোচ কুড়িয়ে পেয়েছি। আপনি চলে আসার পরেই। দারোয়ানও বললে, নিশ্চয় আপনারই হবে। তাই ছুটতে ছুটতে চলে এলাম কাল সকালেই আবার বাইরে যেতে হচ্ছে তো।
কথা বলতে-বলতে হিরের ব্রোচ বার করে দিলাম ভদ্রমহিলার হাতে। এই সেই অলঙ্কার যা আমি একটু আগেই নিয়ে এসেছি বন্ড স্ট্রিটের আমার রত্ন বাক্স থেকে। ব্রোচটা হাতে নিয়েই চকিতের জন্যে আমার পানে ঝকমকে চাহনি নিক্ষেপ করলেন মিসেস ক্যাভানাগ। ঈষৎ কঠিন হল দুটো ঠোঁট। পরমুহূর্তেই হেসে ফেলে ব্রোচ ফিরিয়ে দিলেন আমার হাতে।
কষ্ট করে এসেছেন–কৃতজ্ঞ রইলাম। কিন্তু এ জিনিস আমার নয়। আমার ব্রোচ এইমাত্র খুলে রাখলাম জড়োয়া বাক্সে।
হতাশ হওয়ার ভঙ্গিমায় বললাম, আপনার নয়? শুধু-শুধু কষ্ট দিলাম এত রাতে।
কষ্ট তো আমিই দিলাম আপনাকে। আসুন না, এককাপ কফি খেয়ে যান।
না, থাক। আর ঝামেলা বাড়াতে চাই না। গুডনাইট।
করমর্দন করে যেন নিশ্চিন্ত হলেন মিসেস ক্যাভানাগ। সিঁড়ির ধাপে পা দিলাম আমি, উনিও ঘুরে গিয়ে ঢুকলেন বসবার ঘরে নিশ্চয় বারান্দায় লুকিয়ে থাকা ছোকরাকে ডাকতে।
গাঁট্টাগোট্টা লোকটা হলঘরে দাঁড়িয়েছিল দরজা খুলে আমাকে বিদেয় করার জন্যে। আমি কিন্তু নিচে নামছিলাম শামুকের মতো আস্তে-আস্তে। বেজায় দমে গিয়েই। পা যেন আর চলছে না। পুরো প্ল্যানটাই ভণ্ডুল হয়ে গেল। সেই মুহূর্তে নতুন কোনও মতলব মাথায় আসছে না।
এ বাড়িতে এসেছিলাম আচমকা ভদ্রমহিলার সামনে গিয়ে তাকে চমকে দেব বলে, দলবলের হদিশ জেনে নেব, সুযোগ পেলে গ্রেপ্তারও করব। কিন্তু মূল যোগসূত্রটাই এখনও আঁধারে বিলীন অচিরে সন্ধান পাব বলেও মনে হয় না।
চিন্তা করতে হল তাই দশ সেকেন্ডের মধ্যে–এখুনি, না কালকে?
এক হয়, বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাই চুপচাপ। নিশ্চিন্ত মনে এরা আবার হানা দিক আর এক নাচের আসরে। তখন দলশুদ্ধ পাকড়াও করা যাবেখন।
নাকি, এখুনি যা করবার শেষ করে যাব?
শেষের পন্থাটা মনে ধরল আমার।
কেন না, কালকে এরা কে কোথায় থাকবে, তার কি ঠিক আছে? কেউ হয়তো সটকান দেবে প্যারিসে, কেউ বেলজিয়ামে। চুনি-পেনড্যান্টের মতো এরকম মোক্ষম সূত্র হাতে আর নাও আসতে পারে। যে দলটাকে দীর্ঘদিন গরু খোঁজার মতো খুঁজছি, তাদের জনা তিন-চারকে একই বাড়িতে একসঙ্গে পাওয়ার সুযোগ আর নাও পেতে পারি। শেষের এই কথাটা ভাবতেই গোটা প্ল্যানটা নিমেষমধ্যে ঝলসে উঠল মাথার মধ্যে। নিঃশব্দে, ঝড়ের বেগে, কাজ করে গেলাম প্ল্যানমাফিক। আজও অবাক হই, সেই মুহূর্তে চিন্তায় ভাবনায় কাজেকর্মে অত বিদ্যুৎগতি ক্ষিপ্রতা পেয়েছিলাম কীভাবে?
