পাকা কি কঁচা, কদ্দিন ধরে এ লাইনে নেমেছেন, সব জানতে পারব শিগগিরই। এখুনি আবার যাচ্ছি পোর্টম্যান স্কোয়ারে। ছ্যাকড়াগাড়ি নিয়ে এসো পেছন-পেছন। বাড়ির সামনে গিয়ে বসে থাকবে আমার ব্রুম গাড়ির মধ্যে। আমি না আসা পর্যন্ত নড়বে না। তার আগে একটা কাজ সেরে নেবে। মার্লবরো স্ট্রিট পুলিশ স্টেশনে যাবে। জিগ্যেস করবে, কালকে এই সময় থেকে ভোর ছটার মধ্যে জনা দশ-বারো লোককে দিতে পারবে কিনা বেজওয়াটারে একটা বাড়িতে হানা দেওয়ার জন্যে।
ভদ্রমহিলার পেছন নিয়ে বাড়ি পর্যন্ত ধাওয়া করবেন নাকি?
ঠিক তাই করব। লেডি ফেবারের বাড়ি থেকে ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলে ওঁর বাড়িতেই আমি অতিথি হব মিনিট দশেকের জন্যে। মার্লবরো স্ট্রিট অথবা হ্যাঁরো রোড পুলিশ স্টেশন থেকে লোক তুমি পাবেই। ওরাও তো অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে গয়না চুরির নালিশ শুনতে-শুনতে। মাথা হেঁট হয়েছে। পাবলিকের কাছে।
খাঁটি কথাই বলেছেন। কালকেই কিং বলছিল, ঝটপট এ ঝামেলার সুরাহা না হলে আত্মহত্যা করবে। পুরো ঠিকানাটা কিন্তু দেননি, স্যার।
পাইনি বলে দিইনি। শুধু জানি ভদ্রমহিলা থাকেন সেন্ট স্টিফেন গির্জের কাছাকাছি কোথাও– কোনও এক যাজকের ওপরতলায় বা নীচের তলায়। ওঁর কোচোয়ানের পেট থেকে ঠিকানা যদি বার করতে পারো, খুব ভালো। কিন্তু আর দেরি নয়। জামাকাপড় পরে পোর্টম্যান স্কোয়ারে হাজির হও যত তাড়াতাড়ি পারো।
রাত তখন প্রায় একটা। অৰ্চাৰ্ড স্ট্রিটের গির্জের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময়ে ঢং করে ঘণ্টা বাজল গিঞ্জের ঘড়িতে। স্কোয়ারে পৌঁছে দেখি আমার কোচোয়ান দাঁড়িয়ে আছে ব্রহাম গাড়ি নিয়ে বেকার স্ট্রিটের মোড়ে। বাড়িতে ঢোকবার আগে বলে গেলাম অ্যাবেলের জন্যে অপেক্ষা করতে। ভুল করেও যেন লেডি ফেবারের বাড়ির সামনে গাড়ি নিয়ে না যায়।
গুটিগুটি এগোলাম নাচঘরের দিকে। দেখতে পেলাম মিসেস ক্যাভানাগকে। বর্শা ছোঁড়ার খেলায় মেতে রয়েছেন। বেশ বুঝলাম, আসরে যতক্ষণ একটি লোকও থাকবে, উনিও থাকবেন।
ঢুকলাম খাওয়ার ঘরে। বসলাম দরজার কাছে, যাতে পাশ দিয়ে যে-ই যাক না কেন, তার বদনখানা দেখতে পাই।
যৎসামান্য আহার করছি পেটের আগুন নেভানোর জন্যে দশ মিনিটও হয়নি–আচম্বিতে আমাকে অবাক করে দিয়ে হলঘরে এসে ঢুকলেন মিসেস ক্যাভানাগ। একা। শাল জড়ানো সারাগায়ে। হনহন করে বেরিয়ে গেলেন আমার ঠিক পাশ দিয়ে–অথচ খেয়াল করলেন না আমি বসে আছি খাবার নিয়ে।
বসেই রইলাম চুপচাপ। হলঘরের দরজা বন্ধ হল, নিমেষে উঠে দাঁড়ালাম।
বেশিরভাগ অভ্যাগতই ততক্ষণে বিদায় নিয়েছেন। খানকয়েক বাড়ির গাড়ি আর ছ্যাকড়া গাড়ি দাঁড়িয়ে পার্কের পাশে। লেডি ফেবারের মাইনে করা একজন লোক একে-ওকে গাড়ি এনে দিচ্ছে।
দ্রুত ভাবলাম, ভদ্রমহিলার ঠিকানা অ্যাবেল জোগাড় করতে পেরেছে কিনা জানি না। এই লোকটাকে ঠিকানা জিগ্যেস করা যাক।
এই যে ভদ্রমহিলা এখুনি চলে গেলেন, উনি কি বাড়ির গাড়িতে গেলেন, না, ভাড়াটে গাড়িতে?
মিসেস…মিসেস কেভেনারের কথা বলছেন?
কেভেনার? হ্যাঁ, হ্যাঁ, তাই হবে, সঠিক নামটা বলার সময় তখন নেই।
উনি ভাড়াটে গাড়ি নিলেন। ১৯২ নম্বর ওয়েস্টবোর্ন পার্কে যাবেন।
থ্যাংকিউ। ভদ্রমহিলার বাড়ি যেতে হবে এখুনি। একটা জড়োয়া গয়না ফেলে গেছেন হলঘরে। যাই, নিজে গিয়ে ফিরিয়ে দিই।
লোকটা হাঁ হয়ে গেল। জন্মে এমন কথা শোনেনি। লন্ডন শহরে নাচের আসরে জড়োয়া গয়না ফেলে গেলে বাড়ি ধাওয়া করে ফিরিয়ে দিয়ে আসার ঘটনা এই প্রথম বইকি।
দৌড়ে গিয়ে উঠলাম আমার গাড়িতে। সামনের সিটের নীচে গুঁড়ি মেরে বসেছিল অ্যাবেল। করুণ কণ্ঠে জানাল, ভদ্রমহিলার কোচোয়ানকে পায়নি, ঠিকানাও জোগাড় করতে পারেনি।
গাড়ি ততক্ষণে ছুটতে শুরু করে দিয়েছে। বললাম, অত মুষড়ে পড়তে হবে না। পুলিশ স্টেশনে কী শুনে এলে বলো।
ওরা তো থানার লোক ঝেটিয়ে এনে বাড়ির সব্বাইকে অ্যারেস্ট করার জন্যে তড়পনি শুরু করে দিয়েছিল। অতি কষ্টে আটকেছি। ঠিক হয়েছে, হ্যাঁরো রোড পুলিশ স্টেশনে এক ডজন লোক মোতায়েন থাকবে আপনার হুকুমের অপেক্ষায় সকাল পর্যন্ত। স্যার, আপনার ওপর ওদের অগাধ আস্থা।
আস্থাটা নিজেদের ওপর রাখলে আরও ভালো হত। যাক গে, অ্যাবেল, কপাল ভালোই আমাদের। ভদ্রমহিলার ঠিকানা, ১৯২ নম্বর ওয়েস্টবোর্ন পার্ক। জায়গাটা চৌকোনা বলেই তো মনে পড়ছে।
চৌকোনা ঠিকই, কিন্তু অনেকটা ডিমের মতো। ডারহ্যামের দিকে পড়বে একশো বিরানব্বই নম্বর বাড়িটা। গাছপালার আড়াল থেকে অনায়াসেই নজর রাখা যাবে।
দশ মিনিট পরেই পৌঁছে গেলাম ওয়েস্টবোর্ন পার্কে। অ্যাবেল ঠিকই বলেছে। নামেই স্কোয়ার, আসলে তেকোনা পার্ক। একশো বিরানব্বই নম্বর বাড়িটা বেশ বড়। বাইরের রং জ্বলে গেছে। দোতলা আর তিনতলার ঘরে আলো জ্বলছে। কিন্তু খড়খড়ি নামানো থাকার ফলে দেখতে পাচ্ছি না বসবার ঘরে ঘোরাঘুরি করছে কারা।
দুটো গাছ যেখানে জটলা পাকিয়েছে, অ্যাবেলকে নিয়ে ঘাঁটি গাড়লাম সেখানে। বীটের কনস্টেবল আমাকে চেনে। তাই অবাক হল ওই অবস্থায় বসে থাকতে দেখে।
খুশিও হল বিলক্ষণ। খুশি-খুশি মুখেই বললে–আগেই আঁচ করেছিলাম। সুবিধের নয় বাড়ির হালচাল। সারারাত ধরে ছোকরাদের আনাগোনা। ওই তো…ওই দেখুন…একজন এসে গেছে।
