তারপর হেসে-হেসে বলতে হল, ছেঁড়া গাউন কাউকে না দেখিয়ে বরং ওপরে চলে যান। কেউ না কেউ আছে, ছেঁড়া জায়গা সেলাই করে দেবে। তারপর নীচে নামবেন।
আকাশের চাঁদ যেন হাতে পেলেন ভদ্রমহিলা। তড়বড় করে উঠে গেলেন সিঁড়ি বেয়ে দোতলায়–অদৃশ্য হয়ে গেলেন একটা শোওয়ার ঘরে।
চোখের আড়াল হতেই ফিরে এলাম গাছপালার ঘরে। তারিয়ে-তারিয়ে এককাপ কড়া চা খেলাম। চিন্তাশক্তি উদ্দীপ্ত করতে চায়ের জুড়ি হয় না–এ অভিজ্ঞতা আমার অনেক দিনের। তারপর ঝাড়া দশ মিনিট ধরে পুরো ব্যাপারটাকে মনের মধ্যে তোলাপাড়া করলাম। কে এই মিসেস সিবাইল ক্যাভানাগ? গাউনের ভেতরকার প্যানেলে হিরের ব্রোচ সেলাই করে রেখে দিয়েছেন কেন? এমনভাবে লুকিয়ে রেখেছেন যেন টেমস নদীর জলে ডুবিয়ে রাখা হয়েছে হাজার চেষ্টা করলেও আশপাশের কারুর চোখে পড়বে না।
প্রশ্নগুলোর উত্তর যে-কোনও শিশুই দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই শিশুর চোখ এড়িয়ে যেতে পারে–এতবড় একটা সিদ্ধান্তের মূলে পৌঁছতে হলে প্রত্যেকটা ঘটনার অবদান নেহাত কম নয়।
যেমন ধরা যাক, এইমাত্র যে অপরূপ ব্রোচটা দেখে নয়ন সার্থক করলাম, লেডি ডানহোমের চুরি যাওয়া ব্রোচের সঙ্গে তা দিব্বি মিলে যায়। অথচ ঠিক এই ধরনের ব্রোচ শখানেক মহিলা গয়না হিসেবে ব্যবহার করেন।
কিন্তু আমি যদি এখন লেডি ফেবারের কাছে দৌড়ে গিয়ে বলি–শুনুন, শুনুন, চোরকে পাওয়া গেছে–নাম তার মিসেস সিবাইল ক্যাভানাগ, তাহলেই মারাত্মক ভুল করে বসব কেলেঙ্কারিই সার হবে।
অথচ আমি জানি, একশ পাউন্ড পকেট থেকে বার করে দিয়ে যদি ভদ্রমহিলার গাউনের প্যানেল তল্লাশি করার অনুমতিলাভ করি, তাহলে চুনির পেনড্যান্ট ওই প্যানেলের মধ্যেই পাব, পুরস্কার হিসেবে তখুনি ফিরে পাব একশ পাউন্ড, সেইসঙ্গে বাড়তি কিছু।
পেনড্যান্ট পাওয়া নিছক একটা সূত্র। ওই ক্ল ধরে এগোলেই পরের পর জহরত চুরি রহস্যের সমাধান ঘটবেই, বছরের সবচেয়ে জটিল প্রহেলিকায় অবসান ঘটবে।
কিন্তু ভদ্রমহিলা এখন ওপরতলায়। সেখানে লুকিয়ে রাখার জায়গার অভাব নেই। যা লুকোতে চান, এতক্ষণে তা লুকনোও হয়ে গেছে। কাজেই আচমকা গাউনের পটি তল্লাশি করা আহাম্মকি হবে–চোরকে বামাল ধরা যাবে না।
আর এক কাপ চা পান করতেই মাথাটা আরও একটু পরিষ্কার হয়ে গেল। স্পষ্ট বুঝলাম, ভদ্রমহিলা আদৌ চোর নন, কিন্তু চুরির মাল কাছে রাখেন। লেডি ফেবারের রত্নমালার কঁচি চালিয়ে পেনড্যান্ট সরানো হয়েছে; সিবাইল ক্যাভানাগের পক্ষে ওভাবে কাঁচি চালানো সম্ভব নয়। দক্ষ কোনও পুরুষ এই কর্মটি করেছে। কিন্তু কে সেই ব্যক্তি? একজন, না বহুজন? কপাল জোরে একটা জুটির আভাস পাচ্ছি; এমনও তো হতে পারে, আরও অনেকের হাত রয়েছে রত্নচুরির পেছনে? তাদের খোঁজখবর নেওয়াটা আগে দরকার। তা না করে যদি ওই ভদ্রমহিলাকে শাস্তি দেওয়া যায়, ব্যাপকভাবে যে ষড়যন্ত্র চলছে, তা বন্ধ হবে না। ভদ্রমহিলার গাউনের পটি থেকে হিরের ব্রোচ পাওয়া গেলেও বিরাট কিছু একটা প্রমাণ করতে পারব না। কেন না, প্রায় ওই ধরনের হিরের ব্রোচ কেনশিংটন থেকে টেম্পল বার পর্যন্ত সমস্ত জড়োয়া গয়নার দোকানেই পাওয়া যায়। সুতরাং ভদ্রমহিলাকে ফট করে চোর বলে বসলে লোকে আমাকেই পাগল ঠাওরাবে।
আর একটা কাজ করতে পারি। ছ্যাকড়াগাড়ি ডেকে এখুনি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে চলে যেতে পারি। এইমাত্র যা দেখলাম, তা বলতে পারিও। অদ্ভুত এই কেসের কাহিনি যদি লিখতেই হয়, তা আমিই লিখব এবং আর একটুও সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
পুরো ব্যাপারটাকে মাথার মধ্যে সাজিয়ে নেওয়ার ফলে অনেকটা ধাতস্থ হয়েই ফের ঢুকলাম নাচঘরে। একটু পরে দেখলাম মিসেস সিবাইল ক্যাভানাগও এসে গেছেন। চোখমুখ নির্বিকার। আগের মতোই হাসছেন খিলখিলিয়ে। আমাকে দেখেও হাসির ফোয়ারা ছোটালেন। বেশ বুঝলাম, ওঁর বিশ্বাস, গাউনের পটিতে লুকনো হিরের ব্রোচ আমি দেখতে পাইনি।
কিছুক্ষণ পরেই অভ্যাগতরা ঢুকলেন ডাইনিং রুমে। আমি দেখে নিলাম মিসেস সিবাইল ক্যাভানাগ কী কী গয়না পরে আছেন।
তারপর সবার অলক্ষিতে বেরিয়ে এলাম সামনের দরজা দিয়ে বাড়ির বাইরে। ডাকলাম একটা ঘোড়ার গাড়ি। সোজা চলে এলাম বন্ড স্ট্রিটে আমার আস্তানায়।
ঘণ্টা বাজাতে দরজা খুলে দিল দ্বাররক্ষক। চেয়ে রইল অবাক চোখে। সোজা গেলাম আমার জুয়েল কেসগুলোর সামনে। বিশেষ একটা কেসে থাকে যত রাজ্যের সস্তা জড়োয়া গয়না। তুলে নিলাম একটা হিরের ব্রোচ। গেঁথে রাখলাম আমার কোটের ভেতর দিকে। তারপর দ্বাররক্ষককে ওপরে পাঠিয়ে ঘুম ভাঙালাম চাকর অ্যাবেল-এর। পাঁচ মিনিটেই পাশে এসে দাঁড়াল অ্যাবেল– পরনে শুধু ট্রাউজার্স আর শার্ট।
বললাম সুসংবাদ, অ্যাবেল। যে দলটার খোঁজ করছিলাম, তাদের সন্ধান পেয়েছি।
সোল্লাসে বললে অ্যাবেল, গুড গুড স্যার!
লেডি ফেবারের নাচের আসরে আজ রাতে সিবাইল ক্যাভানাগ নামে এক ভদ্রমহিলা হাজির আছেন। লেডি ফেবারের পেনড্যান্ট তার কাছে আছে, আছে আর একটা হিরের ব্রোচ। ব্রোচটা আমি দেখেছি। পেনড্যান্টটাও যদি ভদ্রমহিলার কাছে পাওয়া যায়, তাহলে কেস কমপ্লিট হয়ে গেল।
উল্লাসে বিকট মুখভঙ্গি করে অ্যাবেল বললে, হুই! জানতাম মেয়েরা আছে এর মধ্যে। পাকা চোর এই সিবাইল ক্যাভানাগ, তাই না?
