তালে তাল ঠুকে তাই বলতেই হল, তা যা বলেছেন। ভয়ানক রহস্যই বটে।
রহস্যের জট ছাড়াতে পেরেছেন কি? সন্দেহ হয় কাউকে? আহা, সময় কাটানোর জন্যে না হয় একজনকে সন্দেহই করা গেল!
কথার ধরন দেখে গা-পিত্তি জ্বলে গেল। তা সত্ত্বেও মুখে হাসি টেনে এনে বললাম, আপনার কাউকে সন্দেহ হচ্ছে নাকি? বলেই ফেলুন না–কিছুটা সময় তো কাটবে।
ফিক ফিক করে হেসে বললেন, সিবাইল ক্যাভানাগ–সেরকম কাউকে তো দেখছি না এঘরে। যাজক মশায়ের পকেট সার্চ করা কি ঠিক হবে? পাবেন তো ধর্মোপদেশ–চুনির বদলে!
আজকের কেসটাকেও ধর্মোপদেশ বলতে পারেন। দামি পাথরের ধর্মোপদেশ। আচ্ছা, আপনি আস্তিনের মধ্যে চুনিগুলো লুকিয়ে রাখেননি তো?
কী যে বলেন! আস্তিনের মধ্যে লুকোতে যাব কেন?
সবার চোখে ধুলো দিয়ে পালাবেন বলে।
আচ্ছা মানুষ তো আপনি! ঘর ছেড়ে নড়লামই না–পালালাম কোথায়? তাছাড়া আপনি জানেন না, এই সেদিন হেইস-এর নাচের আসরে দামি পাথরের একটা ব্রোচ হারিয়েছি। হারিয়েছি মানে চুরি গেছে। কিন্তু আমার স্বামী তা বিশ্বাস করে না। রোজই গজগজ করে চলেছেন ভিড়ের মধ্যে কোথায় ফেলে দিয়েছি–দোষ চাপাচ্ছি চোরের ঘাড়ে।
আপনার নিজের কী মনে হয়?
চুরি, চুরি, নির্ঘাত চুরি। অত কাঁচা কাজ আমি করি না। ব্রোচ পাছে খুলে পড়ে যায় তাই কষে পিন দিয়ে এঁটে রাখি। কিন্তু যে লোকটি নিয়েছে, তার হাতের জাদুর তারিফ করতে হয়। ঠিক যেভাবে লেডি ফেবারের পেনড্যান্ট খুলে নিয়েছে সোনার চেন থেকে চক্ষের নিমেষে, অবিকল সেইভাবে আমার ব্রোচও খুলে নিয়েছে পিন আলগা করে দিয়ে। ভাবতেও গা শিরশির করছে। একটা চোরকে নিয়ে প্রত্যেক পার্টিতে ঘোরাফেরা করা…ছিঃ ছিঃ ছিঃ!
শুরু হয়ে গেল বকবকানি। গয়না চুরি গেলে মেয়েরা এত বকতেও পারে। বাধা দিয়ে কোনও লাভ হবে না জেনে হাসি-হাসি মুখে শুনে গেলাম ভদ্রমহিলার বাক্যস্রোত।
হাই হাউ করে বেশ কিছুক্ষণ আলতু ফালতু বকবার পর আচমকা ভদ্রমহিলা বললেন, কিন্তু এখনও পর্যন্ত কাউকে সন্দেহ করিনি আমরা করাটা কিন্তু খুবই দরকার। তাই নয় কি? যাজকমশায়কে যদি ধর্তব্যের মধ্যে না আনা যায়, তাহলে ওই হ্যাংলাপানা ছোকরাটাকে সন্দেহ করলে ক্ষতি কী বলুন?
মুখটা দেখেছেন? খাই-খাই ভাব রয়েছে না?
এন্তার খেয়ে যাচ্ছে বলেই ছোকরাকে ক্রিমিন্যাল শ্রেণির মধ্যে ফেলা যায় না। দেখতেই তো পাচ্ছেন, খাবারের লোভই ওর বেশি–অন্য কোনও লোভ আছে বলে মনে হয় না। তাছাড়া, হিরে-মণি-মুক্তোর দিকে যার নজর থাকবে, সে এখানে দাঁড়িয়ে সুগন্ধী বরফ গিলবে কেন? নাচঘরে ঘুরঘুর করলেই পারত? মণিমুক্তো যেখানে রয়েছে?
তা যা বলেছেন। নাচঘরের সবাইকে অবশ্য এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে। ওই যে দেখছেন তালঢ্যাঙা লোকটা মাঝে-মাঝে সারস পাখির মতো ঘাড় লম্বা করে এদিক-ওদিক তাকিয়েই বুটের দিকে তাকাচ্ছে…বুট দেখছে, না, অন্য কিছু দেখছে?
হয়তো অন্য কিছুই দেখছে। তবে মানুষের মাথা দেখে তো আর সিদ্ধান্ত খাড়া করা যায় না।
হেসেই গড়িয়ে পড়লেন সিবাইল ক্যাভানাগ–সত্যি! কত কম জানেন আপনি! আরে মশাই, মাথাই তো মানুষের চরিত্র! ধরুন একজন বুড়ো লোকের ব্রহ্মতালু। খুঁটিয়ে যদি দেখেন তো এত খবর পাবেন তাজ্জব হয়ে যাবেন। বেশ তো ওই যে চকচকে ছাদের মতো টেকোমাথা লোকটাকে দেখছেন–টাক দেখেই কি বুঝছেন না টাকার কুমির হলেও অতিশয় সজ্জন ব্যক্তি? আমি অবশ্য আমার শত্রুর মাথাতেও অমন টাক পছন্দ করব না।
বলতে বলতে আবার খিলখিল করে হাসতে হাসতে কিলবিল করে কেঁপে উঠলেন ভদ্রমহিলা। মেজাজটাকে কোনওমতে সামলে রেখে শুধোলাম,আপনারও শত্রু আছে নাকি?
আছে কি নেই সবাইকে জিগ্যেস করেই দেখুন না।
চলুন–মুখ দিয়ে কথাটা বার করতে না করতেই নাচঘর থেকে একটা বিরাট দল হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ল এই ঘরে। সিবাইল ক্যাভানাগ আর আমি দুজনেই কোণঠাসা হয়ে গেলাম সিঁড়ির রেলিংয়ের পাশে। কিছুক্ষণ পরেই হই-হই করতে করতে দলটা বেরিয়ে যেতেই সিঁড়ির দিক থেকে সরে আসতে গেলেন সিবাইল ক্যাভানাগ। গাউনের তলার দিকটা যে রেলিংয়ের লোহার পেরেকে আটকে গেছে, খেয়াল করেননি। টানের চোটে ছিঁড়ে গেল ভেতরকার সিল্কের পটি। পটির তলা বরাবর ফাঁকা জায়গাটায় দেখলাম সেলাই করা রয়েছে একটা অতীব সুন্দর হিরের ব্রোচ–দেখতে আধখানা চাঁদের মতো।
ভদ্রমহিলার তখনও খেয়াল নেই যে গাউন ছিঁড়েছে। আরও একটু টান দিতেই বেশ খানিকটা সিল্ক-পটি ছিঁড়ে নিয়ে ঝুলতেই ঠেকল পায়ে। চকিতে নিচের দিকে তাকিয়ে অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রবেগে গাউন সামলে নিলেন সিবাইল ক্যাভানাগলুকিয়ে ফেললেন ছেঁড়া অংশসমেত হিরের ব্রোচ।
রক্তিম মুখে আড়চোখে তাকালেন আমার দিকে–ভাবখানা, আমি কি দেখে ফেলেছি লুকোনো ঐশ্বর্য?
আমি কিন্তু সেরকম কোনও ভাবই চোখেমুখে প্রকাশ করলাম না। ডিটেকটিভ হই আর না হই, একটু-আধটু অ্যাকটিং করতে হয় আমাদের সবাইকেই।
ভীষণ আক্ষেপের সুরে তখন বললেন ভদ্রমহিলা, কী কাণ্ড বলুন তো! ছিঁড়ে ফেললাম গাউনটা!
তাই নাকি? গাউন ছিঁড়েছে? সামনে, না পেছনে?
কী কষ্টে যে কণ্ঠস্বর সংযত রেখে কথা কটা বলেছিলাম, তা শুধু আমিই জানি। বিস্ময়ের বন্যায় তখন আমার বুক ধড়াশ-ধড়াশ করছে; বিরাট এই আবিষ্কারের ফলে যে এ বছরের সেরা গল্প হাতের মুঠোয় এসে গেল, তা সমস্ত সত্তা দিয়ে উপলব্ধি করছি; তা সত্ত্বেও চোখমুখ নির্বিকার রেখে ছেঁড়া গাউন দেখার অভিনয় চালিয়ে যেতে হল। একটু ভুল হলেই গল্প মাঠে মারা যাবে জেনে সন্ত্রস্ত হয়ে থাকতে হল।
