মণিরত্ন আমিও চিনি, লেডি ফেবার। বার্মিজরা নানা রঙের চুনি বেচে, সে খবরও রাখি। তবে কি জানেন, নীল চুনি বলে যেটাকে চালায়, সেটা আসলে নীলকান্তমণি। যাক সে কথা, কতক্ষণ আগে হারিয়েছেন আপনার পেনড্যান্ট?
দশ মিনিট আগে।
তাহলে এইমাত্র যার সঙ্গে নেচে এলেন, চোর হয়তো সে-ই!
অ্যাঁ!
–আজ্ঞে হ্যাঁ। নাচের আসর আজকাল বড়লোক হওয়ার সবচেয়ে সোজা পথ।
দেখুন মশায়, তেড়ে উঠলেন লেডি ফেবার। এইমাত্র যার সঙ্গে নেচে এলাম, তিনি আমার স্বামী। দয়া করে এসব কথা তাকে বলতে যাবেন না। চুনি হারানোর শোকে পাগল তো হবেনই, আমাকেও আর দু-চক্ষে দেখতে পারবেন না।
বলেই সাঁই সাঁই করে চলে গেলেন লেডি ফেবার। কী আর করি, গুটিগুটি গিয়ে দাঁড়ালাম সিঁড়ির গোড়ায়। আমি তো এখানে এসেছি সাম্প্রতিক জহরত চুরি সম্পর্কে খোঁজ খবর নিতে– কানাঘুসোয় যদি কিছু শুনতে পাওয়া যায়–এই আশায়। চুরিগুলো মামুলি চুরি নয় রীতিমতো বিস্ময় জাগানো। সুতরাং টনক নড়েছে আমার।
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলাম নাচঘরের দৃশ্য। লন্ডন শহরে এরকম নাচঘর আরও অনেক আছে। চেহারায় আর চরিত্রে প্রায় একইরকম–একটু যা উনিশ বিশ। ছেলেমেয়ে বুড়োবুড়ি নেচেকুঁদে বেড়াচ্ছে বিভিন্ন ঢঙে। সবাই চায় শরীরের তৎপরতা দেখাতে। রহস্যময় এই কক্ষে কোনও ব্যক্তি হাতসাফাইয়ের ফন্দি এঁটে চলেছেন, তা বোঝা মুশকিল। অথচ এ চুরি থামানো দরকার। নইলে লন্ডনের জহরত বিক্রির ব্যাবসা দারুণ চোট খাবে। আমার কারবারেও মন্দা দেখা দেবে।
জীবনে অনেক চাঞ্চল্যকর অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। খাতায় সব লেখা আছে। তা থেকে দু একটা ইন্টারেস্টিং কেস পাঠকপাঠিকাদের সামনে হাজির করেছি। যারা পড়েছেন, তারা জানেন, নিজেকে কোনওদিন ডিটেকটিভ বলে জাহির করতে যাইনি। ডিটেকটিভদের যে যোগ্যতা আছে, আমার তার কিছুই নেই। তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা হল দূরদৃষ্টি, আমার তা মোটেই নেই। অনেক কেসে নাক গলিয়েছি ঠিকই, মাথাও ঘামিয়েছি কিন্তু তা গোয়েন্দাগিরি করার জন্যে নয় কারুর না কারুর উপকার করার জন্যে–যাতে তার উপকার আমি পরে পেতে পারি। আর অস্ত্রশস্ত্রের কথা যদি বলেন তো ও সবের ধারকাছ দিয়েও আমি যাইনি কোনওদিন। হাতিয়ার আমার একটাই– কমনসেন্স। কোনও কোনও ক্ষেত্রে দৈব আমার সহায় হয়েছে; দৈবাৎ মোক্ষম সূত্র হাতে এসে গেছে। স্রেফ কপাল জোরে সোজা পথের সন্ধান পেয়েছি রহস্যের গোলকধাঁধায় ঘুরে মরতে হয়নি।
এইরকম একটা আশা নিয়েই এসেছিলাম লেডি ফেবারের প্রাসাদে। অচেনা কোনও মুখের দর্শন পেলেও পেতে পারি, মুখ ফসকে কেউ কোনও কথা বলে ফেলতে পারে, অথবা নিছক ঝেকের মাথায় এমন পথে পা দিতে পারি যা গত কয়েক হপ্তাব্যাপী অন্ধকারময় প্রহেলিকার মধ্যে আলোর সন্ধান দিতে পারে।
তা সত্ত্বেও নাচঘরে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকাই সার হল। সমস্ত প্রচেষ্টাটাই মনে হল বৃথা গেল। আশেপাশে সন্দেহভাজন কোনও মুখ দেখলাম না, সন্দেহজনক কোনও কথা কানে ভেসে এল না। মেজাজ গেল খিঁচড়ে। নাচঘর ছেড়ে এসে দাঁড়ালাম গাছপালা রাখার ঘরে। সবুজ পাতাগুলোর দুলুনি দেখে অনেক শান্ত হল মনটা।
এ ঘরে এখন লোকজন বেশি নেই। টেবিল ভরতি খাবার নিয়ে গব-গব করে গিলে চলেছেন জেনারেল শারার্ড। এই এক লোক! খেতেই আসেন এবং খেয়ে যান। যতক্ষণ না ডিনার টেবিলে খাবার সাজানো হচ্ছে, ততক্ষণ রিফ্রেশমেন্ট টেবিলে বসেই খেয়ে যাবেন। সব ভোজসভায় তাঁকে দেখি ঠিক এইভাবেই খেয়ে যেতে। সেন্ট পিটার্স গির্জের সহকারী যাজক রেভারেন্ড আর্থার মেলব্যাঙ্ককে দেখলাম চুকচুক করে চায়ে চুমুক দিতে। রোগা প্যাকাটি এক তরুণ স্কুলের বাচ্চাছেলের মতো সুগন্ধী বরফ খাচ্ছে তো খাচ্ছেই। আর দেখলাম সিবাইল ক্যাভানাগ নামের সেই মহিলাকে, যাকে দেখা যায় লন্ডনের সব নাচের আসরে। ভদ্রমহিলা খুব মিশুকে–আসর জমাতে পারেন। সমাজের মাথাদের সঙ্গে যোগাযোগও নিশ্চয় আছে, নইলে সবকটা নাচের আসরে এসে জোটেন কী করে। দেখতে শুনতেও মন্দ নয়। আমি কিন্তু ভদ্রমহিলার বকবকানি সইতে পারি না বলে দেখা হলেই এড়িয়ে চলি।
সেদিন কিন্তু এড়াতে পারলাম না। হঠাৎ মুখোমুখি হতেই সোল্লাসে এমন চিৎকার করে উঠলেন যে পালাবার পথ খুঁজে পেলাম না।
চা আনান, চা আনান, এক কাপ চা আনান আমার জন্যে। কর্নেল হার্নারকে চেনেন তো? তেষ্টার দেশ থেকে এসে দশ মিনিট কথা বলে গেলেন আমার সঙ্গে–সেই থেকে তেষ্টায় মরে যাচ্ছি।
মরে যাইরে। কী আহ্লাদ! ওঁর চা-তেষ্টা পাবে বকর-বকর করে, আর আমাকে চা বয়ে এনে দিতে হবে তার জন্যে!
কী আর করা যায়! ভদ্রতার খাতিরে এনে দিলাম এক কাপ চা। সেইসঙ্গে অমায়িক হেসে একটু জ্ঞানদান করতেও ছাড়লাম না–নার্ভের বারোটা বাজিয়ে বসবেন দেখছি। শেষকালে খানাপিনাই বাদ যায়।
নার্ভ কি আর আছে আমার–চায়ের স্বাদ নিতে নিতে বললেন সিবাইল ক্যাভানাগ–দুধে দাঁত যেদিন বিসর্জন দিয়েছিলাম, আমার তো মনে হয় সেইদিন থেকেই নার্ভ জিনিসটাও ছেড়ে গেছে আমাকে। যাক সে কথা–খবর শুনেছেন তো? ভয়ানক ব্যাপার, তাই না?
চোখমুখ ভয়ানক করুণ করে কথাগুলো বললেন সিবাইল ক্যাভানাগ। প্রথমটা বুঝতে পারিনি কী বলতে চাইছেন, তারপরেই খেয়াল হল, নিশ্চয় লেডি ফেবারের চুনি খোয়ানোর ব্যাপারটা শুনে ফেলেছেন।
