*যুগান্তর পত্রিকায় প্রকাশিত (পুজো সংখ্যা ১৯৭৫)।
লাল চুনি পেকে হলুদ
লেডি ফেবার বললেন, সোজা ব্যাপারটা শুনুন। চোরদের আপ্যায়ন চলছে এখানে। খানাপিনা করাচ্ছি তস্করদের। ছিঃ ছিঃ ছিঃ! ভাবতও গা শিরশির করছে আমার। তাকাতে পারছি না অতিথিদের মুখের দিকে। কী লজ্জা! খাতির করে যাদের ডেকে এনেছি, চোর রয়েছে কি না তাদের মধ্যে!
দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছে ভদ্রমহিলার পোর্টম্যান স্কোয়ারের বাড়িতে গাছপালা রাখবার ঘরে। ঝকমকে নাচঘরটা দেখা যাচ্ছে সামনেই। কত রঙের বাহার সেখানে। ঝলমল করছে অসংখ্য জহরতের জৌলুসে। একপাশে আমাকে নিয়ে গিয়ে লেডি ফেবার আমাকে দেখাচ্ছেন বিখ্যাত চুনির মালা। মালা থেকে উধাও হয়েছে একটা পেনড্যান্ট। খুবই সূক্ষ্ম কারুকাজ করা পেনড্যান্ট। উধাও হওয়া মানে কোথাও খসে পড়েনি–চুরি হয়েছে। দুর্ঘটনা নয়–লোপাট হওয়া।
বেশ কিছুদিন ধরেই এমনি বিস্ময়কর জহরত চুরি চলছে লন্ডনে। লন্ডন শহর হতভম্ব হয়ে যাচ্ছে এক-একটা ঘটনার পর। ১৮৯৩ সালের মরশুমে যেন মণিমাণিক্য চুরির হিড়িক পড়ে গেছে শহর জুড়ে।
লেডি ফেবারের বাড়িতে এসেছি মাত্র ঘণ্টাখানেক আগে। এর মধ্যেই বেশ কয়েকজনের ঘ্যানঘ্যানানি শুনতে হল। জহরত চুরি গেলে এত নাকি কান্নাও কাঁদতে পারে মেয়েগুলো! হ্যাঃ হ্যাঃ!
ডানহোমের কাউন্টেসের একটা হিরের ব্রোচ চুরি গেছে। পোশাক আটকে রাখার দামি পিন। দেখতে আধখানা চাঁদের মতো।
মিসেস কেনিংহাম-হার্ডি হারিয়েছেন মুক্তো আর নীলকান্ত মণির কণ্ঠহার।
পান্নার লকেট খুইয়েছেন লেডি হ্যাঁলিংহাম। নেকলেস থেকে লকেটটা হয়তো চাকরানিও সরিয়ে থাকতে পারে, এমন একটা বাঁকা সন্দেহও প্রকাশ করতে ছাড়েননি ভদ্রমহিলা।
তারপরেই শুনলাম লেডি ফেবারের পেনড্যান্ট চুরির কাহিনি। বেশ বুঝলাম, আজকের এই নাচের আসর জমবে ভালোই নাচের জন্যে নয়–জহরত হাওয়া হয়ে যাওয়ার বহু ঘটনার জন্যে।
সাত পাঁচ ভাবছি আর লেডি ফেবারের পেনড্যান্টহীন রত্নমালা উলটেপালটে দেখছি। জিনিসটা নিসন্দেহে মূল্যবান। পেনড্যান্টটা মুচড়ে বার করে নেওয়া হয়েছে অপূর্ব এই রত্নমালা থেকে। যেই নিক, তার যে সৌন্দর্যপিপাসা আছে বিলক্ষণ, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ভালো জিনিসই নিয়েছে। তবে লেডি ফেবার এমন কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন যে মুখ ফুটে চোরের রুচির প্রশংসা করতে পারছি না।
তাই চোখে-চোখে না তাকিয়ে রত্নহারের দিকে চোখ রেখে বললাম, কাটা জায়গাটা দেখেছেন? কঁচি দিয়ে সোনার চেন কাটা হয়েছে। তারপর ছিঁড়ে নেওয়া হয়েছে। যিনি নিয়েছেন, তার নাম যখন জানা নেই, তখন তাকে পকেটমার বলতে দ্বিধা নেই। কেননা, কাটার জায়গা দেখে বেশ বোঝা যাচ্ছে, কঁচিটা পকেটমারদের কঁচি।
মুখ-টুখ লাল হয়ে গেল লেডি ফেবারের, বলেন কী! তাহলে একজন পকেটমারকেও খাতির করে খানাপিনা করাচ্ছি!
পকেটমার না হলেও পকেটে হয়তো পকেটমারদের কঁচি রেখে দিয়েছেন–ভয়ে ভয়ে বললাম আমি।
কী ভীষণ! কী ভীষণ! আর্ত চিৎকার করে উঠলেন লেডি ফেবার। আমার যা গেল তা তো গেলই। কিন্তু অভ্যাগতদের অবস্থাটা এখন কী হবে বলুন তো। কে যে কখন কপাল চাপড়াবে… জানেন তো এ হপ্তায় এই নিয়ে তিন-তিনটে নাচের আসরে জহরত চুরি হয়ে গেল। এর শেষ কোথায়?
পুলিশ ডাকুন, শেষ দেখতে পাবেন। দ্বিধা ঝেড়ে ফেলুন। অভ্যাগতদের সার্চ করতে দেবেন, তাদের অপমান করবেন না–এই মনোভাব নিয়ে থাকলে তস্কর মহাশয় মনের সুখে চুরি চালিয়ে যাবেন। বুঝতেই তো পারছেন পাইকারি হারে চুরি চলছে–ডাকাতিও বলতে পারেন–সমাজে মিশে গিয়ে সামাজিকতা রক্ষে করার ফাঁকে-ফাঁকে চুরিতে হাত পাকিয়ে চলেছেন একজন। ধরতে তাকে হবেই। ডাকুন পুলিশ।
জুল-জুল করে তাকালেন লেডি ফেবার, খুব হালকাভাবে কথাটা বললেন বটে, কিন্তু…পেনড্যান্টের প্রত্যেকটা চুনির দাম কত জানেন? আমার স্বামীর হিসেবে আটশ পাউন্ড–প্রত্যেকটার।
তা তো হবেই। দেখতেও অপূর্ব। অবিকল বর্ণনা শোনাতে পারবেন? প্রত্যেকটা চুনিকে দেখতে কীরকম?
শুনে কী করবেন? খুঁজে পেতে কি সুবিধে হবে?
এমনও তো হতে পারে, চোরাই চুনি বিক্রির জন্যে আমার কাছেই এল? তখন যদি বর্ণনা মতো মিলিয়ে নিতে পারি, আপনার হারানিধি আপনাকেই ফিরিয়ে দিয়ে যাব। লেডি ফেবার, এ সংসারে অনেক অদ্ভুত ঘটনা ঘটে।
ঝঙ্কার দিলেন লেডি ফেবার, আমি চাই চোরকে আপনি ধরুন।
আমিও তাই চাই। কেন না, এইভাবে যদি চুরি চলতে থাকে, লন্ডনের কোনও ভদ্রমহিলা আর আসল রত্ন গায়ে চাপাবেন না। ফলে, লোকসান তো আমারই।
দেখুন মশাই, আমার অতিথি অভ্যাগতদের চুলটি ছুঁতে দেব না আপনাকে। যা করবেন, বাইরে করুন। নাচঘরে বা বাড়ির মধ্যে ঝামেলা করতে যাবেন না।
ঠিক, ঠিক। মাথা ঠান্ডা করেই কাজ করা উচিত এখন। কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস, একজন নয়, একটা গোটা দল রয়েছে এই চুরির পেছনে। কাজেই আপনার বাড়ির মধ্যে কোনও হামলাই আমি করব না। থাক সেকথা। এখন বলুন, আপনার হারানো চুনিদের দেখতে কীরকম।
গোটা পেনড্যান্টটাই গোলাপ ফুলের মতো দেখতে। কণ্ঠমালাটা লর্ড ফেবার এনেছিলেন। বর্মা থেকে। আংটির আকারে সাজানো সারি-সারি লাল চুনি ছাড়াও পেনড্যান্টের মধ্যে আছে চারটে হলদে চুনি, লোকে বলে, লাল চুনি নাকি পেকে হলুদ হয়ে আসছিল। কুসংস্কার ছাড়া অবিশ্যি কিছুই নয়। তবে কি জানেন, হলদে চুনিগুলোকে দেখলে মনে হয় যেন আগুনে ঠাসা, হিরের মতো ঝলমলে। চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়।
