লাম্পট্য করে এসেছ, এই তো? নিশাচর বাদুড় কোথাকার। বলে ঘটাং-ঘটাং করে টেবিল সাজাতে শুরু করল ভোমরা।
ইন্দ্রনাথ নস্যির ডিবে খুলতে খুলতে ঘরের জিনিসপত্র দেখতে লাগল। পুলিশম্যানের ন্যাড়া ঘর। দেওয়ালের তাকে খানকতক বই আর ম্যাগাজিন, একটা ইংরেজি বই হেগ-এর জীবন কাহিনি। একটা কালো ট্রাঙ্ক কাঠের টেবিলের ওপর। সিঙ্গল খাটের সাদা চাদর লাটঘাট হয়ে রয়েছে। ঘরের কোণে টানা দড়িতে ঝুলছে পুলিশি জামাপ্যান্ট। নিচে একটা টুল। টুলের তলায় একটা বড় মুখ কাঁচের জার, তার মধ্যে তরল পদার্থে চর্বির মতো কী যেন ভাসছে। হেঁট হয়ে জারটা টেনে নিয়ে গন্ধ শুঁকে ইন্দ্রনাথ বললে, অ্যাসিড।
ভোমরা বলে উঠল, কলতলার জিনিস, কলতলায় রাখলেই হয়। এত অগোছালো ইন্দ্রদা, কী আর বলব, এ লোককে কে বিয়ে করবে?
কেউ নেই বুঝি?
আমি তো আছি। কিন্তু খালি ল্যাজে খেলছে। আপনিই বলুন, জোয়ান মানুষের জোয়ানী থাকলে মানায়?
খাটের ওপর বসতে-বসতে ইন্দ্রনাথ বললে, তোদের মধ্যে মিল আছে একটা জায়গায়।
কোন জায়গাটায়? পাউরুটি কাটতে কাটতে বললে ভোমরা।
তোরা দুজনেই পাগল।
আমার চোদ্দোপুরুষ পাগল নয়।
কিন্তু তুই বদ্ধ পাগল। পয়লা নম্বর বিয়ে-পাগল, আর তোর ভাবীবর গান-পাগল।
অমনি চোখে ঘোর এসে গেল ভোমরার, তা যা বলেছেন দাদা–এই কাঠখোট্টা বেটনবাবু– খোদ রবিশঙ্কর হয়ে যায় ক্লাসিক্যাল মিউজিক শুনলেই। আমারও অবশ্য তাই হয়।
সুতরাং পাগলে-পাগলে মিলবে ভালো।
বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এসে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে লোকনাথ বললে, আপনার পাগলি বোনকে বলে দিন খাওয়া-দাওয়ার পর যেন কেটে পড়ে–টেনে ঘুম দিতে হবে।
সটাৎ করে ফণা তুলে ফেলল কালনাগিনী, বয়ে গেছে তোমার সঙ্গে দুপুর কাটাতে। খাওয়ার টেবিলের চেয়ার টানতে টানতে ইন্দ্ৰনাথ শুধু বলল–নারদ! নারদ!
.
গভীর রাত। শহরের পথগুলো এখন খাঁ-খাঁ করছে বললেই চলে। মাঝেমধ্যে একটা করে ট্যাক্সি উড়ে যাচ্ছে। তারপরেই আবার নিস্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে চারদিক।
নৈঃশব্দ্য ভাঙল একটা মোটর সাইকেলের আওয়াজে।
ধীর গতিতে রাস্তা কামড়ে ধরে গড়িয়ে যাচ্ছে চাকাদুটো। একচক্ষু দানবের চোখ জ্বলছে– অমাবস্যার রাতে আরও ধকধকে মনে হচ্ছে সেই চোখকে। মোড় ঘুরে দূর হতে দূরে মিলিয়ে গেল দ্বিচ্যান।
প্রায় নিঃশব্দে গড়িয়ে আসা মারুতিটাকেই দেখা গেল এরপরেই। হেডলাইট জ্বলছে না। টিমটিমে সাইডলাইট দুটো কোনওরকমে নিয়মরক্ষে করে চলেছে।
আচমকা ব্রেক কষেই বাঁয়ের গলিতে ঢুকে গেল ডিপ গ্রিন কালারের মারুতি।
মোটর সাইকেলের আওয়াজটা শোনা গেল তারপরেই। একটু আগেই যেদিকে অদৃশ্য হয়েছিল। একচক্ষু ধীরগতি দ্বিচক্র দানব–এখন সেইদিক থেকেই উল্কাবেগে ধেয়ে আসছে এই মোটর সাইকেল। আওয়াজের গভীরতা একই। থ্রি পয়েন্ট ফাইভ হর্সপাওয়ারের এ মডেল একটা কোম্পানিই তৈরি করে ইন্ডিয়ায়।
মোড় ঘুরেই গতি কমে এল মোটর সাইকেলের। আস্তে ব্রেক কষল ল্যাম্পপোস্টের পাশে। চালক নেমে দাঁড়িয়ে স্ট্যান্ডে তুলে দিল ভারি যন্ত্রযান। পেছনের চাকার পাশের বাক্সে লাগাল চাবি।
ল্যাম্পপোস্টের অত্যাধুনিক আলোয় বড় লোলুপ, বড় তৃষিত মনে হচ্ছে লোকটার দুই চক্ষু। চোখের পাতা তার পড়ছে না। শিকারি শ্বাপদের মতোই অনিমেষে চেয়ে রয়েছে ফুটপাতে নিদ্রিত বাসিন্দাটির দিকে। বয়স তার অনেক, এক মুখ দাড়িগোঁফ সবই সাদা। ময়লায় জট পাকানো চুলও সাদা। সুতো দিয়ে বাঁধা পুরু লেন্সের চশমাটা সযত্নে রেখেছে একরাশ বইয়ের পাশে। এই সেই পণ্ডিত পথের পাগল যার ছবি কিছুদিন আগে বেরিয়েছিল খবরের কাগজে। সারাদিন রোদে বই মেলে পড়ে হেঁট হয়ে–রাতে ল্যাম্পপোস্টের আলোয়–তারপর ঘুমোয় ভোরের আলো না ফোঁটা পর্যন্ত। অজাতশত্রু এই গ্রন্থকীটের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে যমালয়ের দূত…
বাক্স খুলে গেছে। ঘুমন্ত উন্মাদের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে বাক্সের মধ্যে থেকে একটা পাথর টেনে বের করল নিশাচর পিশাচ। এখন জ্বলছে তার চোখ দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা উদগ্র হয়ে উঠেছে শিরায় উপশিরায়।
পাথরটা লম্বায় দেড় ফুটের বেশি নয়, চওড়ায় এক ফুটের বেশি নয়, আড়াই ইঞ্চির বেশি পুরু নয়। বলিষ্ঠ দুই লোমশ হাতে পাথর ধরে মোটর সাইকেলকে পাক দিয়ে ঘুমন্ত বৃদ্ধের দিকে এগোল রাতের আতঙ্ক…
আচমকা দুটো বলিষ্ঠতর হাত ছোঁ মারল পেছন থেকে।
ছিনিয়ে নিল পাথর। একই সঙ্গে আগন্তুকের চামড়ার হোলস্টার থেকে ছিনতাই হয়ে গেল রিভলভার।
নল ঠেকল তারই পিঠে।
পাথর কঠিন কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হল কানের কাছে, ঢের হয়েছে ভ্যামপায়ার–সিরিঞ্জটা এবার দাও।
কবিতা বললে, আঁচ করলে কী করে?
ইন্দ্রনাথ বললে, ক্যালকুলেশন করে।
ধুত্তোর তোমার ক্যালকুলেশন। ঝেড়ে কাশো, ঠাকুরপো।
আর্থার লা বার্ন-এর লেখা হেগ–দ্য মাইন্ড অফ-এ মার্ডারার বইখানা তাকে যখন দেখলাম, কাঁচের জারে যখন অ্যাসিডে চর্বি ভাসতে দেখলাম–তখনি আমার সন্দেহের প্রমাণ পেয়ে গেলাম।
আরে গেল যা। সন্দেহটা তোমার মাথায় এল কী করে?
বউদি, এই জন্যেই বৈজ্ঞানিকরা বলেছেন, মেয়েদের মগজের ওজন পুরুষদের চেয়ে কম।… হ্যাঁ, হা, বডি ওয়েটের সঙ্গে রেসিও-টা ঠিকই আছে…কী বলছিলাম? সন্দেহ…হেগ একখানা উপন্যাস পড়ে আর জনাকয়েকের জীবনী জেনে ঠিক সেইরকমই হতে চেয়েছিল। হেগ-এর মতোই হাতের লেখা নকল করতে পোক্ত ছিল রাতের আতঙ্ক, হেগ-এর মতোই ছেলেবেলায় তার বাবা-মা সমবয়সিদের সঙ্গে তাকে মিশতে দেয়নি। হেগ-এর মতোই সে সঙ্গীতপাগল, সুদর্শন, রমণীপ্রিয় অথচ বিবাহে নারাজ। সুতরাং হেগ তাকে ইন্সপায়ার করেনি তো? বাড়িতে দেখলাম হেগ-এর চাঞ্চল্যকর জীবনকাহিনি, দেখলাম কাঁচের জারে সালফিউরিক অ্যাসিডে ইঁদুর গলানোর চিহ্ন–হেগও এইভাবে প্র্যাকটিস করেছিল..ঠিক এইভাবে সালফিউরিক অ্যাসিডে ইঁদুর ফেলে দিয়ে দেখত গলে যায় কীভাবে…শুধু একটা ব্যাপারে মোডাস অপারেল্ডি-তে ইমপ্রুভমেন্ট দেখিয়েছিল রাতের আতঙ্ক…হেগ রক্ততৃষ্ণা মেটাত শিরা কেটে গেলাস ভরে রক্ত নিয়ে…আমাদের এই রক্তলোলুপের তৃষ্ণা মিটত সিরিঞ্জ ভর্তি রক্ত টেনে নিয়ে কনুইয়ের কাছে শিরা থেকে–তারপর পাথর দিয়ে ঘেঁতো করে দিত ছুঁচ ফোঁটানোর চিহ্ন।
