নিরক্ত মুখে কবিতা বললে, কিন্তু ওকেই ঠিক সন্দেহ করলে কেন? কেন রাতের-পর-রাত মারুতি নিয়ে পেছনে লেগেছিলে?
কী বুদ্ধি! এখনও ধরতে পারলে না? সর্ষের মধ্যে ভূত থাকলে সেই সর্ষে পোড়ায় ভূত পালায় কি? রক্ষক যদি ভক্ষক হয়–আইন কি রক্ষে পায়? ভারি পাথর নিয়ে কোনও খুনি কি আজ সেন্ট্রাল, কাল নর্থ, পরশু সাউথে খুন করে বেড়াতে পারে? পাথরগুলো মাথায় বয়ে নিয়ে গেলেও তো টহলদার ট্রাফিক সার্জেন্টদের চোখে পড়বে? তবে কী করে বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মারণ প্রস্তর হাতিয়ার? রক্ষকদের বাহনে নয় তো? কিন্তু এক এরিয়ার ট্রাফিক সার্জেন্ট অন্য এরিয়ায় যায় কী করে? আজ মধ্য, কাল উত্তর, পরশু দক্ষিণ করে বেড়াচ্ছে কী করে? সারা শহরে টহল দিয়ে বেড়ানোর এমন অবাধ অধিকার থাকে কার? এমন একজন অফিসারের যার কাজের পরিধি সারা শহর জুড়ে। খোঁজ নিয়ে জেনে গেলাম, ঠিক যে-যে রাতে পাথর নেমে এসেছে পথের ঘুমন্ত মানুষের মাথায় ঠিক সেই-সেই রাতে নাইট ডিউটি নিয়ে শহর তোলপাড় করেছে আমাদের এই রাতের আতঙ্ক…রক্ততৃষ্ণায় গলা টা-টা করলেই সে বুকপকেটে সিরিঞ্জটা আর মোটর সাইকেলের মেটাল বক্সে পাথর ভরে নিয়ে বেরিয়ে পড়ত মনের মতো শিকারের খোঁজে…প্রথমে দেখে যেত… তারপর ফিরে আসত…মনের মতো পাথরগুলো পেত কোথা থেকে? একটাই জায়গা থেকে…ইস্টার্ন মেট্রোপলিটান বাইপাশের পাশে নতুন বাড়িঘরদোরের জন্য এনে রাখা পাথরের গাদা থেকে…ভোমরা কি জানে? নিশ্চয় জানে…বিষে বিষক্ষয় হয়েছে…ভাবী বরের বিকট পাগলামির খবর পেয়ে ওর উকট বিয়ের পাগলামি সেরে গেছে…এখন চলি, বউদি…ফির মিলেঙ্গে।*
.
* কাহিনি-কল্পনার মূলে আছে যে অব্যাখ্যাত রহস্য, সবাই তা জানেন। তথ্য বর্ণনা এবং চরিত্র-চিত্রায়ণ একেবারেই মনগড়া নিছক গল্পের খাতিরে। কোনও ব্যক্তি বা দপ্তরের প্রতি তির্যক শর নিক্ষেপের তিলমাত্র অভিলাষ নেই। উদ্দেশ্য একটাই– পাঠকের চিত্ত বিনোদন।
*কোলফিল্ড টাইমস পত্রিকায় প্রকাশিত (শারদীয় সংখ্যা, ১৩৯৭)
রূপোর রেকাবি
ডাক্তার! ডাক্তার!
চোখ রগড়াতে রগড়াতে খাট থেকে নেমে এলেন ডক্টর ওঙ্কারনাথ নাগ। বীতনিদ্র রজনীর জ্বালা তখনও চোখের পাতায়–ঘোর কাটেনি মগজ থেকে। সাত সকালেই আবার কে ডাকে?
দরজা খুলে দেখলেন সহাস্যমুখ এক যুবাপুরুষকে। পরনে মুগার পাঞ্জাবি। চুনোট করা ধুতির কেঁচা লুটোচ্ছে জরিদার নাগরার ওপর। দুই চক্ষু ঝকঝক করছে কৌস্তুভমণির মতো।
ইন্দ্রনাথ! এত সকালে?
তদন্তে বেরিয়েছি, ঘরের মধ্যে পা দিয়ে বলল ইন্দ্রনাথ রুদ্র। সাহাভবনে কাল রাত্রে বিরাট চুরি হয়ে গিয়েছে। ফোন করেছিলেন সকালবেলাই!
চোখ কপালে তুলে বললেন ডাক্তার নাগ, সেকী কথা! কাল রাতেই তো গিয়েছিলাম বুড়িকে দেখতে। ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়েছিলাম।
সায় দিয়ে ইন্দ্রনাথ বললে, সেই জন্যেই তো এসেছি তোমার কাছে।
কথার সুর কানে বাজল ওঙ্কারনাথের। অথচ কথাটা পেঁচিয়ে বলেনি ইন্দ্রনাথ। চোখ তুলে তাকালেন ডাক্তার।
বিষ্ণুমণি চক্ষু অতীব প্রশান্ত সন্দেহের ঝিলিক তো নেই!
আমার কাছে কেন?
যেতে-যেতে বলব। এখুনি বেরোবে তো?
হ্যাঁ। বুড়িকেও দেখতে যাওয়ার কথা আছে। তার আগে কয়েকটা ভিজিট সেরে নেব। শেষকালে যাব চেম্বারে।
আমি বসছি।–তৈরি হয়ে নাও।
.
কিন্তু শুধু বসল না ইন্দ্রনাথ, কথা বলতে লাগল। অনর্গল কথা বলে চলল। হাজার হাজার কথা সুতীক্ষ্ণ ভল্লের মতো সবেগে বেরিয়ে আসতে লাগল মুখ দিয়ে। রাজনীতির কথা, সমাজ পিঞ্জরের কথা, বারবণিতাদের দুরবস্থার কথা, আধুনিক সাহিত্যের কথা, চিকিৎসায় অব্যবস্থার কথা, গ্রামে দুশ্চিকিৎসার কথা, ওঙ্কারনাথের পশারের কথা, রুগিদের কথা, ভেষজশিল্পের কথা, জাল ওষুধের কথা ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি।
মাথা ভোঁ-ভোঁ করতে লাগল ওঙ্কারনাথের। কঁচা ঘুম ভাঙার পর থেকে সেই যে বাক্যস্রোত শুরু হয়েছে নায়গ্রা জলপ্রপাতের মতো বিরামহীনভাবে ঝমাঝম শব্দে আছড়ে পড়ছে কানের পরদায়। যেন অবিরাম বর্ষিত লৌহগুলিকায় বিদীর্ণ হয়ে চলেছে কর্ণপটহ। গাড়ি বের করেছেন, একটির পর-একটি রুগির বাড়ি গেছেন, নাড়ি টিপেছেন, নিদান নির্ণয় করেছেন, ব্যবস্থাপত্র লিখেছেন– ফাঁকে-ফাঁকে জবাব দিয়েছেন শুধু চিন্তাসূত্রকে অটুট রাখার জন্যে। গাড়ি চালাতে-চালাতেও সহস্র আয়ুধের মতন প্রশ্নের ধারাবর্ষণের জবাব দিয়ে গিয়েছেন–সেইসঙ্গে আপ্রাণ প্রয়াস পেয়েছেন শকটচালনায় নিবিষ্ট থাকতে। অর্জুনের ক্ষুর প্রবাণও বুঝি সহনীয়। নবনীতকোমল ইন্দ্রনাথের রসনা এত কঠিন, এত শাণিত? পাষাণ-প্রক্ষেপক ভূষণ্ডী অস্ত্র বললেও চলে। শব্দরূপ লৌহগুলিকার মুহুর্মুহুঃ আঘাতে ক্রমশ বিহ্বল বিপর্যস্ত হয়ে এসেছে ডাক্তারের রাতজাগা অবসাদক্লান্ত মগজ, বৃশ্চিক দংশনের জ্বালা অনুভব করেছেন প্রতিটি স্নায়ুতন্তুতে।
অবশেষে আসল প্রশ্নে এসেছে ইন্দ্রনাথ–ছেড়েছে শক্তিশেল!
কালরাতে কোথায় ছিলে? সাহাদের বাড়ি। তারপর?
পালেদের বাড়ি।
তারপর?
আমার বাড়ি।
কটায় বাড়ি ফিরেছিলে?
রাত দুটোয়।
পালেদের বাড়ি কটায় গিয়েছিলে?
রাত দশটায়।
কাকে দেখতে?
পালেদের ছেলেটার অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়েছে–এই ভয়ে ডেকেছিলেন মহীতোষ পাল।
