আহা! আহা! লোকনাথ তোমাকে আদর করে কালকুটি বলে ডাকতে পারে কিন্তু আমি তো জানি কালো হিরে যদি কোথাও থাকে–তবে সে তুমি।
কালো হিরে তো কয়লা! আমি কয়লা?
কয়লাই তো সব গুণের আকর। কয়লার ওপরেই দাঁড়িয়ে আছে গোটা পৃথিবীর মোটা মোটা ইনডাস্ট্রি!
কয়লা ধুলেও ময়লা যায় না, টিপ্পনী কাটল লোকনাথ।
আর যায় কোথায়! তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল ভোমরা। তুমি কী? তুমি তো রকবাজ, রিপ্টুবাজ, ভ্যানতারা ভ্যামপায়ার!
কানে দু-আঙুল গুঁজে ইন্দ্রনাথ, মাথা ভেঁ-ভোঁ করছে! একী গরম-গরম গালাগাল রে বাবা। মানেও তো জানি না। ভ্যানতারা ভ্যামপায়ার কেন হবে লোকনাথ?
সারারাত তো বৈঠকবাজি করে বেড়ায়! কাজের নামে অষ্টরম্ভা। ফেরেববাজ কোথাকার!
কিন্তু রকবাজি লাইফে করিনি, হাসি-হাসি মুখে বললে লোকনাথ। বলতে-বলতে কোমরের রিভলভার সমেত বেল্ট-টেণ্ট খুলে রাখল টেবিলে। কোনও বন্ধুই ছিল না ছেলেবেলায়, বাবা-মা মিশতেই দেয়নি।
এখন তো লুসিমিসিবাবারা লাইন দিয়ে আছে পেছনে, কালনাগিনীর গলায় সত্যিই যেন এখন হিসহিসানি শোনা যাচ্ছে।
যেমন তুই দিয়ে আছিস, চেয়ার টেনে নিয়ে বসতে-বসতে বললে ইন্দ্রনাথ, কিন্তু কুকুরের ল্যাজে যতই তেল দিয়ে মলো না কেন–ও ল্যাজ সিধে হবে না। তাই না লোকনাথ? বিয়ে তো তুমি করবে না?
যাও বা করবকরব ইচ্ছে করেছিল, এইরকম ক্যাটক্যাটানি শুনে মন এখন পালাই-পালাই করছে। শার্টের বোতামে হাত দিল লোকনাথ, রান্নাঘরে যাও না কালকুটি, দেখছ না জামা খুলছি?
ওরকম বুকের নোম অনেক দেখেছি!..ইস কী বলতে কী বলে ফেললাম।
অট্টহেসে ঘর ফাটিয়ে দিয়ে ইন্দ্রনাথ বললে, এই জন্যেই তো তোর ভাবী স্বামী বলে, তোকে বিয়েই করবে না।
ইস! আমি ছাড়া ওর গতি-ই নেই। জানেন না তো মেয়ে মহলে ওর কি নাম।
কী নাম রে? রূপকুমার দ্য ইমপোটেন্ট।
ছিঃ ছিঃ ছিঃ? তা তুই-ই গণ্ডাখানেকের মা হয়ে দুর্নামটা ঘুচিয়ে দিস।
দেবই তো। সেই জন্যেই তো ঘুরঘুর করছি। রূপকুমার অবশ্য বস্তা-বস্তা চিঠি লিখেই যাচ্ছে। অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গর সই জাল করে–
মানে?
অঙ্গ-বঙ্গ কলিঙ্গকে চেনেন না? আপনি আর কী করে চিনবেন। আমার তিন স্তাবক– লাভারও বলতে পারেন যদিও আমি লাভ-টাভ করি না–শুধু মিশি।
শুধু–মিশিস?
পারমিসিভ সোসাইটি না? সবার সঙ্গে মিশতে হয় সবার সঙ্গে ঘুরতে হয় কিন্তু কারও কোলে ধরা দিতে নেই।
শুধু রূপকুমার ছাড়া–
ইয়েস, স্যার। তারপর শুনুন–অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গকে খুব নাচিয়ে চলেছি–আর নিজে নেচে চলেছি এই কলির কেষ্টটার সঙ্গে ইনি কী করেন জানেন? শুনলে ফের কানে আঙুল দেবেন..অঙ্গ–বঙ্গ-কলিঙ্গর নামে বিচ্ছিরি-বিচ্ছিরি চিঠি লেখে আমার কাছে আমি তো চিঠি পেয়েই তেড়ে গিয়ে ধরেছিলাম তিনজনকে। তিনজনেই বললে, হা, হ্যাঁ, আমাদেরই হাতের লেখা, সইগুলোও হুবহু এক– তবে মা কালীর দিব্যি–আমরা লিখিনি। তবে কে লিখেছে? ওরা ফের মা কালীর দিব্যি গেলে বললে, রূপকুমার। রূপকুমার! জালিয়াতি নম্বর ওয়ান! তাই তো এসেছিলাম হেস্তনেস্ত করতে। এসব কী হচ্ছে–হ্যাঁ কী হচ্ছে?
লুঙ্গি পরতে-পরতে লোকনাথ বললে, ওরা বলল আমি জালিয়াত?
তবে না তো কি ভগবান? তুমিই বলোনি আমাকে ছেলেবেলায় বাবার সই জাল করে মাস্টারদের ধোঁকা দিয়েছ?
বেশ করেছি।
কোনটা বেশ করেছ? অঙ্গ-বঙ্গ-কলিঙ্গকে ভড়কি দেওয়া, না, বাবার নাম ডুবোনো?
বাবার নাম ডুবোব কোন দুঃখে? অঙ্কের ক্লাসের চাইতে গানের ক্লাস ভালো লাগত বলেই সই জাল করেছি।
মিটিমিটি হাসতে হাসতে ইন্দ্রনাথ বললে, কালকুটি, থুড়ি, কটকটি, তুই-ই বা অত খাপ্পা হয়ে যাচ্ছিস কেন? কোন পুলিশের লোক এরকম গান-পাগল হয় রে? ও হে লোকনাথ, মোজার্ট শোনাও, বিঠোফেন রবিশঙ্কর শোনাও, বিসমিল্লা শোনাওযা হয় একটা কিছু শোনাও নইলে কালনাগিনী তোমাকে ছোবল মেরেই যাবে।
ঢোঁড়া সাপের বিষে আমার কচু হবে, বলে একটা ক্যাসেট বেছে নিয়ে স্টিরিওতে ঢুকিয়ে দিল লোকনাথ। ঘর গমগম করে উঠল পাগল করা সুরের ইন্দ্রজালে। সঙ্গে-সঙ্গে চোখের তারা ছোট হয়ে এল ভোমরার।
বললে অন্য সুরে, এই সুরটাই সেদিন তুমি অর্গানে তুলছিলে না?
লোকনাথের চোখেও যেন ঘোর লেগেছে। গলার স্বরে তার রেশ ভেসে ওঠে, হ্যাঁ, মোজার্টের সব চাইতে ফেমাস সুর। যতবার শুনি মনে হয় আমি এ জগতে আর নেই।
ইন্দ্রনাথ বললে, আপাতত এই জগতেই থাকো–কেন না আমার খিদে পেয়েছে।
তাই তো…তাই তো…খিদে নিয়েই তো আপনি এসেছেন…ভোমরা, ও ভোমরা…দুটো ভাত ফুটিয়ে দেবে…মাংস করাই আছে ফ্রিজে।
আমি পারব না।
তবে আমার গিন্নি হবে কী করে?
ওঃ! গিন্নি হব কি তোমার রাঁধুনিগিরি করবার জন্যে! সিলি! তোমাকে চোখে-চোখে রাখতে হবে না?
ঠিক যেমন এখন রেখেছিস, বলে ইন্দ্রনাথ, এখনও কিন্তু বলিসনি–ঘরে ঢুকলি কী করে? নাইটল্যাচের চাবি নিশ্চয় কাছে রাখিস?
ঠোঁট উলটে ভোমরা বললে, রাখতে হয় বইকি। নাইট বার্ডকে ফলো করার জন্যে অনেক কিছুই করতে হয়।
বেশ..বেশ..সেই জন্যেই রূপকুমারের বুকের লোম পর্যন্ত চেনা হয়ে গেছে।
অসভ্য! ঠিকরে গিয়ে ফ্রিজ খুলল ভোমরা এক ঝটকায়, এই তো রয়েছে ব্রেড, এই তো রয়েছে মুরগির কারি–আর কী চাই? এসো, বোসো হে রূপকুমার।
লোকনাথ বললে, আগে গেস্ট দুজনের উদর ঠান্ডা হোক–আমি আসছি টয়লেট ঘুরে। হোল নাইট–
