পুলিশের লাল মোটর সাইকেল দেখে ভিড় যেন আরও বাড়ল। ইঞ্জিন চালু রেখেই লোকনাথ বললে, মর্গে যাবেন?
ইন্দ্রনাথ বললে, তাই চল।
আমি বললাম, তাহলে আমি বাড়ি যাই।
গিয়ে পাঁঠার ঝোল খা আর বউ-এর মুখনাড়া, বলে আমাকে ঠেলে বাইক থেকে নামিয়ে দিল ইন্দ্র।
.
লাশকাটা টেবিলে শোয়ানো মড়াটার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে ইন্দ্রনাথ বলেছিল, হাঘরের ছেলে বলে তো মনে হচ্ছে না।
সত্যিই তাই। করোটি গুঁড়িয়ে ঘিলু বেরিয়ে গেলেও চোখ-মুখের গড়নে শিক্ষাদীক্ষার ছাপ রয়েছে। গায়ের রং ময়লা হলেও চামড়ার কোথাও ময়লা নেই। গালে সামান্য দাড়ি–দিন কয়েক কামানোর জন্যে। ঠোঁটের আর নাকের ধারে বুদ্ধির ছাপ রয়েছে।
লোকনাথ বলেছিল, কেয়াতলার পোবন নার্সিংহোমে ছিল। মেন্টালি ডিরেঞ্জড। পকেটে কার্ড দেখে বুঝলাম।
প্রথম তুই-ই দেখেছিলি।
হ্যাঁ। রাত দুটো নাগাদ। ঘণ্টা দুই আগেও পাক দিয়ে গেছি। একেও ঘুমোতে দেখেছি।
একা?
হ্যাঁ। ল্যাম্পপোস্টের তলায়। ও অঞ্চলে ফুটপাতের বাসিন্দা তেমন নেই।
ইন্দ্রনাথ আর কথা না বাড়িয়ে থেঁতলানো করোটিটা খুঁটিয়ে দেখেছিল। এক ঘায়েই খুলি গুঁড়িয়ে ভেতরে ঢুকে গেছে। মগজের গ্রে-ম্যাটার আর হোয়াইট ম্যাটার লাল রক্তের সঙ্গে মিশে বেরিয়ে এসেছে।
ইন্দ্রনাথ বলেছিল, পাথরটা?
পড়েছিল ডেডবডির পাশে।
তুই যখন প্রথম দেখেছিলি, তখন ছিল না নিশ্চয়।
মনে তো পড়ে না। রানিং বাইক থেকে অত দেখা যায় না।
দুটো নাগাদ চোখে পড়েছিল?
ডেডবডির বুকের ওপরেই ছিল যে।
সে পাথর এখন কোথায়? চিল, নিজে দেখবে।
যাচ্ছি। বলে, মৃতদেহের ডানহাতটা তুলে নিয়ে কনুইয়ের ভেতর দিকে চেয়ে রইল ইন্দ্রনাথ। চেয়ে থেকেই বললে, খুনিকে আটকাতে গেছিল ভিকটিম।
কী করে বুঝলে?
পাথরের চোটে থেঁতলে গেছে শিরা-টিরাগুলো। মাথায় পাথর পড়েছে বুঝেই নিশ্চয় রুখতে গেছিল। হাত জখম হওয়ার পরেই মাথা গুঁড়িয়েছে। আগের পোস্টমর্টেম রিপোর্টগুলো দেখা যাবে?
দেখবে? চলে এসো।
.
একটার পর একটা রিপোর্ট পড়ে নিয়ে ফাইল নামিয়ে রাখল ইন্দ্রনাথ।
লোকনাথ বললে, কী বুঝলে?
নিহত হওয়ার আগে প্রত্যেকেই পাথর আটকানোর চেষ্টা করেছিল। কখনও বাঁ-হাত দিয়ে, কখনও ডান হাত দিয়ে।
অনুমানের কারণ তেলানো কনুই?
কনুইয়ের ভেতর দিক।–অর্থাৎ প্রত্যেকেই দেখেছে পাথর নেমে আসছে মাথার ওপর। রুখেছে। তবুও মরেছে। আশ্চর্য!
কেন?
একটা পাথর দেখাবি?
একটা কেন সবকটা দেখাব। খুনে পাথরের মিউজিয়াম তৈরি হচ্ছে বলেই তো আমি পাগল হতে বসেছি, ইন্দ্রদা।
আমি এখনও হইনি।–চ।
.
পাথরের মিউজিয়ামই বটে। তাকের ওপর সারি-সারি সাজানো পাথর। প্রত্যেকটার তলায় একটা কাগজ। তাতে লেখা কবে কোথায় কার ডেডবডির কাছে পাওয়া গেছে রক্তপিপাসু প্রস্তুরকে। বেশির ভাগই মধ্য কলকাতায়। দুটি নর্থে। একটি সাউথে। এবং শেষেরটাই কাল রাতে উড়িয়েছে পাগলের প্রাণপাখি।
ফিতে আছে? বললে ইন্দ্রনাথ।
ফিতে? কীসের ফিতে? লোকনাথের প্রশ্ন।
মাপবার ফিতে।
মিউজিয়ামের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসার পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। টেবিলের সামনে গিয়ে ড্রয়ার টেনে ফিতে বের করে এনে দিলেন ইন্দ্রনাথের হাতে।
প্রতিটি পাথর মাপল ইন্দ্রনাথ।
বললে, কোনওটাই দেড়ফুটের বেশি লম্বা নয়, এক ফুটের বেশি চওড়া নয়, আড়াই ইঞ্চির বেশি পুরু নয়।–নিন, আপনার ফিতে। চলো হে লোকনাথ, বড় খিদে পেয়েছে।
তাহলে আমার ডেরাতেই খেয়ে নেবেন চলুন। আপনিও একা, আমিও একা।
ঘর থেকে বেরোতে-বেরোতে মুচকি হেসে ইন্দ্রনাথ বললে, তুমি একা থাকতে যাবে কোন দুঃখে? কত প্রজাপতি উড়ছে তোমাকে ঘিরে।
সিঁড়ির ধাপে পা দিয়ে হাসতে হাসতে লোকনাথ বললে, ভালো চাকরি আর ভালো চেহারা থাকলে বিয়ে পাগলীদের অভাব হয় না, ইন্দ্রনাথদা। আপনি নিজেও তা জানেন।
জানি, কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইন্দ্রনাথ, কিন্তু আমার মতো ভীষ্মের প্রতিজ্ঞা তো তোমার নেই। গুজব যা শুনছি–
গুজব? ঘাড় ফেরায় লোকনাথ। এখন তার চোখেও হাসি।
তুমি নাকি ভীমরুলকে বিয়ে করবেই ঠিক করে ফেলেছ।
প্রাণখোলা হাসি হেসে লোকনাথ বললে, ভোমরার নাম শেষপর্যন্ত ভীমরুল হয়ে দাঁড়াল আপনার কাছে?
কথা তো নয়–কটাস-কটাস হুল ফোঁটানো। ও মেয়েকে বিয়ে করলে পস্তাবে, লোকনাথ।
করছে কে?
তার মানে? বাইকের সামনে থমকে গেল ইন্দ্রনাথ, কটাস-কটাস কপচানি মিঠে-মিঠে বুলির চেয়ে অনেক ভালো? সাচবাত কোনকালে মিঠে হয়? ভোমরা ভালো মেয়ে।
কিক দিয়ে লোকনাথ বললে, নিঃসন্দেহে। কিন্তু বিয়ের বাঁধন এখন নয়।
তবে কখন?
খুনে পাথরের মালিককে ধরবার পর। আমার ইজ্জত ঢিলে করে ছেড়েছে হারামজাদা।
.
ভোমরা কিন্তু সশরীরে হাজির ছিল লোকনাথের নিরালা আলয়ে। কালো কুচকুচে মেয়ে– এক্কেবারে কালনাগিনী চেহারা। চোখমুখ যেন কাটারি দিয়ে তৈরি। তেমনি জিভের ধার। জীনস এর দু-পকেটে হাত ঢুকিয়ে দেওয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছোটবড় কোঁকড়ানো চুল আঁকিয়ে বললে, স্বাগতম ভ্যামপায়ার!
হেসে ফেলে বললে ইন্দ্রনাথ, দরজা বন্ধ অথচ ভেতরে তুমি, ব্যাপারটা কী কটকটি?
কটকটি কাকে বলছেন?
তোমাকে। তোমার নাম ভীমরুল, তোমার নাম কটকটি, তোমার নাম তেড়িমড়ি কালকুটি তো বলিনি।
কালকুটি! সঙ্গে-সঙ্গে ফণা তুলে ফেলল কালনাগিনী।
