খুনে ক্রিমিন্যাল, হৃষ্ট কণ্ঠে বললে ইন্দ্রনাথ, যেমন ছিল জন জর্জ হেগ। ১২৩ বছর আগে বেচারা ফাঁসিকাঠে ঝুলেছে। খুন করে গলা কেটে গেলাস ভরে রক্ত নিয়ে পান করত ঢকঢক করে। ভারি সুন্দর চেহারা, মেয়েবন্ধু ছিল অনেক, কিন্তু প্রেম করত না কারুর সঙ্গে বিয়ের কথাও ভাবত না। খুন করে আর কঁচা রক্ত খেয়েই তার যত আনন্দ। শেক্সপীয়রের কথা ভুল বলে প্রমাণ করে দিয়েছিল। প্রচণ্ডভাবে সঙ্গীতপ্রিয় ছিল–গানবাজনা ওকে নিয়ে যেত সুরলোকে–এই লোকই আবার অসুর হয়ে যেত, অনর্গল মিষ্টি মিথ্যে বলে যেত, পাকা শিল্পীর মতো সই জাল করত, হাতের লেখা নকল করত। খুন-টুন করে লাশগুলোকে সালফিউরিক অ্যাসিডে নিশ্চিহ্ন করে দিত। রির্মাকেবল!
রিমার্কেবল! শিউরে উঠল কবিতা।
ইন্দ্রনাথ সিগারেট ধরিয়ে বললে, হেগ নাকি সিজোফ্রেনিয়া রোগে ভুগত। মনের রোগ। আমার কিন্তু সে রোগ নেই, বউদি। সুতরাং নির্ভয়ে থেকো।
এইবার আর-একটা অতিপরিচিত কৃত্রিম কাশির আওয়াজ ভেসে এল দোরগোড়া থেকে। কাশতে কাশতেই ভেতরে এসে ইন্দ্রনাথের পাশে এসে বললে পুলিশবন্ধু জয়ন্ত, মাই ডিয়ার টিকটিকি এইসব ব্যাপারই এখন আমার মাথায় ঘুরছে।
রক্ততৃষ্ণা জাগছে বুঝি? সকৌতুকে বললে ইন্দ্রনাথ।
অতীতে এ-রোগ কাদের হয়েছিল, সেই খোঁজ নিচ্ছি। হেগ রক্ত খেতে শিখেছিল ডাবল লাইফ বইটা পড়ে তাই না?
গম্ভীর হয়ে গিয়ে ইন্দ্রনাথ বললে, খবর রাখিস তাহলে। গুড। ডাবল লাইফ এক কশাই এর গল্প। মানুষ মেরে তাদের রক্ত খেত, মাংস বেচে খদ্দেরদের খাওয়াত। এর বেশি আর কিছু জানিস?
জয়ন্ত বললে, আরও আছে?
আছে। ডাবল লাইফ উপন্যাসের নায়ক মনগড়া নয়। হ্যাঁনোভারে তার নিবাস। নাম, ফ্রিজ হারম্যান। চব্বিশটা ছেলেকে খুন করে তাদের মাংস বেচেছে আর রক্ত খেয়েছে।
মাই গড! বললে জয়ন্ত।
ইন্দ্রনাথ বললে, হেগ-এর রক্ততৃষা জেগেছিল আরও একজন নরপিশাচের কীর্তিকাহিনি পড়ে। নাম তার সিলভেস্টার মাটুস্কা। ১৯৩১ সালে বুদাপেস্তে ইচ্ছে করে ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে বাইশটা নরহত্যা ঘটিয়ে অসীম তৃপ্তি পেয়েছিল। মানুষ মেরেই আনন্দ পেত সিলভেস্টার। হেগ আর সিলভেস্টারের মধ্যে এক জায়গায় অমিল আছে মিল আছে অনেক জায়গায়।
অমিলটা কী? জয়ন্তর প্রশ্ন।
হেগ পাগলামির ভান করেছিল বাঁচবার জন্যে সিলভেস্টার তা করেনি। সাফ বলেছিল, মানুষকে মরতে দেখলে আনন্দ পাই বলেই ট্রেন ধ্বংস করি।
মিলগুলো কোথায়? জয়ন্ত ঝুঁকে বসেছে।
একটাই এখন শোন। দুজনেই মনে করত, একটা অদৃশ্য অশরীরী সত্তার হিপনোটিক হুকুমে এ-কাজ তাদের করতে হয়।
অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠল কবিতা, প্লীজ। বিকট এই আলোচনা আর ভালো লাগছে না।
তর্জনী তুলে ইন্দ্রনাথ বললে, তাহলে বলো আর কক্ষনও আমাকে ক্রিমিন্যাল বলবে না।
তুমি স্যাডিস্ট। মানুষকে দগ্ধে মেরে আহ্লাদে আটখানা হও।
তাহলে তো তোমাকে ডক্টর নক্স-এর গল্প শুনতে হয়।
ডক্টর নক্স!
এডিনবরার ডাক্তার। থাকতেন দশ নম্বর সার্জন স্কোয়ারে। লাশ কাটাকুটি করার জন্যে মানুষ মারিয়ে আনতেন খুনে দালাল লাগিয়ে। শেষকালে তিলোত্তমা এক বারবনিতার মড়া দেখে এমনই মুগ্ধ হয়ে গেলেন যে তাকে তিনমাস ধরে ডুবিয়ে রাখলেন হুইস্কির চৌবাচ্চায়। তিনমাস ধরে রূপসুধা পান করেছেন শিল্পীদের ডেকে এনে সুন্দরীর ছবি আঁকিয়েছেন।
জয়ন্ত বললে, ইন্দ্র, রক্ত আর রূপের তেষ্টা নিবারণের গল্প শুনে মোহিত হলাম। কিন্তু এখন যে জঘন্য খুনগুলো হয়ে চলেছে এই শহরে সেগুলোর মূলে কী ধরনের তেষ্টা আছে বলে তোর মনে হয়?
ইন্দ্রনাথ পোড়া সিগারেট ফেলে দিয়ে নস্যির ডিবে খুলতে খুলতে মঞ্চ-নায়কের পোজে আড়চোখে কবিতার দিকে চেয়ে বললে, সরি বউদি…খুবই নোংরা অভ্যেস কিন্তু ভিখিরি জেমি উইলসনের পকেটে তামার নস্যির ডিবে আর পিতলের নস্যির চামচ ছিল বলেই ডক্টর নক্সের ল্যাবোরেটরিতে তার লাশ কাটাকুটি হয়ে যাওয়ার পরেও ধরা গেছিল খুনিকে–ডিবে আর চামচ পাওয়া গেছিল খুনে দালালের পকেটে।
ঠাকুরপো! ফের!
জয়ন্ত বললে, আমার প্রশ্নটার জবাব জানা নেই মনে হচ্ছে?
ইন্দ্রনাথ বললে, সত্যিই জানা নেই, জয়ন্ত। থাকলে এই নারকীয় কাণ্ড বন্ধ করতে আগে কোমর বেঁধে লাগতাম আমি। আবার কার মাথা ছাতু হল?
এমন সময়ে ঘরে ঢুকল লোকনাথ পাল। ট্রাফিক পুলিশের ওসি। যেমন টল, তেমনি হ্যান্ডসাম। যেন পাথরের গ্রীকমূর্তি হঠাৎ প্রাণ পেয়েছে। দুই চোখ আশ্চর্য শান্ত। ঠোঁটের কোণে কোণে হাসির ঝিলমিল। ঈর্ষাকাতর মহলে শোনা যাচ্ছে, ডি-সি ট্রাফিক তাকে আরও ওপরে তুলবেন ঠিক করে রেখেছেন।
লোকনাথ বললে, হ্যালো বউদি, জয়ন্তদা এখানে কফি খেতে এসেছে শুনেই ভটভটি নিয়ে চলে এলাম। ইদা, এবার মাথা গুঁড়োল যার, সে নিজেই পাগল। বয়স তিরিশও ছাড়ায়নি। নার্সিংহোম থেকে পালিয়ে এসে ঘুমিয়ে পড়েছিল ফুটপাতে। রাতের আতঙ্ক যথারীতি তার মাথার ঘিলু বের করে নিয়ে গেছে।
কোথায়? নস্যি নেওয়া শেষ করে বললে ইন্দ্রনাথ।
এখান থেকে মিনিট দশেকের পথ। যাবেন? ডেডবডি এখনও পড়ে রয়েছে।
উঠে দাঁড়াল ইন্দ্রনাথ। সেইসঙ্গে আমি আর জয়ন্ত। ফ্যাকাশে মুখে বসে রইল কবিতা।
কিন্তু অতবেলা পর্যন্ত মড়া ফেলে রাখে না পুলিশ। ফটোগ্রাফাররা এসে পড়ার আগে লাশ পাচার হয়ে গেছে।
