বলে ওদের দুজনকে পাঠিয়ে দিলাম ঝোঁপের মধ্যে। চোখের আড়াল হতেই আমি সোজা উঠে গেলাম এবং কাঁটাঝোঁপের ফাঁকে-ফাঁকে একটু ঘুরপথে এগোতেই দেখলাম নকল রাজা কঙ্ক আমার দিকে পেছন করে গুটি গুটি এগোচ্ছে।
লম্বা দুটো লাফ দিয়ে পড়লাম তার ঘাড়ে। হাতের রিভলভার ঘুরিয়ে সে চেয়েছিল আমাকে গুলি করতে। কিন্তু আমার যুযুৎসু তার চাইতেও বেশি চটপটে। নিমেষমধ্যে তাকে মাটিতে পেড়ে ফেলে বসলাম বুকের ওপর।
বললাম চাপা গলায়, উজবুক কঁহাকার। আমি রাজা কঙ্ক। এক মিনিটের মধ্যে আমার নোটবই আর ভদ্রমহিলার ভ্যানিটিব্যাগ ফেরত দাও…তার বদলে পুলিশের খপ্পর থেকে তোমাকে রেহাই দেব, আর আমার দলে টেনে নেব। রাজি?
রাজি।
উঠে দাঁড়ালাম আমি। লোকটা পকেট হাতড়ে একটা ছুরি নিয়ে তেড়ে এল আমার দিকে।
গাধা কোথাকার বলে বাঁ-হাতে তার ছুরিসুদ্ধ হাতের কবজি চেপে ধরে ডানহাতে প্রচণ্ড ঘুসি ঝাড়লাম ক্যারোটিড আর্টারির ওপর। একেই বলে ক্যারোটিড হুকৃ–এক ঘুসিতেই এক লক্ষ সর্ষে ফুল দেখতে-দেখতে ঘুমিয়ে পড়ল হতভাগ্য।
কাগজপত্র, নোটের তাড়া–সবই পেলাম আমার নোটবইয়ে। লোকটার কাগজপত্র কৌতূহল ভরে দেখতে গিয়ে একটা খানে দেখলাম নাম লেখা রয়েছে বিম্পে ফিরিঙ্গি। বোম্বাই, কলকাতা, দিল্লির তিন-তিনজন শেঠজিকে গলা কেটে খুন করে যে চম্পটি দিয়েছে! বিম্পে ফিরিঙ্গি। সোনার বিস্কুট আর হিরের বুদ্ধ কোটিপতি মালহোত্রার তোষাগার থেকে গায়েব করে যে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে।
বিম্পে ফিরিঙ্গি শুধু গলা কাটা খুনে নয়, ধুরন্ধর চোরও বটে। এতক্ষণে বুঝলাম, ট্রেনের কামরায় তাকে কেন অত চেনা মনে হচ্ছিল।
সময় বিশেষ নেই। দুটো একশো টাকার নোট খামের মধ্যে রেখে বাইরে লিখলাম ও
সুযোগ্য সহকারী বাঁটলো এবং তলাকান্তকে রাজা কঙ্ক
খামটা রাখলাম ঘাস জমির ওপর। মিসেস আচারীর ভ্যানিটিব্যাগটা ফিরিয়ে দেওয়া দরকার। ভদ্রমহিলা অনেক উপকার করেছে আমার। তাই ব্যাগটাও রাখলাম খামের পাশে। হিরে জহরতগুলো অবশ্য আমার পকেটে রাখলাম। বিজনেস ইজ বিজনেস! তা ছাড়া যার স্বামী ওইরকম বিচ্ছিরি চাকরি করে, তাকে করুণা করা সঙ্গত নয়…!
বাকি রইল বিম্পে ফিরিঙ্গি। দেখলাম, একটু-একটু করে জ্ঞান ফিরছে তার। কী করব একে নিয়ে? পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার অধিকার আমার নেই। ও কাজ যাদের তারা করুক।
সুতরাং ওর রিভলভারটা পকেটে পুরলাম। আমার রিভলভার বার করে একবার মাত্র ফায়ার করলাম শূন্যে… ।
ছুটে আসুক তলাকান্ত আর বাঁটলো..আমি আমার পথ দেখি।
উলটো দিকে দৌড়োলাম। আসবার সময়ে দেখে এসেছিলাম গাড়িতে পৌঁছনোর শর্টকাট। সেই পথেই উঠে বসলাম মোরো-লিপটনে।
চারটের সময়ে টেলিগ্রাম করে দিলাম বন্ধুদের বিশেষ কাজে এ-যাত্ৰা আর দেখা করা সম্ভব হচ্ছে না। দুঃখিত।
ছটার সময়ে পৌঁছলাম কলকাতায়।
পরদিন সকালবেলায় যুগান্তরে পড়লাম বিম্পে ফিরিঙ্গির ধরা পড়ার কাহিনি :
চম্পকনগরের কাছে বেশ খানিকটা প্রত্যুৎপন্নমতিত্বের পরিচয় দেওয়ার পর বিম্পে ফিরিঙ্গি কে অ্যারেস্ট করিয়েছে রাজা কঙ্ক। গলাকাটা খুনে এবং ধুরন্ধর জহর-চোর ডেপুটি জেল সুপারের গৃহিণীর জড়োয়া চুরি করে সটকান দেওয়ার তালে ছিল। রাজা কঙ্ক যে ভ্যানিটিব্যাগে জড়োয়া গয়না ছিল, সেটি ফিরিয়ে দিয়েছে এবং দুজন সরকারি গোয়েন্দার সাহায্যে নাটকীয় গ্রেপ্তার সম্ভব হয়েছে, তাদেরকে মোটা বখশিশ দিয়ে গেছে।
অমৃত পত্রিকায় প্রকাশিত। (১০ জ্যৈষ্ঠ, ১৩৮১
রাতের আতঙ্ক
রবিবার সকাল। দূরদর্শনে মহাভারতের পাট চুকে গেছে। সাপ্তাহিক আড্ডা মারতে বন্ধুবান্ধব আসবে এখন। আমি কলম মুড়ে রাখলাম। কবিতা আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে এসে বসল আমার পাশের চেয়ারে।
গিন্নি, তোমার গা রে গন্ধ। বিয়ের আগে অকাখেকে অর্জন করেছি।
বললাম, গিন্নি, তোমার গা থেকে পাঁঠা-পাঁঠা গন্ধ বেরোচ্ছে।
কবিতা বললে, ওটা সঙ্গ দোষের গন্ধ। বিয়ের আগে যখন আধপাগল হয়েছিলে, তখন পেতে আতরের গন্ধ–এখন পাচ্ছ পাঁঠার গন্ধ। সুতরাং গন্ধটা কোত্থেকে অর্জন করেছি, তা কি বলে দিতে হবে?
আমি বললাম, বুঝলাম। আমি পাঁঠা। কিন্তু তুমি পাঁঠার ঝোল খেতে চেয়েছিলে বলে পাঁঠা কিনে আনলাম। পাঁঠাতে তোমার রুচি আছে বলেই পাঁঠার মালা গলায় পরেছ। তবে, পাঁঠার ঝোল তোমার এত প্রিয় জানলে তোমার ছায়া মাড়াতাম না।
তোমাকে বেঁধে খেয়ে ফেলব, সে আশায় থেকো না। তুমি একটা অখাদ্য।
অখাদ্য!
এক্কেবারে। নইলে কোনকালে চেখে দেখতাম।
রোজই তো সে কর্মটা করছ। করে করে বুঝে গেছ, আমি একটা অখাদ্য।
মরণ।
এই বলে রূপসী ভার্যা আরও একটু গা-ঘেঁষে বসল। অমনি দোরগোড়ায় শোনা গেল অতি পরিচিত বিষম-খাওয়ার শব্দ।
ঠোঁট বেঁকিয়ে চোখ পাকিয়ে কবিতা বললে, আপদ! সাতসকালে গলায় কাঁটা ঢুকিয়ে বসে আছে।
চৌকাঠ পেরিয়ে এসে উত্তমকুমার ঢঙে ইন্দ্রনাথ বললে, হে মোর বন্ধুপত্নী, এ কাটা প্রেমালাপের কাটা। তোমাদের কাছে যা মধুময়, আমার কাছে তা কণ্টক।
বিষদৃষ্টিতে সুদর্শন বন্ধুবরের আসন গ্রহণ নিরীক্ষণ করতে করতে কবিতা বললে, তোমার মতো সুপুরুষ আইবুড়োদের এই ধরনের সেক্সয়াল অ্যাভারসন থাকলেই ধরে নিতে হবে তোমরা প্রত্যেকেই এক-একটা ক্রিমিন্যাল।
