হেসে উঠলাম। বললাম, মশাই, পকেট-বই খোয়া গেলে গর্দভের মাথাতেও বুদ্ধি খেলে। আপনার জনা দুই লোক দিতে পারেন? তিনজনে মিলে চেষ্টা করলে হয়তো তাকে ধরা যাবে–
প্লীজ, প্লীজ, মিনতি করল সুন্দরী সঙ্গিনী। মিস্টার সামুই প্র্যাকটিক্যাল কথা বলেছেন। আর দেরি করবেন না। আমার জুয়েলগুলো…
মহীয়সী বান্ধবীর একটি কথাতেই দাঁড়িপাল্লার কাটা হেলে পড়ল। ডেপুটি জেল সুপারের স্ত্রী আমাকে ডাকছে মিস্টার সামুই নামে। বড় অফিসারের বউয়ের মুখে জাল নামটা যেন নতুন মর্যাদা নতুন প্রতিষ্ঠা পেল। আর কোনও সন্দেহ থাকতে পারে কি? উঠে দাঁড়াল পুলিশ অফিসার।
চলুন মিস্টার সামুই। রাজা কঙ্ককে আপনারও দরকার, আমারও দরকার।
ভদ্রলোক আমাকে নিয়ে এল বাইরে-আমার গাড়ির সামনে। আলাপ করিয়ে দিল দুজন শক্ত-সমর্থ জোয়ানের সঙ্গে বাঁটলো বটব্যাল আর তলাকান্ত তালুই। দুই চ্যালাকে নিয়ে উঠে বসলাম আমার গাড়িতে। আমি বসলাম ড্রাইভারের জায়গায়। ড্রাইভার বসল পেছনে। মিনিট খানেক পরেই স্টেশন রইল পেছনে। উড়ে গেল রাজা কঙ্ক।
সত্যি কথাই বলব মশায়, অহংকার একটু হয়েছিল বইকি। পাওয়ারফুল ইঞ্জিন তখন ফুঁসছে, পঁয়ত্রিশ হর্স পাওয়ারের ইমপোর্টেড মোরো-লিপটন বাঘের বাচ্চার মতোই ধেয়ে চলেছে ফাঁকা রাস্তা দিয়ে। হু-হুঁ হাওয়ায় চুল উড়ছে আমার। ইঞ্জিনে যেন একটা ভোমরা গুনগুনিয়ে চলেছে–ভ্রমরগুঞ্জন ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। দু-পাশের গাছগুলো সটাসট পেছিয়ে যাচ্ছে পেছনে। মুক্তি পেয়েছি ঠিকই কিন্তু এখনও কিছু কাজ বাকি। স্রেফ প্রাইভেট ব্যাপার বলতে পারেন।
সরকারি কর্মচারীদের সাহায্যেই আইনানুগভাবেই কাজটা সারব আমি। তাই তো রাজা কঙ্ক চলেছে রাজা কঙ্কর সন্ধানে সরকারিভাবে।
যাই বলুন, সরকারের সাহায্য না পেলে সেদিন আমি অত সহজে গাড়ি হাঁকতে পারতাম কি? রাস্তা তো চিনি না। কখন মোড় ঘুরতে হবে, কোন রাস্তা ছাড়তে হবে, কোন সড়কে ঢুকতে হবে–আমি জানি না। নির্ঘাত পথ হারিয়ে গোলকধাঁধায় ঘুরে মরতাম। রাজা কঙ্ক পথ হারাতো, আরেক রাজা কঙ্ক সেই ফাঁকে হত পগাড়পার।
কিন্তু ওই যে বললাম, সরকার আমাকে সাহায্য করল সরকারি কর্মচারী জুগিয়ে। তলাকান্ত তালুই আর বাঁটলো বটব্যাল জীবন্ত গাইডবুক বললেই চলে।
অথচ পলাতক রাজা কঙ্কর সঙ্গে হিসেবনিকেশ মিটিয়ে নেওয়ার সময়ে বাঁটলো আর তলাকান্তকে চোখের আড়াল করতে হবে। আমার নোটবই ওদের খপ্পরে দেওয়া তো দূরের কথা নোটবইয়ের পাতাতেও যদি চোখ দিয়ে ফেলে দুই মূর্তিমান তাহলেও সর্বনাশ।
বলরামপুর পৌঁছে শুনলাম তিন মিনিট আগেই ট্রেনটা বেরিয়ে গেছে। আমার ভুল হয় না। রেনকোট পরা একটা দাড়িওয়ালা কার্তিক-কার্তিক চেহারার লোক সেকেন্ড ক্লাসের টিকিট কেটে উঠেছে যাবে মহেন্দ্রনগর জাংশনে।
জীবনে প্রথম ডিটেকটিভ হল রাজা কঙ্কসফল ডিটেকটিভ শার্লক হোমস মেডেল দেওয়া উচিত আমাকে।
শুনলাম–ট্রেনটা এক্সপ্রেস। মহেন্দ্রনগর জাংশনের আগে কোথাও দাঁড়াবে না। সেখানে তাকে ধরা না গেলে সে চম্পট দেবে কলকাতার দিকে মিলিয়ে যাবে জনারণ্যে।
মহেন্দ্রনগর কদ্দূর এখান থেকে?
সাড়ে চোদ্দ মাইল।
উনিশ মিনিটে সাড়ে চোদ্দ মাইল?…ঠিক আছে–আগেই পৌঁছব।
মোটর রেসে নাম লেখালে নিশ্চয় গোল্ডকাপ পেতাম সেদিন। মোরো-লিপটন আমার হুকুমের দাস বরাবরই, কিন্তু সেদিন যেন আমার অন্তরের আকুলতাকে ও স্পর্শ করল। ওর যান্ত্রিক ব্যাকুলতা মূর্ত হল অসম্ভব গতিবেগের মধ্যে। আমার ইচ্ছাশক্তি যেন তার পঁয়ত্রিশ হর্স পাওয়ারকে উদ্দীপিত করল অলৌকিকভাবে এবং যেন সত্যি সত্যিই পঁয়ত্রিশটা ঘোড়া একযোগে পক্ষিরাজ ঘোড়ার মতোই উড়ে চলল পথের ওপর দিয়ে। শয়তান রাজা কঙ্ককে পাকড়াও করতেই হবে। রাস্কেল! স্কাউন্ডেল। চোর! কে কাকে টেক্কা দেয়, দেখা যাক এবার। আসল জেতে কি নকল জেতে–শুরু হল সেই পরীক্ষা।
ডাইনে!..বাঁয়ে…সোজা। হাঁক দিচ্ছে তলাকান্ত আর বাঁটলো।
পেছনের ধুলোর ঝড় উড়ছে। মাইল পোস্টগুলো দেখতে-দেখতে মিলিয়ে যাচ্ছে তার মধ্যে।
হঠাৎ একটা মোড় ঘুরে দেখলাম ধোঁয়ার মেঘ। এক্সপ্রেস ট্রেন।
আধঘণ্টা ধরে চলল দারুণ রেস। ট্রেনে-মোটরে প্রতিযোগিতা। তারপর মাত্র বিশ গজের ব্যবধানে স্টেশনে আগে পৌঁছলাম আমরা।
তিন সেকেন্ড লাগল প্ল্যাটফর্মে উঠে সেকেন্ড ক্লাস কামরার সামনে পৌঁছতে। কিন্তু সে নেই। রাজা কঙ্ক মিলিয়ে গেছে।
রেগেমেগে বললাম, কী বোকা আমি। ট্রেন থেকেই আমাকে দেখেছে গাড়ির মধ্যে। নিশ্চয় লাফিয়ে পড়েছে চলন্ত ট্রেন থেকে।
গার্ডসাহেব সায় দিলেন। প্ল্যাটফর্ম থেকে শ-দুই গজ আগে একজনকে তিনি দেখেছেন বাঁধ বেয়ে নেমে যাচ্ছে।
ওই তো। ওই যে যাচ্ছে।…লেবেল ক্রসিংয়ে।
তীরবেগে ছুটলাম। সরকারি সাগরেদ দুজনও এল পেছন-পেছন। কিন্তু তলাকান্ত দেখলাম খরগোশের মতো দৌড়োয়। আমাদের ছাড়িয়ে নকল রাজার নাগাল ধরে ফেলে আর কি। প্রমাদ গুণলাম আমি।
হাঁপাতে হাঁপাতে একটা ঘন ঝোঁপের কাছে পৌঁছে দেখি তলাকান্ত চুপ করে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। পাছে আমরা খুঁজে না পাই তাই আর এগোয়নি।
ভালোই করেছেন। আন্তরিকভাবেই বললাম আমি। আপনি দাঁড়ান বাঁ-দিকে ওই ঝোঁপের আড়ালে, বাঁটলোবাবু যান ডানদিকের ঝোপে। আমি পেছন দিক থেকে তাড়া দিচ্ছি ওকে। বেরোলে আপনাদের সামনে দিয়েই বেরোবে। ও হাবিপদে পড়লে গুলি ছুঁড়ব–মাত্র একবার।
