প্ল্যাটফর্ম থেকে দিদিকে নিয়ে যাওয়ার জন্যেই আশু নামধারী ভাইটি কামরায় পা দিয়েছিল।
স্মার্ট চেহারার একজন সুদর্শন কিশোর। মিসেস আচারী তাকে জাপটে ধরে কেঁদে উঠল হাউহাউ করে।
তারপর বললে ফোঁপাতে-ফোঁপাতে, রাজা কঙ্ক.এই ভদ্রলোকের টুটি টিপে ধরেছিল ..উনি তখন ঘুমোচ্ছিলেন…মিস্টার সামুই, অভীক সামুই, আমার হাজব্যান্ডের ফ্রেন্ড।
কিন্তু রাজা কঙ্ক এখন কোথায়?
ওভারব্রীজের তলায় ট্রেন আসতেই লাফিয়ে পড়ল বাইরে।
আপনি ঠিক দেখেছিলেন তো? রাজা কঙ্কই তো?
হ্যাঁ…হ্যাঁ…হ্যাঁ…দেখেই চিনেছি। হাওড়াতে। তাকে দেখা গেছে বুকিং অফিসের সামনে..হাতে ছাতা, পায়ে অ্যামবাসাডর বুট–
একসকুসিভ সু, পুলিশ অফিসার আমার জুতো দেখিয়ে বলল, এইরকম?
না, না, যা বলছি শুনুন, আমবাসাডর বুট, চেককাটা গ্রে রেনকোট।
কিন্তু, মাথা চুলকে বলল পুলিশ অফিসার, টেলিগ্রামে তো রেনকোটের কথা লেখা ছিল । ছাই রঙের কোটপ্যান্টের কথা লেখা ছিল শুধু।
ঠিক বলেছেন অ্যাশ কালারের সুট, সোল্লাসে বললে মিসেস আচারী। এতক্ষণে নিশ্বাস নিলাম আমি। এই না হলে বান্ধবী…চরম বিপদেও কী রকম বাঁচিয়ে দিল আমাকে।
কথা শুনতে-শুনতে আমার হাতের বাঁধন খুলে দিল পুলিশ অফিসার। আমি অবশ্য তার আগেই ঠোঁট কামড়ে রক্ত বার করে ফেলেছিলাম। বন্ধনমুক্ত হয়েও যেন কাহিল হয়ে পড়েছি, এমনিভাবে চিঁ চিঁ স্বরে বললাম?
রাজা কঙ্ক…রাজা কঙ্ক…মনে কোনও সন্দেহ করবেন না… এখনও দৌড়োলে তাকে ধরা যাবে।
এমনভাবে বললাম যেন ধুকছি। রাজা কঙ্ক আমাকে চোরের মার মেরেছে। প্রাণটা কেবল রেখে গেছে।
আমার রক্তমাখা ঠোঁটের দিকে সমবেদনা মিশোনো চোখে চেয়ে রইল পুলিশ অফিসার। প্রথম রাউন্ডে রেহাই পেলাম।
কামরাটা পুলিশ ইন্সপেকসন হবে বলে কেটে রাখা হল সাইডিংয়ে। বাকি ট্রেন রওনা হল গন্তব্যস্থানে। আমরা এসে বসলাম স্টেশন মাস্টারের ঘরে। কাতারে কাতারে লোক মজা দেখবার জন্যে হেঁকে ধরল আমাদের। কারো সর্বনাশ, কারো পৌষ মাস!
টনক নড়ল আমার। আর দেরি করা সমীচীন নয়। হাওড়া থেকে নতুন টেলিগ্রাম এসে পৌঁছোলেই আমি গেছি! কোনও একটা অছিলা নিয়ে প্ল্যাটফর্মের বাইরে আমাকে যেতেই হবে। গাড়িটা খুঁজে নিয়ে সটকান দিতে হবে এক্ষুনি!
কিন্তু তস্কর মহাপ্রভু কি সত্যিই একহাত নেবে আমার ওপর? এদিকের রাস্তাঘাট আমি চিনি না–কিন্তু সে চেনে। তাকে ধরা কি সম্ভব হবে?
আমার মন বলল, চেষ্টা করতে দোষ কী? অসম্ভবকে সম্ভব করাই তো রাজা কঙ্কর ব্রত। ঠগকে ঠকানোই তো রাজা কঙ্কর আদর্শ।
পুলিশ অফিসার তখনও রুটিনমাফিক এজাহার লিখছে দেখে হঠাৎ চেঁচিয়ে বললাম আমি :
শুনছেন? রাজা কঙ্ক কিন্তু প্রতিমুহূর্তে দূরে সরে যাচ্ছে। স্টেশনের বাইরে কার পার্কে আমার গাড়ি রয়েছে। আপনি অনুমতি দিলেই গাড়ি নিয়ে তাকে ধাওয়া–
মতলবটা মন্দ নয়। হেসে বলল অফিসার। আপনি বলার আগেই দুজন এস আইকে পাঠিয়ে দিয়েছি।
তাই নাকি?
সাইকেলে করে খুঁজছে রাজা কঙ্ককে।
কোথায় খুঁজেছে?
ওভারব্রীজের ধারেকাছে। ওখানে গেলেই এক-আধটা ব্লু পাওয়া যাবেই। রাজা কঙ্কও ধরা পড়বে।
দূর মশাই, আপনার অফিসাররা খালি হাতে ফিরবে। ক্লু পাবে না।
আপনি কি জ্যোতিষী? একটু চটেছে মনে হল পুলিশ অফিসার।
ওভারব্রীজ থেকে বেরোনোর সময়ে কেউ যাতে তাকে দেখতে না পায়, সেইমতো হুঁশিয়ার থাকবে রাজা কঙ্ক। সুতরাং কোনও সাক্ষী আপনি পাবেন না। সবচাইতে কাছের রাস্তা ধরে সে–
রাস্তা তো গেছে কোহিমায়। সেখানেই ধরব তাকে।
কোহিমায় সে যাবে না।
না গেলে আশেপাশেই থাকবে। তাতে তো আমাদেরই সুবিধে।
আশপাশেই থাকবে না।
বিটে? বটে? বটে? লুকোবে কোথায়? মাটির তলায়? ঘড়ির দিকে তাকালাম।
বললাম–এই মুহূর্তে বলরামপুরে স্টেশনের আশপাশে ঘুরঘুর করছে রাজা কঙ্ক। দশটা পঞ্চাশে মানে, এখন থেকে ঠিক বাইশ মিনিট পরে কোহিমা থেকে একটা ট্রেন এসে দাঁড়াবে বলরামপুরে। রাজা কঙ্ক তাতে উঠে বসবে–যাবে মহেন্দ্রনগর জাংশনে।
তাই নাকি? তাই নাকি? জানতে পারি কি তার গতিবিধির খবর আপনি জানলেন কী করে?
খুব সহজে। কম্পার্টমেন্টে বসে রাজা কঙ্ক আমার ব্র্যাডশ খুলে দেখছিল। কী দেখছিল? যেখানে সে অদৃশ্য হবে, ঠিক সেইখানে আর কোনও ট্রেন আসার সম্ভাবনা আছে কিনা–এই জন্যেই খুলেছিল ব্র্যাডশ। আমিও এই মাত্র দেখেছি ব্র্যাডশ। ওভারব্রীজের কাছেই বলরামপুর স্টেশনে দশটা পঞ্চাশে কোহিমা থেকে আসছে একটা ট্রেন।
শুনে চোয়াল ঝুলে পড়ল পুলিশ অফিসারের।
মার্ভেলাস! মিস্টার সামুই, আপনি ডিটেকটিভ হলেন না কেন? এ লাইনে এক্সপার্ট হতে পারতেন।
সেরেছে। বেশি বুদ্ধি দেখাতে গিয়ে নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুল মেরে বসেছি। পুলিশ অফিসারের চোখে বিস্ময় দেখলাম, আর দেখলাম চাপা সন্দেহ। কপাল ভালো যে রাজা কঙ্কর ফোটো সে পেয়েছে ওপরমহল থেকে, তার সঙ্গে সামনে-বসা এই রাজা কঙ্কর কোনও মিল নেই। আসল রাজা কঙ্ককে চিনতে পারল না শুধু ওই ছদ্মবেশী রাজার ছবি দেখেছিল বলেই। তা সত্ত্বেও দেখলাম বিষম ঘাবড়ে গিয়েছে, বিষম অস্থির হয়েছে, বিষম উত্তেজিত হয়েছে ভদ্রলোক।
কিছুক্ষণ আর কোনও কথা নেই। শ্বাসরোধী নীরবতা। চাপা উদ্বেগে আমি নিজেও শিউরে উঠেছিলাম কিনা বলতে পারব না। তবে হাজার হোক আমি রাজা কঙ্ক। নিমেষ মধ্যে জাগ্রত হল ইস্পাত কঠিন মনোবল।
