আগন্তুকের কিন্তু খেয়াল নেই আমাদের পানে। একদৃষ্টে চেয়ে আছে বাইরের দিকে তাল তাল ধোঁয়া উঠছে সিগারেটের প্রান্ত থেকে। একবার কেবল হাত বাড়িয়ে আমার ব্র্যাডশটা টেনে নিয়ে পাতা উলটোনো ছাড়া কোনও ভাবান্তর দেখা গেল না তার হাবভাবে। আশ্চর্য ব্যাপার তো!
মেয়েটি এখনও মূছার ভাবটা টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে চলেছে প্রাণপণে। একবার কেবল খুকখুক করে কেশে উঠল সিগারেটের ধোঁয়ায়, তাইতেই বোঝা গেল মূৰ্ছাটা বিলকুল নকল– আসল মোটেই নয়। শত্রুকে ঠান্ডা রাখার কৌশল।
আমার সারা গা টনটন করছে বাঁধনের জন্যে। মন কিন্তু বসে নেই…ফন্দি রচনা চলছে পুরোদমে মনের কারখানায়…।
একটার পর একটা স্টেশন টপকে ছুটে চলেছে ট্রেন।
হঠাৎ উঠে দাঁড়াল আগন্তুক। দুপা এগিয়ে এল আমাদের পানে। মেয়েটির দিকে চাইতেই তক্ষুনি জবাব এল সেদিক থেকে, ওগো তুমি কোথায়! চিৎকারের সঙ্গে-সঙ্গে সত্যিকারের মূৰ্ছা।
লোকটার মতলব ধরতে পারলাম না। আমার পাশের জানলা তুলে বাইরে চেয়ে রইল। বৃষ্টি পড়ছে রিমঝিম শব্দে। যেন বিরক্ত হল তাই দেখে। সঙ্গে ছাতা নেই বলেই যেন ব্যাজার মুখে চেয়ে রইল বাইরে।
তারপর মেয়েটির ছাতা আর আমার রেনকোট নিয়ে এগোল দরজার দিকে।
দরজা খুলেই রেনকোট গায়ে চাপিয়ে নিল আগন্তুক। এক-পা নামিয়ে রাখল পাদানিতে। সর্বনাশ। চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেবে নাকি? বাইরে ধোঁয়া আর বৃষ্টির মধ্যে তাকিয়ে শিউরে উঠলাম আমি। উন্মাদ নাকি?
ঠিক এই সময়ে স্যাকসবি-ফার্মারের ব্রেক চেপে বসল লোহার চাকায়। গতি কমে আসছে, লোহার কাঁচকাঁচ আর্তনাদ শোনা যাচ্ছে।
চকিতে পরিষ্কার হয়ে গেল আগন্তুকের উদ্দেশ্য। লাইন মেরামত চলছে নিশ্চয়। লোকটা তা জানে। গাড়ির গতি কমবেই। সে হেঁটে উধাও হবে জহরৎ আর নোটবই নিয়ে।
রগদুটো দপদপ করতে লাগল তার নিখুঁত প্ল্যান দেখে।
ফুটবোর্ডে দুটো পা নামিয়েছে আগন্তুক। ট্রেন আরও আস্তে চলছে। হঠাৎ জানলার সামনে অন্ধকার ঘনিয়ে এল। ওভারব্রিজ।
অন্ধকার কেটে গেল সেকেন্ড কয়েকের মধ্যেই। লোকটাকে আর দেখলাম না।
অন্ধকারের মধ্যেই ওভারব্রিজের তলায় নেমে পড়েছে সে। চম্পকনগরও এসে গেল বলে। আর একটা ওভারব্রিজ পেরোলেই ট্রেন দাঁড়াবে চম্পকনগরে।
রেগুলেট করা মূর্ছা কাটিয়ে সটান উঠে বসল মেয়েটি। প্রথমেই শুরু হল বিলাপজহর হারানো শোকোচ্ছ্বাস। (ওগো তোমার দেওয়া নেকলেসটা..ইত্যাদি)
আমি কাতর নয়নে চাইলাম। মেয়েটি বুঝল। উঠে এসে খুলে দিল মুখের রুমাল। হাত পায়ের বাঁধনও খুলতে যাচ্ছিল আমি বাধা দিলাম।
বললাম, না-না, থাকুক। পুলিশ এসে দেখুক রাস্কেলটা কী হাল করেছে আমার!
চেন টানব?
সেটা আগেই টানা উচিত ছিল, এখন আর দরকার নেই। আমার গলা টিপে ধরার সঙ্গে সঙ্গে যদি চেনটা ধরে ঝুলে পড়তেন…
তাহলেই তো আমাকে চটকে পিণ্ডি বানাতো! আপনাকে বলিনি রাজা কঙ্ক এই ট্রেনে উঠেছে। ছবি দেখেই চিনেছি আমি।
এবার আর নিস্তার নেই–পুলিশ ধরল বলে।
কাকে? রাজা কঙ্ককে? পুলিশের..ক্ষমতা নেই। ফুটকি দেওয়ার জায়গায় উচ্চারিত শব্দটা লেখা চলে না।
ম্যাডাম, আপনি যদি ঠিক থাকেন, রাজা কঙ্ক ধরা পড়বেই। যা বলছি শুনুন। স্টেশনে ট্রেন ঢুকলেই আপনি চেঁচাতে থাকবেন। পুলিশ ছুটে আসবে। দু-চার কথায় তাদের বুঝিয়ে দেবেন রাজা কঙ্ক এসেছিল, আমার ওপর চড়াও হয়েছিল। কীভাবে পালিয়েছে ট্রেন থেকে তাও বলবেন। বলবেন, তাকে দেখতে কীরকম। খানদানি চেহারা পায়ে অ্যামবাসাডর বুট, হাতে ছাতা–আপনার গায়ে রেনকোট–
আপনার, বললে তন্বী।
আমার? না, না, ওর নিজের। আমার রেনকোট নেই।
কিন্তু আমার যেন মনে হল রেনকোট ছাড়াই ট্রেনের মধ্যে লাফিয়ে এসেছিল রাজা কঙ্ক।
ভুল দেখেছিলেন,…রেনকোট গায়ে না থাক হাতে ছিল নিশ্চয়…নয়তো কামরার মধ্যে কেউ ফেলে গিয়েছিল..রাজা কুড়িয়ে পেয়েছে। যেখান থেকেই আসুক না কেন, রেনকোটটা গায়ে চাপিয়ে সে পালিয়েছে। পয়েন্টটা দারুণ, ইমপরট্যান্ট…গায়ে চেক কাটা গ্রে রেনকোট…বলতে ভুলবেন না। গোড়াতেই আপনার হাজব্যান্ডের নামটা বলবেন। নাম শুনলেই ওরা কানখাড়া করে আপনার সব কথা গিলবে…কাজও করবে…জুয়েলগুলোও ফেরত পাবেন।
চম্পকনগর আর বেশি দূরে নেই। জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে দেখছে কারারক্ষকের যুবতী বধূ। আমি চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে তার ব্রেনের মধ্যে গেঁথে-গেঁথে বললাম :
আমার নাম অভীক সামুই। যদি দরকার মনে করেন, বলবেন আমাকে আপনি চেনেন…তাতে অনেক সময় বেঁচে যাবে…প্রিলিমিনারী এনকোয়ারি যত ঝটপট শেষ করা যায়, ততই মঙ্গল..মোদ্দা কথা হল রাজা কঙ্ককে পাকড়াও করা…আপনার জুয়েল সমেত… বুঝেছেন? অভীক সামুই আপনার স্বামীর বন্ধু।
হ্যাঁ, হ্যাঁ..অভীক সামুই।
জানলা দিয়ে হাতছানি দিতে শুরু করে দিয়েছে সুন্দরী সঙ্গিনী সেইসঙ্গে চেঁচিয়ে চলেছে তীক্ষ্ণ তীব্র কণ্ঠে। ট্রেন নিশ্চল হওয়ার আগেই পাদানিতে লাফিয়ে উঠল কয়েকজন ষণ্ডামার্কা পুরুষ। সবশেষে কামরায় উঠল আরেকটি লোক। সঙ্কট সময় এসেছে।
গলায় শির তুলে চেঁচিয়ে চলেছে মেয়েটি?
রাজা কঙ্ক…অ্যাটাক করেছিল আমাদের…আমার জড়োয়া গয়না নিয়ে পালিয়েছে..আমার নাম মিসেস আচারী..আমার হাজব্যান্ড ডেপুটি জেল সুপার…এই তো আমার ভাই এসে গেছে…আশু… আশু…রাজা কঙ্ক আমার সর্বনাশ করে গেছে রে..ওরে আমার কী হবে রে…তোর জামাইবাবু শুনলে কী ভাববে রে…
