এখন ঘুমোনো মানেই রাজা কঙ্ককে সুযোগ দেওয়া!
একশোবার! সায় দিলাম তৎক্ষণাৎ।
এই বলে চোখ পাকিয়ে চেয়ে রইলাম জানলা দিয়ে বাইরে। ঘুমোনো না পণ করলেও ঘুমকে কি ছাই আটকানো যায়। ট্রেনের টিকি-ঢিকি ছন্দ আর দুই বিনিদ্ররজনীর অবসাদ–দুয়ে মিলে কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুম পাড়িয়ে ফেলল আমাকে। চোখের সামনে থেকে মুছে গেল নিসর্গ দৃশ্য।
স্বপ্নজগতে দেখলাম রাজা কঙ্ক নামধারী সেই রহস্যাবৃত অতিমানবটিকে। দেখলাম ধনীর সিন্দুক শূন্য করে দুর্লঙ্ঘ্য পাঁচিল টপকে দুর্গম অঞ্চলেও বিজয়কেতন উড়িয়ে ছায়ার মতো অপসৃয়মান কিংবদন্তীর নায়ক রাজা কঙ্ককে। দেখলাম দরিদ্রের বন্ধু এবং শোষকের শত্রু রাজা কঙ্কর পাঁকের মতো পিচ্ছিল দেহরেখা, অশরীরীর মতো যে ধরাছোঁয়ার বাইরে, ঈগলের মতো যে দুরন্ত দুঃসাহসী দেখলাম সেই অমিতশক্তিধর অসামান্য পুরুষটিকে। সেইসঙ্গে দেখলাম আর একটি চরিত্রকে যে রাজা কঙ্কর নাম নিয়েও রাজা কঙ্ক নয়। দেখলাম ছায়ার মতো শরীর নিয়ে অকস্মাৎ লাফিয়ে ঢুকল কামরার মধ্যে, হনুমানের লঙ্কাদাহনের সময়ে শরীর বিবর্ধনের মতো ক্রমশ ফুলে উঠল তার ছায়াময় কায়া এবং চেপে বসল আমার বুকের ওপর। তার সাঁড়াশীর মতো শক্ত আঙুলের নিষ্পেষণে চোখ ঠেলে বেরিয়ে এল আমার, রুদ্ধ হয়ে এল নিশ্বাস। দমবন্ধ হয়ে মরতে বসেও রক্তজমা চোখে দেখলাম বেঞ্চিতে শুয়ে হাত-পা খেচছে ভয়কাতুরে মেয়েটা।
বাধা দিতে চেষ্টা করলাম না…শক্তিও ছিল না…রগ দপদপ করছে অক্সিজেনের অভাবে…বড়জোর আর একটা মিনিট…তারপরেই সব শেষ।
আগন্তুক তা বুঝল। আঙুল শিথিল করল বটে, বুক থেকে উঠল না। ডানহাতে একটা নাইলন দড়ি বার করল পকেট থেকে। দড়ির প্রান্তে ঢিলে ফঁস। ফঁসের মধ্যে আমার দুহাত গলিয়ে আমাকে বেঁধে ফেলল নিমেষমধ্যে…মুখে রুমাল ঠেসে, দু-পা বেঁধে পোঁটলার মতো ফেলে রাখল বেঞ্চির কোণে। ধড়ফড় করল না উদ্বিগ্ন হল না। ঠান্ডা মাথায় ঝড়ের মতো হাত চালিয়ে এত সংক্ষেপে অথচ এমন পরিপাটিভাবে বাঁধল আমাকে যে বুঝলাম লাইনের লোক। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা না থাকলে এমন নৈপুণ্য অর্জন করা যায় না। বাহাদুর বটে! রতনেই রতন চেনে! পুলিন্দার মতো অসহায় অবস্থায় বেঞ্চিতে শুয়ে মনে-মনে তাকে এক লক্ষবার প্রশংসা করলাম আমিরাজা কঙ্ক!
পরিস্থিতিটা হাস্যকর। আসল রাজা কঙ্ককে পিছমোড়া করে বেঁধেছে নকল রাজা কঙ্ক। শুধু তাই নয় আমার পকেট মেরে বারো হাজার টাকা সমেত নোটবইটা নিজের পকেটে চালান করেছে। রাজা কঙ্ক আনাড়ির মতোই মার খেয়েছে, সর্বস্বান্ত হয়ে আছে একটা মস্ত গর্দভের মতো!
মহিলা সঙ্গিনী চোখ মুদে পড়ে আছে কাঠের মতো। আগন্তুক তার যৌবনের দিকে ফিরেও তাকাল না। মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিল ভ্যানিটি ব্যাগটা। অমনি আঙুল থেকে সোনার আংটিটা খুলে বাড়িয়ে ধরল নকল মূছায় মূৰ্ছিতা সঙ্গিনী। আগন্তুক আংটি নিয়ে গিয়ে বসল কোণে। ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে কোলের ওপর ঢালল কতকগুলো জড়োয়া গয়না। উলটেপালটে দেখে হৃষ্ট হল নিশ্চয়। লুঠের মালের দাম যে সামান্য নয়, আমিও তা দূর থেকে বুঝলাম।
আগন্তুক আমাদের নিয়ে আর চিন্তিত বলে মনে হল না। সিগারেট ধরিয়ে বসে রইল চুপচাপ।
আমি রাজা কঙ্ক জুলজুল করে চেয়ে রইলাম তার পানে। পরিস্থিতি খুবই ঘোরতর। হাওড়া পুলিশ যখন আমায় দেখেছে চম্পকনগরের পুলিশকেও সজাগ করা হয়েছে। স্টেশনে নামলেই আমাকে পুলিশ ঘেরাও করবে আমি জানি। এও জানি, হাওড়া পুলিশের চাইতে বেশি বুদ্ধি ধরে না চম্পকনগরের পুলিশ। পোস্টাল আইডেনটিটি কার্ডে আমার নাম লেখা আছে অভীক সামুই। চম্পকনগরের বন্ধুবান্ধবরাও জানে অভীক সামুই আসছে তাদের বিবরে। রাজা কঙ্ককে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। রাজা কঙ্ককে সবাই চেনে তার ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি আর ঈগল চাউনির জন্যে। সিনথেটিক পরচুলা আর কনট্যাক্ট লেন্সের দৌলতে দুটিই আমার ছদ্মবেশ। দুটিই এখন অনুপস্থিত। ছদ্মবেশহীন রাজা কঙ্ককে তাই চেনা অত সহজ নয়। অভীক সামুই লেখা পোস্টাল আইডেনটিটি কার্ডটা যেন অন্যমনস্কভাবেই দেখিয়েছিলাম হাওড়ার টিকিট কালেক্টরকে–একই কায়দায় চম্পকনগরেও চম্পট দেব আমি–এই ছিল প্ল্যান।
কিন্তু পরিস্থিতি এখন অন্যরকম। হাত-পা বাঁধা রাজা কঙ্ককে পুলিশ এত সহজে প্রিজন ভ্যানে তুলবে, এ যে ভাবাও যায় না। বারো হাজার টাকার কথা বাদ দিলাম–তার চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটা নাম ঠিকানা রয়েছে নোটবইয়ের পাতায়। আমার আগামী অভিযানের প্ল্যান পর্যন্ত ছকে রেখেছি নোটবইয়ে। সুতরাং পুলিশের চোখে ধূলো দেওয়ার চাইতেও আমার কাছে এখন বড় সমস্যা হল নোটবইটা উদ্ধার করা।
কিন্তু আগন্তুকের মতলবটা কী? লাইনের লোক বলেই কৌতূহলটা হতভম্ব করল আমাকে। আমি একলা হলে তার কোনও ঝামেলাই ছিল না। চম্পকনগরে ট্রেন দাঁড়ালেই দরজা খুলে প্যাসেঞ্জারদের ভিড়ে মিশে যাওয়া যেত। কিন্তু কামরার রয়েছে ওই মেয়েটি। সামনে কঙ্ক বসে আছে। বলেই মূছার ভান করে এলিয়ে আছে বেঞ্চির ওপর। কিন্তু চম্পকনগরে ট্রেন দাঁড়ালেই চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠবে সে। সুতরাং এখন থেকেই মেয়েটির মুখ বন্ধ করা দরকার। কিন্তু তাতো করছে না আগন্তুক। সুতরাং তার মতলবটা কী?
