দেখেই আমার কিন্তু খটকা লাগল। হ্যান্ডসাম ফিগার, চোস্ত পোশাক-আশাক, মুখটাও কেমন জানি চেনা-জানা। চেনা লোকের ফটোগ্রাফ অনেক দিন পর দেখলে যেমন চিনেও চিনে ওঠা যায় ণা এ যেন তেমনি। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারলাম না কোথায় দেখেছি নবরূপী কার্তিক মহাশয়কে।
সঙ্গিনী মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখি অবস্থা তার শোচনীয়। দু-চোখ কোটর থেকে খসে পড়ার উপক্রম হয়েছে–আতঙ্ক মূর্ত হয়েছে বিস্ফারিত চোখের তারায়। ফরসা রং ফ্যাকাশে হলে বিশ্রী লাগে–মেয়েটিকেও বিশ্রী লাগছে মুখটা কাগজের মতো সাদা হয়ে যাওয়ার দরুন। বেঞ্চির ওদিকে বসে সুদর্শন আগন্তুক–এদিকে বসে সুন্দরী সঙ্গিনী। আগন্তুক চেয়ে আছে জানলা দিয়ে বাইরে, সঙ্গিনী ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে আগন্তুকের দিকে। ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে রয়েছে ইঞ্চি কয়েক দূরে। মেয়েটির ইচ্ছে ব্যাগটাকে কাছে টেনে আনে কিন্তু ভয়ের চোটে হাত বাড়াতেও পারছে না। থরথর করে আঙুল কাঁপছে, চোখ ঠেলে বেরিয়ে আসছে। অবশেষে আঙুল দিয়ে পৌঁছল ব্যাগের হাতলে এবং কোলের ওপর উঠে এল হলুদ থলে।
এতক্ষণে চারচোখে মিলন হল আমার সঙ্গে মেয়েটির। আমি ওর নার্ভাসনেস দেখে না বলেও পারলাম না ব্যাপার কী? শরীর খারাপ নাকি? জানলা খুলে দেব?
জবাব না দিয়ে ভীরু চোখে মেয়েটি কেবল চেয়ে রইল। কথা বলার মতো সাহসও তার নেই বুঝে আমি অভয় চোখে তাকিয়ে রইলাম। মেয়েটি আমার চোখের মধ্যে তাকিয়ে আড়চোখে বারবার ইশারা করতে লাগল আগন্তুকের পানে। চোখের ইশারায় সে যেন বলতে চায়, লোকটাকে দেখেছেন? সুবিধের নয়।
আমি ওর সভয় চাহনির জবাব দিলাম অভয় হাসি হেসে–ঠিক যেভাবে হেসেছিল তার স্বামী আমার সম্বন্ধে তার ভয় কাটিয়ে দেওয়ার জন্যে। ইঙ্গিতে বললাম–ভয় কী? আমি তো রয়েছি। যুবতীদের দেখলেই যুবকদের প্রাণে বীররসের সঞ্চার ঘটে। আমিই বা বাদ যাই কেন?
ঠিক এই সময়ে আগন্তুক চাইল আমাদের পানে। পর্যায়ক্রমে চোখ বুলিয়ে নিল আমার আর সঙ্গিনীর থেকে মাথা পর্যন্ত। সে চোখে জিজ্ঞাসা নেই, ঔৎসুক্য নেই, ঔদাসীন্যও নেই। পর্যবেক্ষণ সমাপ্ত হতেই চোখ ফিরিয়ে নিয়ে ফের চেয়ে রইল জানলা দিয়ে বাইরের দিকে।
কামরার মধ্যে আর কোনও কথা নেই। মেয়েটি এই নৈঃশব্দ্য সইতে পারল না যেন। সর্বশক্তি কেন্দ্রীভূত করল সুচারু রসনায়–বললে ফিসফিস করে, শুনেছেন?
কী?
এই ট্রেনে সে চলেছে?
কে?
সে আবার কে…একা!
কে? কার কথা বলছেন?
রাজা কঙ্ক।
আগন্তুকের পানে চেয়েই শেষ কথাটা বলল মেয়েটি। অর্থাৎ রাজা কঙ্ক তার দৃষ্টিপথেই আবির্ভূত হয়েছে। বেঞ্চের অপর প্রান্তেই উপবিষ্ট রয়েছে।
সুতরাং আমি নিশ্চিন্ত হলাম। ভয়াবহ ওই নামের মর্যাদা থেকে আমি রেহাই পাওয়ায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
আগন্তুক কিন্তু ঘাড় হেঁট করে বসেই রয়েছে। মুখটা ঈষৎ ফেরানো–যেন আমরা দেখেও চিনতে না পারি। প্রতিবাদের সুরে বললাম, রাজা কঙ্কর কিন্তু বিশ বছর সশ্রম কারাদণ্ডর হুকুম হয়েছে গতকাল–পলাতক থাকা অবস্থাতেই। সুতরাং পলাতক রাজা কঙ্ক খামোকা লোকের সামনে এসে নতুন ঝামেলায় জড়াতে যাবে বলে মনে হয় না। সবচেয়ে বড় কথা খবরের কাগজওয়ালারা পর্যন্ত জেনে গিয়েছে রাজা কঙ্ক ছুটি উপভোগ করতে গিয়েছে লঙ্কার সমুদ্রতীরে–পাকিস্তান থেকে লম্বা দেওয়ার পর থেকে ইন্ডিয়ার মাটি তার কাছে এখন বিষবৎ। সুতরাং–
রাজা কঙ্ক এই ট্রেনেই রয়েছে, বলল মেয়েটি। একটু জোর গলাতেই বলল যাতে গলাটা আগন্তুকের কান পর্যন্ত পৌঁছয়। আমার হাজব্যান্ড ডেপুটি জেল-সুপার। স্টেশনেও শুনলাম পুলিশ তাকে খুঁজছে।
কিন্তু খুঁজবে কেন?
টিকিট কাউন্টারে তাকে দেখা গেছে বলে। চম্পকনগরের টিকিট কেটেছে রাজা কঙ্ক।
সেখানেই তার কলারটা চেপে ধরা হল না কেন?
অদৃশ্য হয়ে গেল বলে। টিকিট কালেক্টর তার টিকিও দেখতে পেল না। তাই সবাই ভাবলে নিশ্চয় এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠে এসেছে রাজা কঙ্ক। জানেন তো এই ট্রেনের দশ মিনিট পরেই আছে এক্সপ্রেস।
তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল। এক্সপ্রেসেই পুলিশ তাকে হাতকড়া লাগাবে।
লাস্ট মোমেন্টে নিশ্চয় এক্সপ্রেস থেকে লাফিয়ে এই ট্রেনে উঠে পড়েছে রাসকেল।
বেশ তো রাসকেলকে এই ট্রেনেই ধরা যাবেখন।
ধরবে? রাজা কঙ্ককে ধরবে?
চম্পকনগরেই সে ধরা পড়বে।
ইহজীবনে আর ধরা পড়বে না। রাজা কঙ্ককে ধরা যায় না। ঠিক পালাবে।
তাহলে পালাক। যাত্রা তার শুভ হোক।
তার আগে কী সর্বনাশটা করবে ভেবেছেন?
কী সর্বনাশ?
চুপ মেরে গেল ভয়াতুরা সঙ্গিনী। নীরবে আঁকড়ে ধরল ভ্যানিটিব্যাগ। বললাম, অত ঘাবড়ালে চলে কি? রাজা কঙ্ক ট্রেনে উঠেছে মেনে নিয়েও বলব সে বোকা নয়। খামোকা নতুন ফ্যাসাদ ডাকতে যাবে না।
আমার কথায় বিশ্বাস হল না মেয়েটির। ভয়ও কমল না।
কি আর করা যায়? আমি খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে রাজা কঙ্কর বিচারকাহিনি পড়তে লাগলাম। সবই অবশ্য জানা। তবুও মন্দ লাগছিল না রংচঙে উপাখ্যানটা। পড়তে-পড়তে চোখের পাতা ভারী হয়ে এল। পরপর দুটো রাত কম ধকল হয়নি শরীরের ওপর। ঘুম তো পাবেই।
চমকে উঠলাম মেয়েটির চাপা আর্তনাদে। খপ করে কাগজটা আমার হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ককিয়ে উঠল সে, কী সর্বনাশ! ঘুমোচ্ছেন নাকি?
না, না, ঘুমোব কেন? প্রাণপণে সজাগ থাকবার চেষ্টা করে বললাম।
