রাত্রে একটা খসখস শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। শব্দটা যেন পাশের ঘর থেকেই আসছে মনে হল। হঠাৎ একটা কাঁচ করে শব্দও হল। উঠে পড়লাম। ঘরের বাতি নিভোনো। ডায়নামো রাত এগারোটার পর বন্ধ হয়ে যায়। মোমবাতি জ্বেলে পাশের ঘরে গেলাম। কিন্তু ঘর খালি! বারান্দার দিকের দরজাটা হা-হা খোলা! অথচ শোওয়ার সময়ে নিজের হাতে দরজা বন্ধ করে শুয়েছিলাম। বারান্দার এলাম। চাঁদের আলোয় দেখলাম কে যেন তরতর করে নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে। নীচে গিয়ে দেখলাম বাইরে যাওয়ার দরজা বন্ধ–তালা দেওয়া–রোজ তোমার কাকিমা নিজের হাতে তালা দিয়ে শুতে যায়–ভোরে উঠে তালা খোলে। নীচের তিনটে ঘরও বন্ধ–ঠেলে দেখলাম। সকাল নটায় দেখলাম, সিন্দুকে দলিল নেই।
কাল রাতে সাড়ে বারোটা নাগাদ শোওয়ার ঘরের ব্যালকনিতে অন্ধকারে বসে আছি চেয়ারে, হঠাৎ একটা তীক্ষ্ণ শিসের শব্দ শুনলাম ব্যালকনির নীচ থেকে! ঝুঁকে তাকালাম কাউকে দেখতে পেলাম না। হাঁক দিয়ে দারোয়ানকে ডাকতেই কে যেন তীর বেগে পালিয়ে গেল–পায়ের আওয়াজ শুনতে পেলাম। দারোয়ান এল। টর্চের আলোয় দেখল, ব্যালকনির নীচে নতুন ফুলের চারার পাশে নরম মাটিতে জুতোর ছাপ। সত্যিই কেউ দাঁড়িয়েছিল।
গভীর মনোযোগে সব কথা শুনে কিরীটি বললে, দলিল বোধহয় পাওয়া যাবে। আপনি দিনরাত বাড়ির আশেপাশে পাহারার ব্যবস্থা করুন।
.
রাত দেড়টা।
চিলেকোঠার ঘরে ঘাপটি মেরে বসে কিরীটি রায়। হঠাৎ ছাদের ওপর শোনা গেল পায়ের শব্দ।
মাথায় ঘোমটা দিয়ে কে যেন ঢুকল ঘরে। দেশলাই জ্বেলে জ্বালাল মোমবাতি। জ্বলন্ত মোমবাতি রাখল বাগানের দিকের জানলার।
আধঘণ্টা পরে হঠাৎ ঘরের ধুলোয় আছড়ে পড়ে ডুকরে কেঁদে উঠল আগন্তুক।
কিরীটি কাছে গিয়ে ধীরে ধীরে ডাকল, পিসিমা।
কিরীটির দুহাত চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন পিসিমা। লোকে জানে তার ছেলে শম্ভ মারা গেছে। কিন্তু সে মরেনি–গোল্লায় গেছে। রোগজীর্ণ কঙ্কালসার দেহ নিয়ে কিছুদিন আগে এসেছিল। দেনায় ডুবে আছে। এক হাজার টাকা এখুনি একজন দেবে সিন্দুক থেকে একটা দলিল চুরি করে আনলে। নইলে জেলে যেতে হবে। পিসিমা বিবেকের সঙ্গে যুদ্ধ করে হেরে গেছেন। ছেলের জন্য কীভাবে চাবি চুরি করে সিন্দুক খুলে দলিল সরিয়েছেন, তা বলতে পারলেন না লজ্জায়।
কথা ছিল ব্যালকনি থেকে নীচে ফেলে দেবেন দলিলটা লুফে নেবে শম্ভু। কিন্তু পরপর দু-রাত ব্যর্থ হয়েছেন পিসিমা। আজ–
পিসিমাকে নীচে পাঠিয়ে সলিলকে ডাকল কিরীটি। ওর সামনেই হাত বাড়িয়ে মধুসূদনের বাবার ফটোর পেছন থেকে বার করে নিল খামসমেত দলিলটা।
পিসিমা কিন্তু বলেননি, দলিল কোথায় আছে। তবুও কিরীটি জানত। কী করে বলতে পারেন?
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
ছবিটা অনেকদিন ঝাড়পোঁছ হয়নি–অথচ বেঁকে ঝুলছিল। মধুসূদন উঠে পড়ায় পিসিমা দলিলটা ছবির আড়ালে রেখে তরতরিয়ে পালিয়েছিলাম নীচে।
রাজা কঙ্ক
বাই রোড গাড়িটাকে পাঠিয়েছিলাম আগের দিন চম্পকনগরে। ট্রেন থেকে সেখানে নেমেই গাড়ি হাঁকিয়ে যাব বন্ধুদের বিবরে–এই ছিল আমার প্ল্যান।
হাওড়া থেকে ট্রেন ছাড়বার মিনিট কয়েক আগেই আমার কামরায় এসে উঠল সাতজন আরোহী। পাঁচজন আবার সিগারেটখোর। এতটা পথ এদের সঙ্গে যেতে হবে ভেবে মেজাজ খিঁচড়ে গেল। স্টেটসম্যান আর ব্র্যাডশ নিয়ে চলে এলাম পাশের কামরায়।
আমাকে দেখেই খুবই বিরক্ত হল যে মেয়েটি তার বয়স পঁচিশও নয়। ভারী মিষ্টি মুখখানা। পানপাতার মতো গড়ন। চোখ-মুখ-নাক নিখুঁত। ঢলঢলে চোখে মাদকতা বা সেক্স যাই বলুন না কেন আছে। কামরায় একমাত্র আরোহী সে। তাই আমাকে দেখে ভুরু কুঁচকে ফিসফিস করে কী যেন বলল ফুটবোর্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রলোকটিকে।
বুঝলাম আমার সম্বন্ধে লাগানো হল। ভদ্রলোক মেয়েটির স্বামী নিশ্চয়। ট্রেনে তুলে দিতে এসেছেন। আমার আপাদমস্তক খুঁটিয়ে দেখলেন। সন্তুষ্ট হলেন এবং মৃদু হেসে বোধহয় অভয় দিলেন স্ত্রীকে। শুনে মেয়েটিও হাসল আমার দিকে চেয়ে। ছোট্ট কামরায় ঘণ্টাকয়েক আমার সঙ্গে তালা চাবি দিয়ে রাখলেও যেন তার আর কোনও ভয় নেই।
ভদ্রলোক বললেন, রাগ কোরো না মণি কেমন? চলি, নইলে অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফেল করব।
জানলা থেকে রুমাল নেড়ে বিদায় জানাল মেয়েটি এবং লুকিয়েচুরিয়ে আঙুলের ডগায় অধর ছুঁইয়ে কয়েকটা তোফা চুম্বনও নিক্ষেপ করল স্বামীর পানে।
গার্ড হুইশল দিয়েছে। ট্রেন চলতে শুরু করেছে।
ঠিক এই সময়ে প্ল্যাটফর্ম দিয়ে ছুটতে ছুটতে এল একটা লোক।
লোকজন হইচই করে উঠল তার দুঃসাহস দেখে। কিন্তু কোনওদিকে না চেয়ে ফুটবোর্ডে লাফিয়ে উঠেই দড়াম করে দরজা খুলে ভেতরে এসে পড়ল আগন্তুক।
আমার সঙ্গিনী অন্যমনস্ক ছিল। আচমকা ওইভাবে একজনকে কামরায় ঢুকতে দেখেই আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠে ধপ করে বসে পড়ল বেঞ্চিতে।
আমি ভীতু নই। কিন্তু প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেন বেরিয়ে যাওয়ার ঠিক আগেই এভাবে কামরায় ছিটকে আসা মোটেই স্বাভাবিক নয়। বদ মতলব না থাকলে সচরাচর….
লোকটার চেহারা দেখে কিন্তু সেরকম কিছু মনে হয় না। ঠিক যেন পাকা মাকাল ফলটি। যেমন টুসটুসে রং–টুসকি দিলেই যেন ফেটে পড়ে–তেমনি ফিটফাট সাজগোজ। যে লোক এ রকম তেড়েমেড়ে ছুটন্ত ট্রেনে লাফিয়ে ওঠে, তার চেহারা আর পোশাক আর একটু নিরেশ হলে যেন মানাত। চেহারা দেখলে মনে হয় বুঝি পারস্যের খানবাহাদুর কিম্বা আরব দেশের তৈল সম্রাট। লাল-লাল ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, টানা-টানা চোখ, চোখাচোখা নাক। আর পোশাক? র্যানকিন-হার্মান গোলাম মহম্মদরাও বুঝি অমন কাট-ছাঁট রপ্ত করতে পারেনি এখনও। যেমন দামি কাপড় তেমনি বাহারি স্যুট। অমন সুন্দর টাইও বড় একটা দেখা যায় না। জোডিয়াক তো নয়ই বিলিতি নিশ্চয়ই।
