হাতির দাঁতের একটা বাক্স বার করলেন মহীতোষবাবু। ভেতরে ভাঁজ করা কাগজ। কাগজে লেখা একটা উদ্ভট ছড়া :
মুড়ো হয় বুড়ো গাছ
হাত গোণ ভাত পাঁচ
দিক পাও ঠিক ঠিক জবাবে।
ফাল্গুন তাল জোড়
দুই মাঝে উঁই ফোঁড়
সন্ধানে ধন্দায় নবাবে।
মহীতোষবাবু বললেন, ডিটেকটিভদের অনেক ক্ষমতা থাকে। হেঁয়ালির সমাধান করতে পারেন, মিস্টার মিত্তির?
ফেলুদার ভালো নাম প্রদোষ মিত্র। বলল, গুপ্তধনের ইঙ্গিত রয়েছে শেষের লাইনে। এ সঙ্কেতের কথা আর কে জানে?
আমি, শশাঙ্ক আর তড়িৎ।
.
তড়িৎ সেনগুপ্ত মারা গেল সেই রাতেই। ঘটনাটা ঘটল এইভাবে।
শুতে উঠে দেবতোষবাবুর সঙ্গে দেখা হয়েছিল ফেলুদার। ভদ্রলোক কাছে এসে আবোল তাবোল কথা বলতে বলতে অদ্ভুত একটা কথা বললেন, যুধিষ্ঠিরের রথের চাকা মাটি ছুঁত না। তাও শেষটায় ছুঁল। তার আগে বললেন, হাতিয়ার কি আর সবাইয়ের হাতে বাগ মানে? সবাই কি আর আদিত্যনারায়ণ হয়?
ফেলুদা লক্ষ করল, ভদ্রলোকের খড়মের তলায় রবারের সাইলেন্সার লাগানো।
রাত এগারোটায় শোনা গেল মহীতোষবাবুর চাপা ধমকানি।
আমি শেষবারের মতো বলছি–এর ফল ভালো হবে না। কিন্তু কাকে ধমকাচ্ছেন তা বোঝা গেল না।
গভীর রাতে দেখা গেল কালবুনির জঙ্গলে একটা টর্চের আলো ঘোরাফেরা করছে। বিদ্যুতের আলো জ্বলছে আকাশে। বৃষ্টি আসছে।
হাইলি সাসপিশাস, চাপা গলায় বললেন লালমোহনবাবু।
টর্চ নিভে গেল। শোনা গেল কানফাটা বাজের আওয়াজ।
খবর এল সকালবেলায়। তড়িত্বাবুকে বাঘে খেয়েছে। ম্যানঈটার।
তক্ষুনি জিপে করে সবাই গেলেন জঙ্গলে। তড়িৎবাবুর আধখাওয়া দেহ যেখানে পড়ে, তার ধারেকাছে বাঘের দাগ অবিশ্যি পাওয়া গেল না। বৃষ্টির জলে ধুয়ে গেছে।
কিন্তু একটা আশ্চর্য আবিষ্কার করল ফেলুদা। তড়িবাবুর বুকে বাঘের আঁচড়ের দিকে তাকিয়ে বললে, বাঘ কি কেবলমাত্র একটা নখের সাহায্যে একটা গভীর আঁচড় দিতে পারে?
দেখা গেল, আঁচড়টা সার্ট ভেদ করে বুকে ঢুকে গেছে।
ধারালো ফলা দিয়ে খুন করা হয়েছে তড়িৎবাবুকে! বাঘে খেয়েছে পরে!
.
সেইরাতেই উদ্ভট হেঁয়ালির সমাধান করে ফেলল ফেলুদা। হেঁয়ালি উদ্ধারে তার জুড়ি নেই। ইংরেজি কেতাব ছাড়াও বিদগ্ধমুখমণ্ডলম বলে একটা সংস্কৃত হেঁয়ালির বইও আছে তার কাছে। আটকাল শুধু একটা শব্দ নিয়ে–বুড়ো গাছ।
এমন সময়ে আবির্ভূত হলেন দেবতোষবাবু। ফেলুদা তাকেই জিগ্যেস করে বসল, এখানে বুড়ো গাছ মানে প্রাচীন গাছ কিছু আছে কি?
প্রাচীন আর বুড়ো কি এক হল? ঘোলাটে চোখে বললেন উন্মাদ দেবতোষবাবু। কাটা ঠাকুরানির মন্দির দেখেছ? মন্দিরের পশ্চিমে একটা অশ্বত্থ গাছ আছে। গায়ে একটা ফোকর। ঠিক যেন ফোকলা দাঁত বুড়ো। সেই গাছেই একদিন মহী–
দাদা, চলে এসো।
বাজখাঁই গলায় হাঁক দিয়ে ঘরে ঢুকলেন মহীতোষবাবু। –একরকম জোর করেই ঘাড় ধরে ঘর থেকে বার করে নিয়ে গেলেন দাদাকে। ঘরে ঢুকিয়ে তালা দিয়ে দিলেন বাইরে।
পরদিন শিকারি মাধবলালকে নিয়ে ফেলুদা সদলবলে গেল কাটা ঠাকুরানির মন্দিরের পাশে। বাঁশের গায়ে গুলির দাগ আবিষ্কার করল ফেলুদা–পাওয়া গেল খানিকটা বাঘের লোম। গুলি খেয়ে পালিয়েছে বাঘ–তার চিহ্ন।
আর পাওয়া গেল সেই তলোয়ারটা। ঝোঁপের মধ্যে পড়েছিল।
আদিত্যনারায়ণের তরবারি। ডগায় খয়েরি রঙের রক্তের দাগ।
গুপ্তধন কিন্তু উধাও! মাটিতে গর্ত! কলসি নেই!
কাটা ঠাকুরানির মন্দিরে গেল ফেলুদা। মাটিতে নাক ঠেকিয়ে কী যেন দেখল। অদৃশ্য হল মন্দিরের অন্ধকারে। ফিরে এল কিছু পরেই।
বলল, অন্ধকারের মাঝে আলোর আভাস পাচ্ছি। তোপসে, বাড়ি চ।
.
বাড়ি ফিরে ট্রোফিরুমে ঢুকে একে-একে সবকটা বন্দুক নামিয়ে পরীক্ষা করল ফেলুদা। উলটেপালটে দেখল বন্দুকের বাঁট, ট্রিগার, নল, সেফটিক্যাচ।
তারপর বলল মহীতোষবাবুকে, গুপ্তধন উধাও হয়েছে। গর্ত খুঁড়ে কেউ সরিয়েছে।
সেকী! চলুন, সবাই গিয়ে দেখে আসা যাক।
কিন্তু বিকেলে তুমুল বৃষ্টি নামায় জঙ্গলে যাওয়া আর হল না। তবে জানলায় দাঁড়িয়ে ফেলুদা দেখল, দুটি মূর্তি টর্চের আলো জ্বালিয়ে শলাপরামর্শ করছে দারোয়ানের ঘরের কাছে দাঁড়িয়ে।
এই দারোয়ানই খবর দিয়েছিল ফেলুদাকে–পরশু রাতে তড়িৎবাবু জঙ্গলে ঢুকলে পেছন পেছন আরও একজন গিয়েছিল টর্চ নিয়ে। অন্ধকারে তার মুখ দেখা যায়নি।
.
পরদিন সকালে সবাই মিলে গেলেন কাটা ঠাকুরানির মন্দিরে। ফেলুদা রিভলভার হাতে মন্দিরে ঢুকল। পাঁচ সেকেন্ডের উপর্যুপরি দু-বার গুলিবর্ষণ করে একটা কেউটে বধ করে উদ্ধার করে নিয়ে এল নারায়ণী মুদ্রা বোঝাই একটা পেতলের ঘড়া।
তড়িতের কাণ্ড। গুপ্তধন চুরি করে সরিয়ে রেখেছিল মন্দিরের অন্ধকারে।
ঠিক এই সময়ে ডেকে উঠল কাকর হরিণ। বাঘ আসছে।
.
দাঁতে দাঁত চিপে মহীতোষবাবু বললেন, মিস্টার মিত্তির, যদি প্রাণের মায়া থাকে তো চলে যান।
কোথায়?
দুজনের হাতেই বন্দুক। মহীতোষবাবুর বন্দুক উঠেছে ফেলুদার দিকে।
বলছি যান–জিপে। আমার হুকুম।
আচমকা বাঘের গর্জনে সমস্ত বনটা কেঁপে উঠল। মন্দিরের পেছনে অর্জুন গাছের সাদা ডালের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল একটা গনগনে আগুনের মতো চলন্ত রং। সেটা লম্বা ঘাসের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে একটা প্রকাণ্ড ডোরাকাটা বাঘের চেহারা নিল।
মহীতোষবাবুর হাত থরথর করে কাঁপছে।
