বাঘ নীচু হয়েছে–এবার লাফ দেবে।
আচমকা গর্জে উঠল দুটো বন্দুক। বাঘ খতম। কিন্তু কি আশ্চর্য! মহীতোষবাবুর হাতের বন্দুক চলে গিয়েছে শশাঙ্কবাবুর হাতে। গুলি চালিয়েছেন তিনি এবং ফেলুদা। দুটো গুলিই ঢুকেছে বাঘের মাথায়।
মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে রইলেন মহীতোষবাবু।
ফেলুদা বলল, অযথা দুশ্চিন্তায় ভুগছেন মহীতোষবাবু। আপনার শিকারের অক্ষমতা কারুকে বলব না। আপনি যে মিথ্যের আশ্রয় নিয়েছেন, আপনার দাদা তা জেনে খুব কষ্ট পেয়েছেন। দুবার তা নিয়ে আক্ষেপ করেছেন আমার কাছে। মনে হয়েছে অসংলগ্ন কথা। তাছাড়া চিঠিতে আপনার সই দেখেই বুঝেছিলাম, আপনার হাত কাঁপে। বন্দুক ধরবেন কী করে?
চেঁচিয়ে উঠলেন মহীতোষবাবু, এককালে ধরতাম। এয়ারগান দিয়ে শালিক মেরেছিলাম। চড়ুইভাতি করতে এসে অশ্বথের ওই ডালে উঠেছিলাম। দাদা বলল বাঘ আসছে। আমি বাঘ দেখব বলে লাফ মেরে–
হাত ভাঙলেন?
কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচার। হাড় আর জোড়া লাগেনি ভালো করে।
তবুও শিকারি হওয়ার সখ হল বংশের মর্যাদা রাখবার জন্যে। তাই নিজের দেশের জঙ্গলে যেতেন না ধরা পড়ে যাবেন বলে। আসাম উড়িষ্যার জঙ্গলে যেতেন–বাঘ শিকার করতেন শশাঙ্কবাবুনাম হত আপনার। কাহিনি লিখতেন তড়িবাবু। নাম হত আপনার। একদিন দুজনেই তা সইতে পারলেন না। এই নিয়ে পরশু রাতে আপনি শাসালেন শশাঙ্কবাবুকে। সেই রাতেই তড়িৎবাবু গুপ্তধন তুলে নিয়ে পালাবেন ঠিক করলেন। একা জঙ্গলে ঢুকলেন আদিত্যনারায়ণের তলোয়ার নিয়ে। সেদিন বাজ, বিদ্যুৎ আর বৃষ্টির মাতামাতি চলছে আকাশে। শশাঙ্কবাবু এলেন পেছন পেছন– বন্দুকের বাঁটে সে চিহ্ন পেয়েছি গতকাল।
এসেছিলাম তড়িৎকে বাঁচাতে, বললেন শশাঙ্কবাবু। কিন্তু দেখলাম বাঘ ওকে খাচ্ছে। গুলি চালালাম, ওকে মুখে নিয়ে বাঘ পালাল।
গতকাল দারোয়ানের ঘরের পাশে দাঁড়িয়ে মাধবলালকে কী বলছিলেন, শশাঙ্কবাবু? মন্দিরের পেছনে টোপ ফেলতে?
মোষের বাচ্চা। চাপা গলায় বললেন শশাঙ্কবাবু।
যাতে বাঘ আসে এবং আমার সামনেই মহীতোষবাবুর কেরানি ফঁস হয়ে যায়, তাই না?
মহীতোষবাবু এগিয়ে এসে বললেন, মিস্টার মিত্তির, গুপ্তধনের খানিকটা ভাগ আপনি নিন।
রৌপ্যমুদ্রা নয়, মিস্টার সিংহরায়। আমি চাই আদিত্যনারায়ণের এই তলোয়ারটা।
ইস্পাতের তলোয়ার–রূপো ফেলে?
কারণ এই তলোয়ারই তড়িৎকে মেরেছে।
খুন?
না।
আত্মহত্যা?
তাও না। বলে তলোয়ারটা শশাঙ্কবাবুর বন্দুকের দিকে নিয়ে গেল ফেলুদা। কাছে আসতেই খটাং শব্দ করে জোড়া লেগে গেল ইস্পাতে-ইস্পাতে।
একী, এ যে চুম্বক! বলে উঠলেন শশাঙ্কবাবু।
হ্যাঁ, চুম্বক। তলোয়ারটা–বন্দুক নয়। আগে ছিল না তাই অন্যান্য ছুরি ছোরার পাশেই শোয়ানো থাকত আলমারিতে, গায়ে গায়ে লাগত না হয়েছে পরশু রাতে।
কী করে? জিগ্যেস করলেন মহীতোষবাবু। রুদ্ধশ্বাস বাকি সকলে।
ফেলুদা বলল…।
কী বলল বলুন তো?
.
গোয়েন্দা ধাঁধার সমাধান
ফেলুদা বলল, কোনও মানুষের হাতে লোহা বা ইস্পাতের কোনও জিনিস থাকা অবস্থায় যদি তার ওপর বাজ পড়ে, তাহলে সে অবস্থায় সে জিনিস চুম্বকে পরিণত হয়। শুধু তাই নয়, সে জিনিস অনেক সময়ে বিদ্যুৎকে আকর্ষণ করে। তড়িৎবাবুর মৃত্যু হয়েছিল বজ্রাঘাতে, এবং হয়তো এই তলোয়ারই তার মৃত্যুর জন্যে দায়ী। মাটি খুঁড়ে কলসি বার করার পর বৃষ্টি নামে, তার সঙ্গে বাজ ও বিদ্যুৎ। তড়িবাবু অশ্বত্থাগাছের নীচে আশ্রয়ের জন্যে ছুটে আসেন। বাজ পড়ে তড়িবাবু ছিটকে পড়ার সময়ে তার হাতের তলোয়ার বুকে বিঁধে যায়। সম্ভবত মৃত্যুর পর মুহূর্তেই তলোয়ার তার দেহে প্রবেশ করে।
বলে উঠলেন লালমোহনবাবু, তড়িবাবু শেষটায় তড়িৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেলেন?
* প্রকাশিত
নীহাররঞ্জন গুপ্ত-র গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
রহস্যভেদী। কিরীটি রায়
কিরীটি তখন পঞ্চম বার্ষিক শ্রেণির ছাত্র। ফলিত পদার্থ বিজ্ঞানে এম. এস. সি হতে চলেছে। থাকে শিয়ালদার কাছে অখ্যাতনামা বাণীভবন মেসের তিনতলায়। অন্ধকার খুপরি। মাসিক সাত টাকায় খাওয়া-পরা-থাকা।
শীতকাল। রবিবার। সন্ধ্যা।
কলেজ-বন্ধু সলিল সরকার এসে বলল, কিরীটি, আজ আমার মনটা ভালো নেই। একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে বাড়িতে। বাবার ঘরের সিন্দুকে একটা দলিল ছিল। কয়েকদিন ধরে হাইকোর্টে একটা মামলা চলছে, দলিলটা সেই মামলা সংক্রান্ত। গতকালও বাবা সকালের দিকে দলিলটা সিন্দুকেই দেখেছেন। আজ সকালবেলা সিন্দুক খুলে উকিলকে দলিল দিতে গিয়ে দেখলেন দলিল নেই। সিন্দুকের টাকাকড়ি, অন্যান্য জিনিসপত্র সবই ঠিক আছে, কেবল দলিলটাই নেই সিন্দুকে।
সিন্দুকের চাবি কার কাছে থাকে?
বাবার কোমরে।
মামলাটা কার সঙ্গে হচ্ছে?
মামলাটার একটু ইতিহাস আছে। ২৪-২৫ বছর আগে সোনারপুরে একটা প্রকাণ্ড বাগানবাড়ি দেনার দায়ে বিক্রি হয়ে যায়। বাগানবাড়িটা ছিল রাজা ত্রিদিবেশ্বর রায়ের। ওঁর পিতামহ যজ্ঞেশ্বর রায় ব্যবসা করে জমিদারি গড়ে তোলেন আর গভর্নমেন্টের কাছে রাজা খেতাব পেয়েছিলেন। রাজা ত্রিদিবেশ্বর কিন্তু ব্যবসা করতে গিয়েই পথে বসলেন। দেনার দায়ে শেষ বসতবাটি সোনারপুরের বাগানবাড়িটাও বিক্রি করতে হল। বাবা সাতহাজার টাকায় কিনে নিলেন বাগানবাড়ি। খানিকটা ঝোঁকের মাথায় কিনেছিলেন বলেই কোনও সংস্কার করেননি। বছরখানেক আগে অনিল চৌধুরী নামে এক ভদ্রলোক এসে কিনতে চাইলেন ভাঙা বাগানবাড়িটা উদ্দেশ্য, স্কুল স্থাপন করা। লেখাপড়া হবে, সব ঠিকঠাক, এমন সময়ে বাবা একটা বেনামি চিঠি পেলেন। চিঠিতে লেখা ছিল?
