এই পর্যন্ত বলে আমি উঠে পড়লাম। হাঁ-হাঁ করে ইন্সপেক্টর বললে, স্যার, আসল কথাটাই তো বলে গেলেন না। নকল জাম্বুলিঙ্গমকে গোড়া থেকেই সন্দেহ করলেন কেন?
বললাম তো ছাতার ফেরুল্ল দেখে।
কী ছিল ছাতার ফেরুলে?
কিছু ছিল না। শুধু একটা বিশেষ দিক ছিল।
ফেরুল ক্ষয়ে গিয়েছিল? তা তো যাবেই।
ওই যে বললাম, চোখ না থাকলে ডিটেকটিভ হওয়া যায় না। দরকারি অদরকারি সব কিছুই চোখে পড়া চাই। আমি দেখলাম, ফেরুলের যেদিকটা যেভাবে ক্ষয়েছে, সেদিকটা সেভাবে ক্ষইতে পারে তখনই, যদি ছাতার মালিক বাঁ-হাতে ছাতা নিয়ে হাঁটে।
ডান হাতে ছাতা নিয়ে ছড়ির মতো দুলিয়ে হাঁটলে ফেরুলের যেদিকটা বেশি ক্ষয়ে যায়, সেদিকটা থাকে ফেরুলের ওপর দিকে সামান্য ডাইনে ঘেঁষে।
কিন্তু বাঁ-হাতে ছাতা বা ছড়ি রাখলে ক্ষওয়ার দিকটা থাকবে সামান্য বাঁদিক ঘেঁষে।
নকল জাম্বুলিঙ্গমের ছাতার ফেরুলও দেখলাম সামান্য বাঁয়ে ক্ষওয়া। কিন্তু ছাতা বা ছড়ি তো সবাই ডান হাতেই রেখে পথ চলে–বাঁ-হাতে হাজারে একজনও রাখে কিনা সন্দেহ। তবে কি ভদ্রলোক ল্যাটা?
কৌতূহল হতেই পরখ করলাম। আগাম টাকা চাইলাম কায়দা করে। ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে চেক লিখলেন ডান হাতে–স্বচ্ছন্দগতিতে নয়। আড়ষ্টভাবে।
বুঝলেন তো? অজ্ঞাতসারে দীর্ঘদিনের অভ্যাসমত যিনি বাঁ-হাতে ছাতা রাখেন, তিনি যে ল্যাটা সেটা চেক লেখবার সময়ে প্রকাশ করতে চান না। কেন? কেন এই গোপনতা? কেন এত লুকোচুরি?
মনের মধ্যে ঘোর সন্দেহ নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে এলাম। মালুমঙ্গলমের লাশ আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত পাকা প্রমাণ পাইনি। ছোরা মারার ধরন দেখেই অনুমান করেছিলাম, হত্যাকারী বাঁ-হাত চালিয়েছে। অর্থাৎ ল্যাটা। পোস্টমর্টেম রিপোর্টও তাই বলেছে।
সুতরাং নকল জাম্বুলিঙ্গম, মানে ল্যাটা কৃষ্ণস্বামীই আসল খুনি। প্রভাবতী নয়। বলে, পা বাড়ালাম চৌকাঠের দিকে।
ভ্যাবাচাকা ভাবে পেছন পেছন দৌড়ে এল ইন্সপেক্টর, স্যার, স্যার, কেস সাজাব কী করে?
সে ভার আপনার। আমার ভার ছিল মালুমঙ্গলমকে বার করা। টাকাও খেয়েছি তার জন্যে। নুন খেয়ে বেইমানি করতে পারব না। যার টাকা খেয়েছি, তার বিরুদ্ধে কী করে কেস সাজাই বলুন তো? বলে আর দাঁড়ালাম না। আমি।
.
কাহিনি শেষ করে সশব্দে ঢেকুর তুলল ইন্দ্রনাথ। বলল, বউদির তেলেভাজা খেয়ে আমার অম্বল হয়ে গেল।
বেইমান! বলল কবিতা।
* রোমাঞ্চ পত্রিকার প্রকাশিত। শারদীয় সংখ্যা, ১৯৭১।
সত্যজিৎ রায়ের গল্প নিয়ে গোয়েন্দা ধাঁধা
রয়াল বেঙ্গল রহস্য। ফেলুদা
সক্কালবেলা লালমোহন গাঙ্গুলি ওরফে জটায়ু এসে হাজির। ভদ্রলোকের হাইট মোটে পাঁচফুট পাঁচ ইঞ্চি, অনর্গল ভুল ইংরেজি বলেন, ভুল তত্ত্ব দিয়ে রগরগে রোমাঞ্চ গল্প লেখেন। বাজারে দারুণ কাটতি তার বইয়ের। এক-একখানা বইয়ের চার-পাঁচটা এডিশন হয়ে গেছে এবং তিনি আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছেন।
এহেন লালমোহনবাবু এসে বললেন, জঙ্গলে যাবেন? ফেলুদা তক্তাপোশের ওপরে উঠে বসে বললেন, আপনার জঙ্গলের ডেফিনিশন?
সেন্ট পারসেন্ট জঙ্গল। যাকে বলে ফরেস্ট।
কোথায়?
ডুয়ার্সে। মহীতোষ সিংহরায়ের নাম শুনেছেন তো? জবর শিকারি। অনেক বই লিখেছেন। এই দেখুন চিঠি লিখে ইনভাইট করেছেন আপনাকেও।
ফেলুদা কিছুক্ষণ চিঠিটার দিকে চেয়ে থেকে বললে, ভদ্রলোক কি বৃদ্ধ?
নো স্যার।
সইটা দেখে বুড়ো বলে মনে হয়েছিল। চিঠিটা অন্যের লেখা।
নিউজলপাইগুড়ি স্টেশন থেকে ফেলুদা, তোপসে আর লালমোহনবাবুকে নিতে এলেন যে ভদ্রলোক নাম তার তড়িৎ সেনগুপ্ত। বয়স তিরিশ। সাহিত্যের ডিগ্রি আছে। মহীতোষবাবুর সেক্রেটারি। শিকারের বইগুলো উনিই শুনে-শুনে লিখে যান মহীতোষবাবুর হাতের লেখা ভালো নয় বলে।
সিংহরায় প্যালেসে গাড়ি পৌঁছতেই মহীতোষবাবু নিজে ওদের খাতির করে নিয়ে গেলেন। বৈঠকখানায়। ভদ্রলোক দারুণ ফরসা, চুল পাকা, চওড়া চোয়াল, চওড়া কাঁধ, চাড়া দেওয়া গোঁফ। গলার ডাক বাঘের ডাকের মতো। রীতিমতো ঢ্যাঙা।
মহীতোষবাবুরা তিনপুরুষের শিকারি। ঠাকুরদা আদিত্যনারায়ণ বাঘের হাতে মারা গেছেন, বাবাও তাই। মহীতোষবাবু তাই নিজের দেশের জঙ্গলে শিকার করেন না–আসাম আর উড়িষ্যার জঙ্গলে গিয়ে বাঘ মারেন। বাঘ মেরেছেন একাত্তরটা, লেপার্ড পঞ্চাশের ওপর। শিকারের কাহিনি লিখতে আরম্ভ করেন পঞ্চাশ বছর বয়েসে। এর মধ্যেই এত নাম।
বৈঠকখানায় আলাপ হল শশাঙ্ক সান্যালের সঙ্গে। মহীতোষবাবুর বাল্যবন্ধু। ওঁর কাঠের কারবার দেখাশুনা করেন। চেহারায় আর হাবভাবে আশ্চর্য বেমিল। মাথায় তেমন ঢ্যাঙা নন, কথা বলেন নীচু গলায়, চুপচাপ শান্ত স্বভাবের মানুষ।
প্রাথমিক গল্পগুজবের পর বিশ্রাম নিতে দোতলায় উঠল ফেলুদা, তোপসে, লালমোহনবাবু। সেই সময়ে দেখা গেল বেগুনি ড্রেংসি গাউন পরা আর একজন তালঢ্যাঙা পুরুষকে। মাথার চুল বেবাক সাদা।
মহীতোষবাবুর দাদা। দেবতোষবাবু। বদ্ধ উন্মাদ।
বিকেলের দিকে জিপে করে জঙ্গলে বেড়িয়ে এল সবাই। কাকর হরিণের ডাক শোনা গেল বটে, বাঘ দেখা গেল না। ম্যানঈটার আসছে শুনেই অবশ্য গা ঠান্ডা হল লালমোহনবাবুর।
বাড়ি ফেরার পর মহীতোষবাবু ওদের নিয়ে গেলেন ঠাকুরদার ঘরে। শেষ বয়েসে তিনি পাগল হয়ে গিয়ে একটা তলোয়ার দিয়ে বাঘ মারতে ছুটেছিলেন। তলোয়ারটা আলমারিতেই রয়েছে অন্যান্য ছুরি ছোরার সঙ্গে।
