ভেবেছিলাম এমন একটা বম্বশেল নিউজ শুনে আঁতকে উঠবে ইন্সপেক্টর। কিন্তু অতি আঘাতে চেতনা অসাড় হয়ে যায় শুনেছি। ভদ্রলোকেরও হল তাই। চোয়াল স্কুলে পড়ল। মুখ দিয়ে টু শব্দটি বেরোল না। ফ্যালফ্যাল করে কেবল তাকিয়ে রইল আমার পানে।
আমি বললাম–ইচ্ছে করেই বললাম, কী হল মশাই, অমন করছেন কেন?
প্রায় খাবি খাওয়ার মতো মুখব্যাদান করে বলল ইন্সপেক্টর, স্যার, আপনি ঠাট্টা করছেন?
আরে গেল যা, একটু বিরক্ত হয়েই বললাম আমি, ঠাট্টা করার সময় এটা?
ডক্টর জাম্বুলিঙ্গম বাজে লোক নন তো।
আমি কি বলেছি বাজে লোক? বাজে লোক কখনও এমন উল্টো দিক থেকে কে সাজাতে পারে? অলপ্রুফ কে মশাই। ছুঁচ ফোঁটানোর জায়গা নেই। ব্রেন না থাকলে কেউ কর্ণাটক থেকে বঙ্গে দৌড়ে ইন্দ্রনাথ রুদ্রকে অ্যাপয়েন্ট করে? কেন জানেন?
আজ্ঞে?
প্যাঁচের কেস বলে। ব্রেনি প্যাঁচ তো, জবর ব্রেন না হলে প্যাঁচ ধরতে পারত না। না ধরতে পারলে প্রভাবতীকে ফাঁসানো যেত না। প্রভাবতী না ফসলে জাম্বুলিঙ্গম কেটে বেরিয়ে যেতে পারতেন না। বুঝলেন?
আজ্ঞে না।
বুঝিয়ে দিচ্ছি। এ কেসের প্রথম প্যাঁচ হচ্ছে টাইপরাইটারের চিঠি। ইচ্ছে করেই পুরোনো রিবনে টাইপ করা হয়েছিল চিঠিটা। পরের দিন নতুন রিবন লাগানো হবে জেনেই পুরোনো রিবনে টাইপ করে রাখা হয়েছিল। ফলে, ইচ্ছে করেই একটা অসঙ্গতি রেখে দেওয়া হয়েছে। অসঙ্গতিটা ধরা পড়লে প্রভাবতীকে সন্দেহ হবে। কিন্তু ধরবার মতো ব্রেন তো চাই। তাই ডাক পড়ল ইন্দ্রনাথ রুদ্রের।
আবার খাবি খেলো ইন্সপেক্টর। আমি বললাম, এ কেসের দ্বিতীয় প্যাঁচ হল উইলের জালিয়াতি। নাম মুছে প্রভাবতীর নাম লেখা হয়েছে ইচ্ছে করেই। ইনফ্রারেড ফটো তুললেই তলায় অস্পষ্ট নামটা দেখা যাবেই। ফলে। সব সন্দেহ গিয়ে পড়বে প্রভাবতীর ওপর। কিন্তু ইনফ্রা রেড ছবি তোলার বিদ্যে বা আইডিয়া কজনের থাকে বলুন? যদি জালিয়াতিটা চোখ এড়িয়ে যায় স্থানীয় পুলিশের? তাই হত্যাকারীকে দৌড়তে হল কলকাতায়। আগাম টাকা দিয়ে ডেকে আনতে হল ইন্দ্রনাথ রুদ্রকে। ফলে, জালিয়াতি ঠিকই ধরা পড়ল। হত্যাকারীর পাচালো ফন্দিও পূর্ণ হল।
কিন্তু হত্যাকারী গোড়ায় ভুল করে ফেলেছিলেন ওই ছাতা সঙ্গে রেখে। বিলেত থেকে আনা ছাতা। আকাশে বৃষ্টির আভাস দেখলেই সঙ্গে রাখার অভ্যেস। তাই ছাতা নিয়ে গেলেন আমাকে দিয়ে তার প্যাঁচ ধরানোর বন্দোবস্ত করতে। পরিণাম কি হল জানেন? ভদ্রলোকের পুরো প্যাঁচটাই গোড়াতে আমি আঁচ করে ফেললাম। রগড় দেখতে এলাম ব্যাঙ্গালোরে।
ইন্সপেক্টর বিহ্বল কণ্ঠে বলল, স্যার, আমি কিসসু বুঝতে পারছি না।
কেউই পারে না। পারে না বলেই আমার নাম দেয় রবার্ট ব্লেক। যাকগে সেকথা। আপনাকে আর একটা পিলে চমকানো খবর শোনাই। ডক্টর জাম্বুলিঙ্গম বলে যাকে আপনারা মাথায় তুলে নাচছেন, যাকে সরকার মোটা টাকার বৃত্তি দিয়ে বসে আছে ব্লাড ক্যান্সার গবেষণার জন্যে, তিনি আসল জাম্বুলিঙ্গম নন।
আসল জাম্বুলিঙ্গম নন! ইন্সপেক্টর ক্ষীণ কণ্ঠে মিনমিন করল, মানে?
মানে নকল জাম্বুলিঙ্গম। আসল জাম্বুলিঙ্গম সমুদ্রের তলায় বা হাঙরের পেটে।
কী বলছেন, স্যার?
অনেকগুলো টেলেক্স মেসেজ থেকে খবরটা জেনেছি। যে জাহাজে আসল জাম্বুলিঙ্গম দেশে ফিরছিলেন, সে জাহাজে প্রায় তারই মতো চেহারার আর একজন সাউথ ইন্ডিয়ান ছিলেন। নাম তাঁর কৃষ্ণস্বামী। কৃষ্ণস্বামীকে সনাক্তকরণের বড় চিহ্ন হচ্ছে তাঁর হাত। ভদ্রলোক অসম্ভব ল্যাটা ছিলেন। বাঁ-হাতেই সব কাজ করতে অভ্যস্ত ছিলেন।
ডক্টর জাম্বুলিঙ্গম ভারতের মাটিতে কোনওদিনই পৌঁছোননি। মদ খেয়ে এক ঝড়ের রাতে ডেকে মাতলামো করার সময় নাকি ভদ্রলোক সমুদ্রে পড়ে যান। আর পাওয়া যায়নি। অবশ্য কেউ তাকে পড়ে যেতে দেখেননি। লোকমুখে শোনা গিয়েছিল, মদ খেয়ে টলতে টলতে তিনি পায়চারি করছিলেন ডেকের ওপর ঝড়-জলের রাতে।
জাম্বুলিঙ্গমের মালপত্র কেবিনেই ছিল–শুধু পাশপোর্ট আর ডিগ্রি সম্পর্কিত কাগজগুলো ছাড়া। ধরে নেওয়া হয়েছিল, ওগুলো পকেটে নিয়ে ঘুরতেন ভদ্রলোক। ফলে সবশুদ্ধ সলিলসমাধি হয়েছে।
কিন্তু তা হয়নি। কৃষ্ণস্বামীর চেহারার সঙ্গে বেশ কিছু মিল ছিল জাম্বুলিঙ্গমের। ফটো তুললে তা ধরাই যেত না। তাই সস্তায় কিস্তিমাতের প্ল্যান এঁটেছিল কৃষ্ণস্বামী। জাম্বুলিঙ্গমের দীর্ঘদিনের সাধনার সিদ্ধিকে মুঠোয় আনতে সহজতম ফন্দি। ব্লাড ক্যান্সারের দাওয়াইয়ের একমাত্র আবিষ্কারক হতে চেয়েছিল একাই। ধোঁকা-চিঠিতে মিথ্যে লেখা হয়েছিল। ও ওষুধে মাথা খারাপ হওয়ার ব্যাপারটা স্রেফ বানানো।
ঝড়জলের রাতে কৃষ্ণস্বামীই ঠেলে ফেলে দিয়েছিল জাম্বুলিঙ্গমকে। এটা আমার অনুমান। পরে মিলিয়ে নিতে পারেন। তারপর জাম্বুলিঙ্গমের নাম লেখা কাগজপত্র পাসপোর্ট হাতিয়ে নিয়ে দেশে ফিরেছিল।
তারপর থেকেই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দেখা গিয়েছে নকল ডক্টর জাম্বুলিঙ্গমকে। কথায় কথায় পাসপোর্ট খুলে ছবি দেখিয়েছে। চেহারায় ছবিতে কোনও অমিল নেই। সই নকল করতে একটু সময় লেগেছে অবশ্য। ডান হাতে সই করার প্র্যাকটিশ করতে হয়েছে। কারণ কৃষ্ণস্বামী ল্যাটা। জাম্বুলিঙ্গম নন।
বিশাল এই উপমহাদেশে জাম্বুলিঙ্গমের নাম লেখা কাগজপত্র আর পরিচয়নামা নিয়ে তাঁরই মতো কোনও জুয়াচোর ঘুরে বেড়ালে তাকে ধরার সাধ্য কারোর নেই–যদি না নিজে ধরা দেয়। অতি-চালাকেরই গলায় দড়ি পড়ে। তাই ধরা শেষ পর্যন্ত পড়তেই হল। যেচে শেয়ালকে ভাঙা বেড়া দেখিয়ে নিজেই মরল।
