শুনব, বলে চপের প্লেট এগিয়ে দিল কবিতা।
ইন্দ্রনাথ সঙ্গে সঙ্গে আরম্ভ করল, প্রভাবতী তো হাজতে গেল। সে কী কান্না মেয়েটার। কাঁদতে-কাঁদতে ফিট হয়ে যায় আর কি! তার বিরুদ্ধে অপরাধের ফিরিস্তি শুনে হাত-পা এমন ঠান্ডা হয়ে এল যে, শেষ পর্যন্ত ডাক্তার ডাকতে হল।
জাম্বুলিঙ্গম নিজেও কেমন জানি হয়ে গিয়েছিল। দিন-রাত ঘরে বসে থাকত। বাইরে বেরোত না। শক্ তো বটেই সাংঘাতিক শক্। ট্রিপ শ৷ বন্ধুর অপঘাত মৃত্যু। রাতারাতি কুবের হওয়া এবং প্রভাবতীর মুখোশ খুলে যাওয়া। কাজেই তিন ধাক্কা সামলাতে ও যখন কাহিল, আমি তখন কয়েকটা খোঁজ-খবর নিতে লাগলাম বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে।
কী খবর নিলাম, কোন অফিসে গেলাম, কার সঙ্গে দেখা করলাম–এসব শুনতে চাও কি? ইচ্ছে নেই। বেশ বাদ দিলাম। পুরো দুটো দিন টো-টো করে ফের গেলাম পুলিশ অফিসে।
সেই ফাজিল ইন্সপেক্টর এবার আমাকে সমীহ করে স্যার বলল। জিজ্ঞেস করল, কিছু জিজ্ঞাস্য আছে কিনা।
আমি বললাম, ফোরেনসিক রিপোর্ট এসেছে?
কীসের?
স্ট্যাবিংয়ের।
এসেছে। ছোরা যে মেরেছে, সে ল্যাটা। মানে, বাম হাতে ছোরা মারতে পোক্ত। রিপোর্টের মোদ্দা কথা হল এই। আর কিছু?
না। আমিও এইটুকুই শুনতে এসেছিলাম। আর একটা কথা বলতে এসেছিলাম। বলুন।
প্রভাবতীকে ছেড়ে দিন।
কেন?
ও নির্দোষ।
সে কী স্যার! ডক্টর মালুমঙ্গলমের ভাওতা চিঠি ও ছাড়া কে টাইপ করবে?
ও করেনি। অন্য কেউ করেছে ওর টাইপরাইটারে ওর ঘাড়ে দোষ চাপানোর জন্যে।
ঢোক গিলল ইন্সপেক্টর কিন্তু উইলটা? উইলে তো প্রভাবতীই নিজের নাম লিখেছে আগের নাম মুছে।
সেটাও অন্য লোকের কারসাজি। দোষ চাপাতে চায় প্রভাবতীর কাঁধে।
তাও কি হয় স্যার। নিজের নাম নিজে ছাড়া কেউ জাল করে অন্যের উইলে?
করে বইকি।
প্রভাবতীর নাম উইলে বসিয়ে কারও লাভ আছে?
আছে বইকি।
কী বলছেন স্যার! আমার মাথা বোঁ-বোঁ করে ঘুরছে।
ঘুরবে বইকি। বলে একখানা মার্কামারা হাসি হাসলাম। যে হাসি যুগ যুগ ধরে স্টুপি, পয়রো, হোমসরা হেসে এসেছে রহস্যের নাটকীয় পরিসমাপ্তির ঠিক আগের মুহূর্তে হাসলাম সেই হাসি। দেখেই তো ইন্সপেক্টর সাহেবের চক্ষু চড়কগাছ হল।
আমি বললাম, দরজাটা বন্ধ করে বসুন। সিগারেট খান? খান না। তাহলে আমি পাইপ ধরাই। একটু সময় লাগবে। কেননা, আশ্চর্য একটা কাহিনি আপনাকে শোনাব। শুনিয়ে আমি বিদায় নেব ব্যাঙ্গালোর থেকে। বাকি কাজ আপনার। আমি শুধু খেই ধরিয়ে দিয়ে যাব। শেষ করার পালা আপনার। নামও হোক আপনার।
বলে পাউচ বার করলাম। একডালা টোব্যাকো নিয়ে ঠাসলাম বার্মিংহামের নতুন পাইপটায়। আর, আগাগোড়া হাঁ করে বসে রইল ইন্সপেক্টর।
বেশ কয়েকটা রাম-টান দেওয়ার পর বললাম, এ মামলার শুরু কলকাতায়–আমার এক লেখক বন্ধুর আড্ডাঘরে। ডিটেকটিভ জাতটা পেট থেকে পড়েই যে ডিটেকটিভ হয় না–এটাই মাথায় ঢোকাচ্ছিলাম বন্ধুবরের। এজন্যে পড়তে হয়, চোখ-মন-কানকে তৈরি করতে হয়। নইলে অনেক সূত্রই সামনে থেকেও কলা দেখায়। যেমন সিগারেট। সিগারেট যারা খায়, তারা কীভাবে আঙুলের ফাঁকে সিগারেট ধরে, কীভাবে ঠোঁটের গোড়ায় ঝোলায়, কীভাবে ধোঁয়া ছাড়ে, বা রিং ছাড়ে–এই দেখেই মানুষটার চরিত্র সম্বন্ধে অনেক কথা বলা যায়।
এমনি ধরনের অনেক জ্ঞান দিচ্ছি বন্ধুকে–না দিলে পাঠকসাধারণ ভালো জিনিস পাবে কেন লেখকের কাছ থেকে–এমনি সময়ে আড্ডাঘরে ঢুকলেন আমাদের ডক্টর জাম্বুলিঙ্গম।
জাম্বুলিঙ্গমের ব্যক্তিত্ব আমাদের মুগ্ধ করল। তার বাচনভঙ্গি আমাদের মন কেড়ে নিল। তার বাংলা ভাষায় ব্যুৎপত্তি দেখে নিমেষে তাকে আপন করে নিলাম।
জাম্বুলিঙ্গম কলকাতা গিয়েছিলেন মালুমঙ্গলমের খোঁজে। না পেয়ে আমাকে পাকড়াও করলেন। আমার হাতে গোপন তদন্তের ভার দিতে চাইলেন।
জাম্বুলিঙ্গমের হাতে একটা বাহারি ছাতা ছিল এমন সুন্দর ছড়ি প্যাটার্নের ছাতা সচরাচর দেখা যায় না। ছাতাটা উনি নামিয়ে রেখেছিলেন মাঝখানের উঁচু টেবিলের ওপর। ফেরুলটা ফেরানো ছিল আমার দিকে। তাই বৈশিষ্ট্যটা নজরে এসেছিল।
অন্য কারো নজরে আসেনি। অমন যে ডাকসাইটে লেখক বন্ধু, যার গোয়েন্দা গল্প পড়ে পাঠকরা নাকি লেখককেই গোয়েন্দা বলে ধরে নেন, সেই লেখক বন্ধুরও নজরে আসেনি ছাতার তলার ফেরুলের অদ্ভুত বেয়াড়াপনা।
ফেরুল প্রসঙ্গে পরে আসছি। জাম্বুলিঙ্গমের কথার ফাঁকে ফাঁকে ফেরুটা দেখে নানা রকম কৌতূহল মনের মধ্যে উঁকি ঝুঁকি মারতে শুরু করল। তাই নির্লজ্জ ভাবেই অ্যাডভান্স চাইলাম পারিশ্রমিক বাবদ। উনি সঙ্গে সঙ্গে চেকবই বার করলেন। আমার সামনেই চেক লিখে দিলেন। আমার যা জানবার, সঙ্গে সঙ্গে জানা হয়ে গেল।
সব জেনেই ব্যাঙ্গালোরে এলাম। সব জেনেও ন্যাকা সেজে তদন্ত করলাম। প্রভাবতীকে নির্দোষ জেনেও তাকে ধরিয়ে দিলাম। কারণ, হাতে সময় নেওয়া। যাতে আমার গোপন তদন্তের অত্যন্ত গোপন অংশটুকু খুবই গোপনে নিজেই খুঁজে বার করতে পারি।
এই দু-দিনে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সব জানলাম। কোন্ মন্ত্রগুপ্তির বলে এত কাণ্ড জানলাম, তা বলতে গেলে সাতকাণ্ড রামায়ণ শোনাতে হয়। সংক্ষেপে শুনে রাখুন। মালুমঙ্গলমকে খুন করেছেন এমন একজন ব্যক্তি, যাঁকে উনি সবচাইতে বিশ্বাস করেছিলেন। ধরতে পারলেন না? ডক্টর জাম্বুলিঙ্গম।
