কার নাম ছিল উইলে? কল্পনাতীত সেই নাম দেখে জাম্বুলিঙ্গমের মতো কাঠখোট্টা মানুষও শিস দিয়ে উঠেছিল কেন?
কে জানত, চিরকুমার মালুমঙ্গলমের মনেও রং ধরেছে। প্রেমের ফুল ফুটেছে। দিবানিশি যিনি রুগি আর ল্যাবরেটরি নিয়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলেছিলেন, কোনওদিন স্বপ্নেও ভাবা যায়নি অন্তরের অন্দরে তিনি একটি নারীকে পূজা করে এসেছেন। জাম্বুলিঙ্গম তাই বিস্ময়ে বোবা হয়ে গিয়েছিল। কথা বলতে পারেনি অনেকক্ষণ।
ইন্দ্রনাথও কম অবাক হয়নি। শুকনো কাঠের মতো মন যাঁদের, শোনা যায় সেই কঠোর ব্রহ্মচারীরাই শেষ পর্যন্ত উর্বশী-রম্ভার মতো নর্তকীদের হাতে ঘায়েল হন। এক্ষেত্রেও হয়েছে তাই। মালুমঙ্গলম মনে মনে যাকে ভালোবেসেছিলেন, মনের দিক দিয়ে তার সঙ্গে তাঁর কোনও মিল থাকতে পারে না।
মেয়েটির নাম প্রভাবতী। ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্ট ও সেক্রেটারি।
.
ইন্দ্রনাথ বলল, খটকা লেগেছে আমার মনে।
জাম্বুলিঙ্গম বলল, কেন?
ডক্টর মালুমঙ্গলমের ধোঁকা-চিঠি টাইপ করা হয়েছে প্রভাবতীর টাইপরাইটারে। এখন দেখা যাচ্ছে, উইলেও নাম রয়েছে প্রভাবতীর। তার মানে কী?
প্রভাবতী সরিয়েছে মালুকে?
এত সহজে তা বিশ্বাস করা যায় না। কিন্তু অমন একটা সন্দেহ মনের মধ্যে ঘুরঘুর করে বইকি। তাই ভাবছিলাম, ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে উইল পরখ করতে করতে ইন্দ্রনাথ বলল, ইনফ্রারেড ছবি তুলব।
ইনফ্রা-রেড ছবি কার?
কারও নয়। এই উইলের।
কেন? কেন ইন্দ্রনাথবাবু?
উইলে জালিয়াতি আছে কিনা দেখা দরকার। মেয়ে জাতটাকে আমি মশাই একদম বিশ্বাস করি না। যাদের গোঁফ নেই, তাদের বিশ্বাস করলেই ঠকতে হয়। তাই ইনফ্রারেড ছবি তুলব! ব্যবস্থা করবেন?
আলবৎ।
উঠল ইনফ্রারেড ফটোগ্রাফ। পাওয়া গেল আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য।
উইলের যেখানে-যেখানে প্রভাবতীর নাম লেখা, সেখানে-সেখানে আসলে লেখা ছিল অন্য একটি নাম। সযত্নে সে নাম উঠিয়ে লেখা হয়েছে প্রভাবতীর নাম।
ডক্টর মালুমঙ্গলমের ইচ্ছা ছিল তার অবর্তমানে তার বিপুল ভূসম্পত্তির ওয়ারিশ হোক ডক্টর জাম্বুলিঙ্গম। সম্পত্তির আয় থেকে যেন ক্যান্সার নিয়ে গবেষণা চালানো হয় ব্যাঙ্গালোর ক্যান্সার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায়। বিশেষ এই লাইনটি ছিল উইলের শেষের দিকে। পুরো লাইনটি কেমিক্যাল দিয়ে মোছা হয়েছে। কিন্তু যেখানে-যেখানে ছিল জাম্বুলিঙ্গমের নাম, সেখানে সেখানে বসানো হয়েছে প্রভাবতীর নাম।
থ হয়ে গেল ডক্টর জাম্বুলিঙ্গম।
.
পুলিশ এল। প্রথমেই গ্রেপ্তার হল প্রভাবতী। তারপর মালুমঙ্গলমের বাড়ি তোলপাড় করা হল। শেষকালে একতলায় যে ঘরে কাঠ আর কয়লা গাদা করা থাকে, সেইখানে গিয়ে দেখা গেল, মেঝের ওপর বেশ কিছু সিমেন্ট বালি মাখা হয়েছে। শুকিয়ে পাথর হয়ে গেলেও দাগটা টাটকা।
কিন্তু গোটা বাড়িতে মেরামতির চিহ্ন কোথাও পাওয়া গেল না। সিমেন্ট-বালি লাগতে পারে, এমন কোনও কাজ বাড়িতে হয়নি।
।বিস্তর নাজেহাল হবার পর ইন্দ্রনাথ ধরিয়ে দিল রহস্যের চাবিকাঠি। বলল, কয়লার গাদা সরানো হোক।
ইন্সপেক্টর বললেন, কেন?
ইন্দ্রনাথ বলল, শার্লক হোমস এক জায়গায় বলেছে, সবকটা সম্ভব জায়গা খুঁজেও যদি হারানো জিনিস পাওয়া না যায়, তাহলে সব চাইতে অসম্ভব জায়গায় সেটা আছে। সুতরাং সরান না কয়লা আর কাঠের গাদা।
ইন্সপেক্টর বেশ জোরেই ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন। কিন্তু শেষমুহূর্তে সুবুদ্ধির উদয় হল। হল বলেই সমস্যার সুরাহা হল। নইলে মালুমঙ্গলমের লাশ আর পাওয়া যেত না।
কয়লার গাদা বেলচা দিয়ে পরিষ্কার করার পর দেখা গেল, সদ্য গাঁথা একটা ইটের কফিন। এক ফুট উঁচু। দেওয়াল থেকে এক ফুট ঠেলে এগিয়ে এসেছে। কয়লা ঢেকে ঢাকা হয়েছে এই কফিনকেই।
কফিন! হ্যাঁ, কফিন! শাবল মেরে ইট খসিয়ে ভেতরে পাওয়া গিয়েছিল মালুমঙ্গলমের বিকৃত মৃতদেহ।
সেই সঙ্গে একটা ছোরা। বুকের বাঁদিকে আমূল গেঁথেছিল ছোরাটা।
.
লোমহর্ষক কাহিনিটা শুনেছিলাম আমারই আড্ডাঘরে বসে কলকাতায়। তেলমুড়ি চিবোতে চিবোতে যথারীতি নিজের জয়ঢাক পিটছিল ইন্দ্রনাথ। আমি আর গৃহিণী বলতে গেলে কানখাড়া করেই শুনছিলাম।
ডক্টর মালুমঙ্গলমের লাশ আবিষ্কারের নাটক শোনার পর আরও দুটো আলুর চপ চেয়েছিল ইন্দ্রনাথ। তাইতেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল কবিতা। খ্যাক করে বললে, একটাও দেব না।
কেন বউদি? আমার অপরাধ? ইন্দ্রনাথ যেন কতই আহত।
তুফান মেলের মতো গল্প বলা হচ্ছে কেন? ঘোড়ায় জিন দিয়ে আসা হয়েছে নাকি?
এই কথা। আশ্বস্ত হল ইন্দ্রনাথ। আসল রহস্যে এখনও আসিনি বলেই তো বাঁই বাঁই করে বলছিলাম।
আসল রহস্যে এখনো আসোনি মানে? মালুমঙ্গলমের লাশটা কি তাহলে নকল বলতে চাও?
আহা লাশ নকল হবে কেন? লাশ কি নকল হয়? লাশ আসল–বিলকুল আসল। কিন্তু এ কাহিনির মোদ্দা পাঁচটুকুই তো শুরু করিনি এখনও।
থামাও নাটক। হেয়ালী করবার আর জায়গা পাওনি? প্রভাবতীকে গ্রেপ্তার করালে, লাশ বার করে ফেললে, জাল উইলের জালিয়াতি ধরে ফেললে–এরপর কি জট থাকতে পারে বুঝি না। কবিতা যেন সাক্ষাৎ দেবী চৌধুরাণী।
আছে বউদি, আছে। দেখবার চোখ থাকলেই দেখা যায়। আলুর চপের প্লেটটা এদিকে না আসা পর্যন্ত সে জিনিস বলা হবে না। ফলে আধখানা গল্প শুনে আধ-কপালে হয়ে থাকতে হবে। শুনলে অবশ্য চোখ কপালে উঠবে। না শুনলে আধ-কপালে হবে। বলো, কী করবে?
