হাজার। নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল ইন্দ্রনাথ।
সঙ্গে সঙ্গে চেক লিখতে শুরু করল জাম্বুলিঙ্গম।
চুপ করে বসে থাকা বোধহয় কোষ্ঠীতে লেখেনি ইন্দ্রনাথের। নইলে, হাত অত নিশপিশ করবে কেন? হাঁটুর ওপর সেকেন্ড কয়েক আঙুল বাজিয়ে টেবিলের ওপর থেকে টেনে নিল জাম্বুলিঙ্গমের ছাতাটা। মোষের শিংয়ের ছড়ি প্যাটার্নের বাঁট থেকে শুরু করে চোখ বুলানো হল লোহার ফেরুল পর্যন্ত। ইতিমধ্যে চেক লেখা শেষ করে চেকখানা এগিয়ে ধরল জাম্বুলিঙ্গম। ইন্দ্রনাথও ডান হাতে ছাতা বাড়িয়ে দিয়ে বাঁ-হাতে নিল চেকটা।
বলল, ভারি সুন্দর ছাতা তো! দেখে মনে হয় যেন ছড়ি।
ছাতা নিয়ে উঠে দাঁড়াল জাম্বুলিঙ্গম। ছড়ির কায়দায় একপাক ঘুরিয়ে নিল ছাতা। বলল ছোট করে, বিলতে যখন মেঘ করত, তখনি এ-ছাতা থাকত সঙ্গে। আজও থাকে সঙ্গে।
কে জানত, তখন যে এই ছাতা নিয়েই ভেল্কি দেখাবে ইন্দ্রনাথ রুদ্র এবং খোঁতা মুখ ভেঁতা করবে আমার?
.
মেঘলোক দিয়ে সেইদিনই দুজনে এল ব্যাঙ্গালোরে। এয়ারপোর্টে থেকে সিধে গান্ধীনগরের ল্যাবরেটরিতে গেল ইন্দ্রনাথ। প্রথমেই হুমড়ি খেয়ে পড়ল টাইপরাইটারের ওপর। একটা সাদা কাগজ ঢুকিয়ে খটাখট করে নিজে কিছুক্ষণ টাইপ করল। তারপর ডাক পড়ল প্রভাবতীর।
প্রভাবতী দক্ষিণী ললনা হলেও রীতিমতো চটকদার। বিজ্ঞানের সাধনা করতে এসেও রূপের সাধনায় গাফিলতি নেই বিন্দুমাত্র। চোখে কটাক্ষ এবং অধরে লালসা কীভাবে জাগ্রত করতে হয়, সে কৌশল তার করায়ত্ত।
এ হেন অ্যাসিস্ট্যান্ট দেখে ভুরু কুঁচকে ছিল ইন্দ্রনাথ। এ মেয়েকে ক্যাবারে ড্যান্সে মানায়, ল্যাবরেটরিতে মানায় না।
কিন্তু কি আশ্চর্য, প্রভাবতীকে নিয়ে বিশদ জেরার ধার দিয়েও যায়নি ইন্দ্রনাথ। শুধু চেয়েছে, রিপোর্টের ফাইলটা। রোজকার গবেষণার প্রতিবেদন টাইপ হত প্রতিদিন। ফাইল নিয়ে নিতম্ব দুলিয়ে ভারী বুকে হিল্লোল তুলে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে প্রভাবতী। টানা টানা চোখে একবার মাত্র যৌবন বিজ্ঞাপিত তন্বীদেহ দেখে নিয়ে ফাইল খুলে বসেছে ইন্দ্রনাথ।
প্রথমেই দেখেছে ৯ জুলাইয়ের রিপোর্ট। তারপর ৮ জুলাইয়ের। তারপর ৭ জুলাইয়ের। তারপর ৬ জুলাইয়ের।
জাম্বুলিঙ্গম সামনেই দাঁড়িয়েছিল। বাংলায় বলেছে ইন্দ্রনাথ, ভদ্রমহিলাকে এখন যেতে বলুন। কথা আছে।
জাম্বুলিঙ্গম অমিল ভাষায় তৎক্ষণাৎ বিদায় দিয়েছে প্রভাবতীতে। হেলতে দুলতে নিতম্বিনী অন্তর্হিত হতেই শুনিয়েছে উদগ্র কণ্ঠে, কিছু পেলেন?
পেয়েছি। এ চিঠি ডক্টর মালুমঙ্গলম টাইপ করেননি। দু-নম্বর, ১১ জুলাই সকালে এ চিঠি টাইপ করা হয়নি। হয়েছে ৬ জুলাই, কি তারও আগে।
পুরু লেন্সের আড়ালে জাম্বুলিঙ্গমের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়েই ছোট হয়ে এল, কী করে জানলেন?
৬ জুলাই পর্যন্ত পুরোনো রিবনে টাইপ হয়েছে। ৭ জুলাই নতুন রিবন মেশিনে বসেছে। মালুমঙ্গলমের চিঠি পুরোনো রিবনে টাইপ করা। তার মানে, উনি এ চিঠি এগারোই জুলাই ঝোঁকের মাথায় টাইপ করেননি। আর কেউ ৬ জুলাই কি তারও আগে টাইপ করে রেখেছিল।
উদ্দেশ্য?
তাকে সরানো। ডক্টর, আমার ভীষণ সন্দেহ হচ্ছে। উনি এখন কোথায়, স্বর্গে না মর্তে?
আপনিই বলুন। মালুমঙ্গলম থাকতেন কোথায়?
এই গান্ধীনগরেই। ব্যাচেলর তো। গোটা বাড়িতে একা থাকতেন। যাবেন?
চলুন।
.
চাবি কী করে সংগ্রহ হল এবং কতক্ষণ ধরে বাড়ি তল্লাসী হল, তার বিবরণ দিয়ে অযথা গল্পকে লম্বা করতে চাই না। তল্লাসীর শেষে কি পাওয়া গেল–শুধু সেইটুকু জানলেই পাঠক-পাঠিকার কৌতূহল জাগ্রত হবে।
একটা উইল। ডক্টর মালুমঙ্গলমের বিষয়সম্পত্তির বিলিব্যবস্থার নির্দেশ। ভদ্রলোক ব্যাচেলর ছিলেন বটে কিন্তু দরিদ্র ছিলেন না। বিবিধ কোম্পানির শেয়ার কেনাই ছিল দু-লক্ষ টাকার। এ ছাড়াও ব্যাঙ্কে নগদ টাকা আছে আড়াই লাখ। ম্যাঙ্গালোর আর ত্রিবান্দ্রামে ভূসম্পত্তির আর্থিক মূল্য কম করেও পঞ্চাশ হাজার টাকা।
এত টাকার বিষয়সম্পত্তি হেলায় ফেলে অদৃশ্য হয়েছেন ডাক্তার। সব চাইতে আশ্চর্য হল, যে-কোনও মানুষ অজ্ঞাতবাস করার আগে টাকাকড়ি সঙ্গে নেয়। বনবাসে গেলে অথবা আশ্রমবাসী হলে অবশ্য পয়সাকড়ির দরকার হয় না। কিন্তু যাচ্ছেন হিমালয় অভিযানে বিশল্যকরণীর সমতুল্য দুষ্পপ্য গাছগাছড়ার সন্ধানে। সেক্ষেত্রে টাকা ওড়ানো দরকার খোলামকুচির মতো।
অথচ, ভদ্রলোক বলতে গেলে এক কাপড়ে অভিযানে বেরিয়েছেন। না নিয়েছেন টাকা, নিয়েছেন সুটকেশ। ব্যাঙ্ক থেকেও টাকা তোলেননি।
অদ্ভুত কাণ্ড। তাই না? বুদ্ধিমান পাঠক-পাঠিকা নিশ্চয় আঁচ করে ফেলেছেন ব্যাপারটা।
হ্যাঁ, ইন্দ্রনাথেরও তাই মত। জাম্বুলিঙ্গমও দ্বিমত হতে পারল না। ডক্টর মালুমঙ্গলম স্বেচ্ছায় হিমালয় যাননি। তাঁর অনিচ্ছাতেই যেতে হয়েছে। হিমালয়ে নয়–যমালয়ে!
অর্থাৎ তিনি গায়েব হয়েছেন। হয়তো গুমখুনও হয়েছেন। নোবেল প্রাইজ লাভের স্বপ্ন দেখতে দেখতেই বোধ করি পরলোকের পথে রওনা হয়েছেন।
কিন্তু কাজটা কার? তার মৃত্যুতে লাভ কার? বিষয়-সম্পত্তির লোভে আকছার খুন হচ্ছে। ঠিকই। উইলে যার নাম রয়েছে, যাকে ডক্টর মালুমঙ্গলম তার সর্বস্ব দিয়ে গেছেন, তার অবর্তমানে, সে ব্যক্তিই হঠাৎ-ধনী হওয়ার দুর্জয় প্রলোভনে মানবহিতৈষী ডাক্তারকে যমালয়ের পথ দেখিয়েছে কি?
