জাম্বুলিঙ্গম তামিলনাড়ুর বাসিন্দা হয়েও যেরকম স্বচ্ছন্দ গতিতে পরিষ্কার উচ্চারণে খবর পড়ে শোনাল, তা অল ইন্ডিয়া রেডিয়োর বহু সংবাদদাতার পক্ষেও সম্ভব হয় না।
খবর পড়া শেষ হতেই এই প্রথম ইন্দ্রনাথ মুখ খুলল, মোদ্দা বিষয় দাঁড়াচ্ছে এই সিদ্ধ চিকিৎসা পদ্ধতির পুরোনো পুঁথিতে ব্লাড ক্যান্সারের দাওয়াই লেখা আছে। সেই পুঁথি এবং দাওয়াই এখন পাওয়া গেছে। পেয়েছেন একজন দক্ষিণ ভারতীয় ডাক্তার। এই তো?
হুবহু।
আপনিই কি সেই ডাক্তার?
না, আমার বন্ধু। মালুমঙ্গলম।
আপনার সমস্যা আপনাকে নিয়ে, না আপনার বন্ধুকে নিয়ে?
আমাদের দুজনকে নিয়ে।
যথা?
খবরে যা বলা হয়েছে, তা আংশিক। সিদ্ধ চিকিৎসা-পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা মালুমঙ্গলম একা করেনি। আমিও ছিলাম সঙ্গে। বছর তিনেক আগে দেশে ফিরেছি আমি। মালুমঙ্গলমের সঙ্গে যোগাযোগ তখন থেকেই। রুগি দেখার ফাঁকে ফাঁকে গাছগাছড়া নিয়ে নাড়াচাড়া করার বাতিক ওর অনেকদিনের। ওর বিশ্বাস, বিধাতা মানুষ সৃষ্টি করেছেন, মানুষের রোগের ওষুধও সৃষ্টি করেছেন। এই পৃথিবীতেই তা আছে। প্রাচীন পুঁথি ঘেঁটে, উদ্যোগী হয়ে শুধু খুঁজে নিলেই হল।
দুরারোগ্য ব্লাড ক্যান্সারের দাওয়াই আবিষ্কারের গবেষণার শুরু তখন থেকেই। মালুমঙ্গলমের রিসার্চ ব্যাকগ্রাউন্ড নেই–আমার আছে। কিন্তু আমার প্রাচীন গাছগাছড়া সম্পর্কে কোনও জ্ঞান নেই– মালুমঙ্গলমের আছে। ফলে, জুটি বাঁধলাম দুজনে। আমার ডিগ্রির দৌলতে সরকারি বৃত্তিও জুটল। গবেষণাও অনেক এগোল। পরিশেষে ব্লাড ক্যান্সারের দাওয়াইয়ের সন্ধানও পেলাম।
সমস্যা শুরু ঠিক তার পরেই।
আমাদের গবেষণা কেন্দ্র কিন্তু কলকাতায় নয়–ব্যাঙ্গালোরে। গান্ধীনগরে মুনলাইট সিনেমার ঠিক পেছনে। ছোট্ট ল্যাবরেটরি। আমি, মালুমঙ্গলম আর প্রভাবতী। প্রভাবতী আমাদের ল্যাবরেটরি অ্যাসিস্ট্যান্টও বটে, সেক্রেটারিও বটে। রিপোর্ট টাইপ করা থেকে শুরু করে কেমিক্যাল সংগ্রহ করা–সমস্তই প্রভাবতীর দায়িত্ব।
গত ১০ জুলাই রক্তের শয়তানকে ঢিট করার জবর দাওয়াইয়ের সন্ধান পেলাম আমি আর মালুমঙ্গলম। ১৯৩০ সালে স্যার চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমণ ভারতের মুখোজ্জ্বল করেছিলেন পদার্থবিদ্যায় নোবেল প্রাইজ এনে। ১০ জুলাই সন্ধের দিকে আমি আনন্দে আটখানা হয়ে বলেছিলাম মালুমঙ্গলমকে–ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল প্রাইজ আনব তুমি আর আমি।
বিধাতা তখন আড়ালে দাঁড়িয়ে হেসেছিলেন। নইলে পরের দিন সকালবেলা উধাও হবে কেন মালুমঙ্গলম?
বলে কবিতার হাত থেকে কফির পেয়ালা টেনে নিল জাম্বুলিঙ্গম।
ইন্দ্রনাথ চোখ ছোট করে শুনছিল। এবার বলল, উধাও হলেন?
হ্যাঁ। চুমুক না দিয়েই বলল জাম্বুলিঙ্গম, পরের দিন সকালবেলা ল্যাবরেটরিতে এসে দেখলাম, প্রভাবতীর টাইপরাইটারে একটা সাদা কাগজ। তাতে লেখা–জাম্বুলিঙ্গম, কাল রাতে রিপোর্ট ঘাঁটতে গিয়ে মাথা ঘুরে গেল। সিদ্ধ চিকিৎসা-পদ্ধতিতে এক জায়গায় মারাত্মক কথা লিখেছে। এ ওষুধ ব্লাড-ক্যান্সার সারায় বটে, কিন্তু বছর দুয়েকের মধ্যে মাথার গণ্ডগোল দেখা দিতে পারে। আমাদের গবেষণা ব্যর্থ হয়েছে। তোমার সময় এবং সরকারের টাকা অপচয়ের কারণ আমি। বিবেকের দংশন আর আত্মগ্লানি সইতে না পেরে চললাম। শুনেছি, হিমালয় অঞ্চলে ব্লাড ক্যান্সারের ওষুধ আছে। যদি পাই, ফিরব। নইলে, এই যাত্রাই শেষ যাত্রা। এ মুখ আর কেউ দেখবে না। ইতিমালুমঙ্গলম। এগারোই জুলাই।
ইন্দ্রনাথ বলল, চিঠিটা দেখছি কণ্ঠস্থ করে রেখেছেন?
তা করেছি। মূল চিঠিও সঙ্গে এনেছি। এই দেখুন।
হাত বাড়িয়ে ভাঁজ করা কাগজটা নিল ইন্দ্রনাথ। সেকেন্ড কয়েক চোখ বুলালো এ-কোণ থেকে সে-কোণ পর্যন্ত।
বলল, টাইপ না করে হাতে লিখলেও তো পারতেন আপনার বন্ধু। টাইপ করলেন কেন? করলেনই যদি তো তলায় সই না করে টাইপ করে নিজের নাম লিখলেন কেন? আমার সন্দেহ হচ্ছে।
ও সন্দেহ আমার মনেও এসেছে। বলল জাম্বুলিঙ্গম, এসেছে বলেই আপনার দ্বারস্থ হয়েছি।
কীসের সন্দেহ বলুন তো? ইন্দ্রনাথ কৌতূহলী হল।
চিঠিটা কি সত্যিই মালুর লেখা?
কারেক্ট। কাজেই প্রাথমিক তদন্ত টাইপরাইটার থেকেই শুরু করা দরকার। তার আগে একটা প্রশ্ন। আপনি পুলিশে না গিয়ে সোজা কলকাতায় এলেন কেন? তদন্ত গোপন রাখতে চাইছেন কেন?
গোপন রাখতে চাই সরকারি বৃত্তি এর সঙ্গে জড়িত বলে। পাবলিক কেলেঙ্কারী কে চায় বলুন? আপনি যদি তার হদিশ বার করে দেন, তাহলে তো গোল চুকেই গেল। নইলে শেষ পর্যন্ত পুলিশকেই ডাকতে হবে।
কলকাতায় এলেন শুধু আমার কাছে?
না, মালুর খোঁজে। হিমালয় যেতে গেল এই পথই সহজ পথ। কলকাতায় কদিন ওকে থাকতেই হবে। নিশ্চয় অভিযানের কেনাকাটা করবে, ব্যবস্থা করবে। যে কটা সাউথ ইন্ডিয়ান ডেরা
আছে, তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম। না পেয়ে আপনার খোঁজে এসেছি। ইন্দ্রনাথবাবু, আপনি পরের ফ্লাইটে ব্যাঙ্গালোর চলুন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, মালু ব্যাঙ্গালোরেই রয়েছে।
ইন্দ্রনাথ সব শুনে কান-কাটা বেহায়ার মতো জিগ্যেস করল, আপনি জানেন নিশ্চয় গোয়েন্দাগিরি আমার পেশা?
জাম্বুলিঙ্গমও কম স্মার্ট নয়। সপ্রতিভ কণ্ঠে জবাব দিল তৎক্ষণাৎ, তৈরি হয়েই এসেছি আমি। বলে, ভেতর পকেট থেকে বার করল একটা চেকবই আর কলম। কত লিখব বলুন?
