দেশকে সত্যিই ভালোবাসে এই ত্রিশূল। যতই দেখছে গজানন, ততই বিমোহিত হচ্ছে। কোনওকালে ভাবতেও পারেনি গুহা থেকে বেশ খানিকটা দূরে জঙ্গলের মধ্যে এ রকম একখানা আস্তানা বানিয়ে বসে আছে রামভেটকির ওপরওয়ালারা।
গাড়িখানা এলোকেশীই চালিয়ে নিয়ে এসেছে। জঙ্গলের মধ্যে বাঁই-বাঁই করে ঢুকে পড়েছে। দূর থেকে মনে হয় যেন একটা পায়ে চলা পথ কিছুদূর গিয়েই বনের মধ্যে হারিয়ে গেছে অথবা শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কিছুদূর ঢোকবার পর দেখা যায় মাটির রাস্তা পিচের রাস্তা হয়ে গেছে এবং এক-এক জায়গায় রাস্তা চার-পাঁচটা রাস্তা হয়ে জঙ্গলের মধ্যে ঢুকে গেছে। যে-কোনও নবাগত এই পয়েন্টে পৌঁছেই দুরুদুরু বুকে নিবিড় বনানীর রহস্যময়তা উপলব্ধি করেই পিছু হটে আসবে।
কিন্তু পথ যারা চেনে, তারা পেছোয় না। পিচমোড়া এই রাস্তার গোলকধাঁধা ইচ্ছে করেই সৃষ্টি হয়েছে কৌতূহলীদের দূরে ঠেকিয়ে রাখার জন্যে, দলের লোকেদের নির্বিঘ্নে নিয়ে আসার জন্যে।
এলোকেশীর গাড়িও তাই চরকিপাক দিতে দিতে এ রাস্তা সে রাস্তা হয়ে ঢুকে গেল গভীর থেকে গভীরতর জঙ্গলে। এক জায়গায় একটা পরিত্যক্ত এয়ারপোর্টও দেখতে পেল গজানন। যুদ্ধের আমলে নিশ্চয় বিমানবাহিনী বানিয়েছিল, এখন আর তার খোঁজ কেউ রাখে না। বিলিতি গাড়ি প্রায় নিঃশব্দে গিয়ার চেঞ্জ করতে করতে সেই এয়ারপোর্টের পাশ দিয়েই ঢুকল অন্য একটা রাস্তায়। রাস্তা হঠাৎ শেষ হয়েছে একটা ফাঁকা জায়গায়। যেন টেক অফ করার জন্যেই রাস্তার শেষ ওখানেই।
গাড়িটা কিন্তু টেক অফ করল না, টেক ডাউন করল। মানে, স্রেফ পাতালে ঢুকে গেল। রাস্তাটা যে আসলে ইস্পাতের ঢাকনি তা কে জানত। কবজার ওপর লম্বাটে কৌটোর ঢাকনি যেমন ওপর দিকে খুলে যায়, ঠিক সেইভাবে প্রায় পনেরো ফুট রাস্তা মেঝে উঠে গেল ওপর দিকে।
গাড়ি থেকে নেমে গেল ঢালু পাতাল-বিবরে। মাথার ওপরকার ঢাকনি নেমে এসে বন্ধ করে দিলে বিবর পথ।
আক্কেল গুড়ুম হয়ে গেল গজাননের। এ কাদের পাল্লায় পড়েছে সে? এরা যে আরব্য রজনীর মতো কাণ্ডকারখানা দেখিয়ে চলেছে ভারতের বুকে।
কাণ্ডর তখনও দেখেছে কী গজানন দ্য গ্রেট। দেখল এরপরেই।
.
গাড়ি থেকে নেমে গিয়ে দাঁড়াল একটা কুয়োর ওপরকার চাতালে এবং চাতালটা লিফটের মতো নেমে গেল কুয়োর মধ্যে। সাঁ-সাঁ করে বেশ খানিকটা নামবার পর রুদ্ধ হল নিম্নগতি।
আলো ঝলমলে একটা বিশাল হলঘরের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে গাড়ি। জানলার কাঁচের মধ্যে দিয়ে হলঘরের বিশালতা এবং বিচিত্র যন্ত্রপাতির বিপুল সমাবেশ দেখে গজানন দ্য গ্রেট চোখ দুটো প্রায় ছানাবড়ার মতো করে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ।
হলঘরের চারপাশে ছড়ানো ছিটোনো যন্ত্রপাতিগুলো চলছে আপনা হতেই। অনেকগুলো বিদঘুঁটে চেহারার রোবট চালাচ্ছে কলকবজা। নিজেরাও তো এক-একটা কল, কাউকে দেখতে বাচ্চাদের মোটরগাড়ির মতো–চাকার ওপর গড়গড়িয়ে যাচ্ছে।
এই রকমই একটা খুদে মোটরগাড়ি সাঁ করে ছুটে এল গজাননদের দিকে। চকিতে টান টান হয়ে গেল গ্রেট স্পাইয়ের আপাদমস্তক। কেননা, আগুয়ান যন্ত্রের মাথার ওপরে একটা ইস্পাতের নল ফেরানো রয়েছে তাদের দিকে। পেটের কাছে একটা টিভি স্ক্রিনের মতো পরদায় রংবেরঙের জ্যামিতিক নকশা আঁকা হয়ে যাচ্ছে অতি দ্রুত ছন্দে।
বগলের তলা থেকে লুগারটা টেনে বের করতে যাচ্ছে গজানন, বাধা দিল এলোকেশী। মুখে সেই অপ্সরা হাসি।
বললে স্টিরিও মিউজিক কণ্ঠে, গজাননবাবু, ঘাবড়াবেন না, রোবট সেন্ট্রিকে গুলি করবারও সময় পাবেন না।
তা বটে। এলোকেশী ওর হাতখানা বেশ মোলায়েম করে ধরে (এত মোলায়েম ভাবে যে সন্দেহ হতে লাগল যার ঠোঁটে তিল…) নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। পুঁচকে মোটরগাড়িটা তখন সামনেই দাঁড়িয়ে। মাথার ওপরকার ইস্পাতের নলচের সরু ফুটোটার দিকে সভয়ে তাকিয়ে গজানন।
এলোকেশী হেসে চণ্ডীপাঠ করে গেল। টিভি স্ক্রিনের বুকে লেখা হয়ে গেল–Ok Hop in.
মানে, সব ঠিক আছে। গাড়িতে লাফ দিয়ে উঠে পড়।
বলে কী খুদে গাড়ি। ওইটুকু গাড়িতে…
এলোকেশী ততক্ষণে উঠে গেছে গাড়িতে।
খেলনার গাড়ির সিটের মতো ছোট্ট সিটে বসে হাতছানি দিয়ে আর চোখ টিপে ডাকছে গজাননকে।
–আচ্ছা ঢলানি মেয়ে তো। রাগে ব্রহ্মতালু পর্যন্ত জ্বলে গেল গজাননের। গালের কাটা দাগটাও সুড়সুড় করে উঠল এই সময়ে। কিন্তু অতিকষ্টে সেখানে হাত বুলেল না গজানন। কেননা, ওর মারদাঙ্গা ফিচারের সুইচ ওই কাটা দাগটা। হাত বুলোলেই মাথার মধ্যে পটাং করে যেন তার ছিঁড়ে যায়, তারপর প্রলয় ঘটিয়ে ছাড়ে চক্ষের নিমেষে–নিজের অজান্তেই।
অতএব কাটা জায়গায় হাত বুলোনো সমীচীন হবে না। বিশেষ করে ইস্পাতের নলচেটা এখনও যে ফিরে রয়েছে তার দিকেই।
অগত্যা মুখটা পাচার মতো করে গাড়িতে উঠে এলোকেশীর গায়ে গা দিয়ে বসল গজানন। মুহূর্তের মধ্যে পুঁচকে মোটর ভীষণ বেগে ছুটে গেল হলঘর পেরিয়ে একটা করিডরের দিকে। এ করিডর সে করিডর ঘুরে দাঁড়াল একটা দরজার সামনে।
এলোকেশী নেমে পড়েছে। ডাকছে গজাননকে। হাতের ব্রিফকেস নিয়ে নামতে যাচ্ছে সে, এমন সময়ে একটা কলের হাত এসে খামচে ধরল ওর হাত হাতটা বেরিয়ে এল গাড়ির অজস্র কলকবজার মধ্যে থেকেই।
ফিউরিয়াস হয়ে গেছিল গজানন। সাঁড়াশির মতো আঁকড়ে ধরা হাতটাকে ছাড়াতেও পারছে না, ধস্তাধস্তিই সার।
