ঠেলে বেরিয়ে আসা দুই চোখ মেলে সেকেন্ড কয়েক চেয়ে রইল বিকট অস্ত্রের দিকে। পরক্ষণেই ম্প্রিংয়ের পুতুলের মতো লাফিয়ে উঠে ছুটে গেল খোলা জানলার দিকে এবং একলাফে জানলা দিয়ে বেরিয়ে গেল বাইরে।
বাইশ তলা শূন্যপথ অতিক্রান্ত হতে গেলে যেটুকু সময়। তারপর বাইশ তলা নিচ থেকে ভেসে এল আছড়ে পড়ার শব্দ।
ফ্যালফ্যাল করে হাতের অস্ত্রটার দিকে চেয়ে রইল গজানন।
গজাননের চমক ভাঙল দরজায় টোকা পড়ায়। খট খটখট খট খট খট…খট!
ত্রিশূল দলের সঙ্কেত! কে এল?
বিকট অস্ত্র হাতে নিয়েই দরজার সামনে ছুটে গেল গজানন। ম্যাজিক হোলে চোখ রেখে দেখল…
বাইরে দাঁড়িয়ে এলোকেশী।
এলোকেশী। এ সময়ে? এখানে?
ঝটাং করে পাল্লা খুলতেই এলোকেশী আঁতকে উঠে বললে, গজাননবাবু, ডোন্ট বি সিলি। বলেই বোঁ করে পেছন ফিরে বললে, জামাকাপড় পরে নিন।
তাই তো! গজাননের খেয়ালই নেই বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসার পর থেকে গায়ে সুতোটি চাপাবার সময় পায়নি। দুই সারি গজদন্তের ফাঁকে বিরাট জিভটা ঠেলে দিয়ে সাঁৎ করে ঢুকে গেল কলতলায় এবং এক মিনিটের মধ্যেই বেরিয়ে এল পাজামায় পা গলিয়ে।
এসেই সে কী তড়পানি, আপনি কোত্থেকে এলেন?
এলোকেশী তখন একটা সোফায় বসে বুকের উপত্যকায় ঝোলানো একটা নেকেড মেয়ের লীলায়িত পোজের লকেটের দিকে নির্নিমেষে চেয়ে রয়েছে। গজাননের প্রশ্নটা শুনে আড়চোখে এমনভাবে তাকাল প্রশ্নকর্তার দিকে যে, সেই ব্যক্তির পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ থেকে মাথার চুলের ডগা পর্যন্ত শিরশির করে উঠল অনাস্বাদিত পূর্ব উত্তেজনায়। এ সেই চাহনি যার সামনে মুনিঋষিরা টলে যান, দেব সাধন ভুলে বাৎস্যায়ন শাস্ত্রচর্চায় মত্ত হন।
গজাননের ফুলোফুলো পাথরের মতো পেশিগুলো অনাবৃত অবস্থায় দেখেই যে এলোকেশী এলিয়ে পড়েছে, তা হাড়ে-হাড়ে বুঝল জিরো জিরো।
বাট ডিউটি ইজ ডিউটি–মেয়েরাই সব সাধনার পতন ঘটায়, শাস্ত্র-টাস্ত্র না পড়লেও গজানন তা জানে। তাই গলাটাকে যদূর সম্ভব কর্কশ করে (করা কি যায়!) বললে, এখানে কেন এসেছেন?
কাম-টু-দ্য-বেড় চোখ তুলে তাকাল এলোকেশী। যার সাদা বাংলা হল, এসো, শোবে এসো। কিন্তু ছুঁড়িদের সঙ্গে শোওয়া গজাননের পোষায় না। ওইরকম চাহনি দেখলেই গা পিত্তি জ্বলে যায়। একটু আগে আচমকা চাহনির ঝলকে গা শিরশির করার জন্যে (হাজার হোক পুরুষ মানুষ তো) রাগও হয়ে গেল নিজের ওপর। গজদন্ত খিঁচিয়ে আর একবার যেই দাবড়ানি দিতে যাচ্ছে, এলোকেশী বললে, আমি এসেছি আপনাকে গার্ড দিতে।
এমন নেচে উঠল গজানন (অভিনব পিস্তল হাতেই রয়েছে), পাজামার দড়ি ঢিলে হয়ে গেল। এবং পাজামা নেমে এল ইঞ্চি তিনেক নিচে। খপ করে দড়ি ধরে পাজামা তুলে বললে যথাসম্ভব বজ্রগর্ভ স্বরে, একমাত্র ভগবান শালা ছাড়া আমাকে গার্ড দেওয়ার কেউ নেই।
অহো! অহহ! কী ডুমাডুমো পেশি বুকের! মিঃ ইউনিভার্স হলে পারত গজানন। মুগ্ধ (এবং বিলোল) চোখে চেয়ে এলোকেশী বললে, নিচের তলায় এখুনি একটা লাশ পড়ল আপনার জানলা থেকে।
তিড়বিড়িয়ে ওঠে গজানন, জানলা থেকে জ্যান্তই বেরিয়ে গেছিল–নিচে গিয়ে লাশ হয়েছে।
আপনি ফেলে দিয়েছেন?
আজ্ঞে না, অজান্তেই দাঁত কিড়মিড় করে ফেলে গজানন, ধরতে পারলে মুন্ডুটা ছিঁড়ে নিতাম।
ও, ঠোঁটের ওপর ছোট্ট তিলটা চুলকে নিল এলোকেশী। অমনি গজাননের মনে পড়ে গেল পিসির কথা–ওরে গজানন, ঠোঁটে তিলওয়ালা মেয়ে দেখলেই জানবি পরপুরুষে আসক্তি আছে। ঠিকই বলেছে তো পিসি। এলোকেশীর রকমসকমও ভালো ঠেকছে না। এমনভাবে চাইছে যেন গজানন একটা মুচমুচে নানখাতাই বিস্কুট, পেলেই চিবিয়ে খাবে।
কাজেই শক্ত চোখে চাইতে হল গজাননকে, রাস্কেলটা এসেছিল এই দিয়ে আমার মুন্ডু উড়োতে, দেখাল হাতের বিদঘুঁটে অস্ত্রটা।
জীবনে দেখিনি বাপু এমনি রিভলভার। নিন, ব্যাগের মধ্যে রাখুন, বলে নিজের ভ্যানিটি ব্যাগ খুলে ধরল এলোকেশী।
গজানন কিন্তু দেখেছে বিটকেল হাতিয়ার মাঝে-মাঝে বিচ্ছিরিভাবে ফুলে ওঠে, লাল হয়, বিস্ফোরণ সৃষ্টি করে। কাজেই টেবিলের ওপর থেকে নিজের বুলেটপ্রুফ ব্রিফকেসটা টেনে নিতে নিতে বললে, এর মধ্যেই থাক।
ব্রিফকেস আর হাতছাড়া করেনি গজানন। রামভেটকি বলেছিল আজব হাতিয়ার একখানা আনতেই হবে। এই সেই হাতিয়ার।
হোটেলের ঘর থেকে বেরোনোর আগে, দরজার ফ্রেমের পাশ থেকে মাইক্রো ক্যামেরা খুলে নিয়ে রেখেছিল ডটপেনের মধ্যে।
এলোকেশী তখন নেমে গেছে। দেখতে পায়নি খুদে ক্যামেরার গোপন অবস্থান। পায়নি বলেই রক্ষে। নইলে…
.
কানহেরী কেভস বোম্বাই শহর থেকে বেশ দূরে। পর্বতগুহা দেখতে বিস্তর টুরিস্ট যায় ইলেকট্রিক ট্রেনে, ফরেন টুরিস্টরা যায় গাড়িতে। ঝকঝকে গাড়ি ধূলি ধূসরিত হয়ে যায় গুহা অঞ্চলে একবার টহল দিয়ে।
কিন্তু সে ধুলো বাইরে, মানে, এই আস্তানার বাইরে। এলোকেশী বিলিতি গাড়িতে চাপিয়ে গজাননকে ঝড়ের বেগে কানহেরী কেভস অঞ্চলের এই গোপন আস্তানায় এনে ফেলার পর বেলেঘাট্টাই মস্তান বেচারার চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গেছে একটার পর একটা কাণ্ডকারখানা দেখে।
জবরদস্ত পার্টি বটে এই ত্রিশূল। সংগঠন কাকে বলে দেখিয়ে দিয়েছে, সারা ভারতটাকে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ফেলেছে বিবরঘাঁটি আর গুপ্তচর দিয়ে। উদ্দেশ্য একটাই, ভারতের স্বার্থরক্ষা। সরকারি ব্যবস্থায় যে সর্ষের মধ্যে ভূত, তা বুঝে গেছে।
