তা জাম্বুলিঙ্গম নামধারী দৈত্যাকার পুরুষটি ভল্লুকরাজ আখ্যার উপযুক্ত ব্যক্তিই বটে। মিশমিশে রং। দরজায় মাথা-ঠেকে যাওয়া তালঢ্যাঙা বপু। ছাইরঙের টেরিন সুট। হাতে ছড়ির মতো লিকলিকে একটা ছাতা। বাঁটটা মোষের শিংয়ের। দেখলে ছড়ি বলেই ভ্রম হয়।
ভল্লুকরাজকে দেখেই একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলাম। বালি-সুগ্রীবের প্রতিবেশীরা সাধারণত খর্বকায় শীর্ণ হন বলেই জানি। এমন রাবণ-বপু দেখব আশা করিনি।
তাই জাম্বুলিঙ্গম ঘরে ঢুকতেই আমি তীব্র গলায় বললাম, ইয়েস?
জাম্বুলিঙ্গম মোটা মোটা লেন্সের আড়াল থেকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল আমার পানে। হাত তুলে নমস্কার করল। এবং বলল অতি বিশুদ্ধ বাংলা ভাষায়, আপনিই মৃগাঙ্কবাবু? লেখক?
আর একবার হকচকিয়ে গেলাম। স্নায়ুর ওপর আর এক নির্যাতন। জাম্বুবানের কণ্ঠে বাংলা ভাষা!
কাষ্ঠহাসি হেসে বললাম, হ্যাঁ, আমিই মৃগাঙ্গ রায়। বসুন। কী ব্যাপার বলুন তো?
জাম্বুলিঙ্গম বসল। ছড়ির মতো ছাতাটা রাখল সামনের টেবিলে। ভদ্রলোকের চেহারায়, চাহনিতে, কথায় বেশ ব্যক্তিত্ব আছে। বলল রেশমমসৃণ ভারী গলায়, আমি আপনার কাহিনির বিশেষ ভক্ত।
আপনি? কৌতূহল আর বাগ মানল না।
হাসল জাম্বুলিঙ্গম, আশ্চর্য তাই না? যার চেহারা এমন কদাকার, যার মাতৃভাষা মিল, বাংলা ভাষায় তার এত ব্যুৎপত্তি থাকবে কেন?
না, না, আমি তা বলিনি–
মৃগাঙ্কবাবু, শুধু বাংলা নয়, ইন্ডিয়ার আরও চারটে ভাষা আমি অনর্গল বলতে পারি। ফ্রেঞ্চ আমার কাছে জল-ভাতের সমান। কিন্তু সেকথা যাক। আমি আপনার কাহিনির দারুণ ভক্ত। সেই সঙ্গে পরম ভক্ত আপনার বন্ধুর।
আমার বন্ধু?
প্রাইভেট ডিটেকটিভ ইন্দ্রনাথ রুদ্র। যার বিস্ময়কর কীর্তি অলীক শার্লক হোমসকেও ম্লান করে দিয়েছে।
আড়চোখে তাকিয়ে দেখলাম, ক্ষীণ গোঁফ জোড়ার ওপর সগর্বে আঙুল বুলিয়ে নিল ইন্দ্রনাথ।
সুতরাং আবার কাষ্ঠহাসি হাসলাম। বললাম, ইন্দ্রনাথ রুদ্র আপনার সামনেই হাজির।
চকিতে চোখ ফেরাল জাম্বুলিঙ্গম। আমি আলাপ করিয়ে দিলাম, ইনিই ইন্দ্রনাথ রুদ্র যাঁর কীর্তি রবার্ট ব্লেককে টেক্কা দিয়েছে। আর ইনি আমার অর্ধাঙ্গিনী।
নমস্কার প্রতি নমস্কারের পর জাম্বুলিঙ্গম বলল, মৃগাঙ্গবাবু, আমি কিন্তু ইন্দ্রনাথ রুদ্রকে রবার্ট ব্লেকের সঙ্গে তুলনা করি না। ওঁর সঙ্গে তুলনা চলে একমাত্র ফাদার ব্রাউন বা শার্লক হোমসের। ওঁর মস্তিষ্কই ওঁকে সে মর্যাদা দিয়েছে।
ঢোক গিলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলাম, আপনি দেখছি মস্ত বৈজ্ঞানিক।
মস্ত নয় ক্ষুদ্র। আমার সমস্যাটা বৃহৎ।
সমস্যা?
আজ্ঞে হ্যাঁ। আমি একটা সমস্যা নিয়ে এসেছিলাম আপনার কাছে। উদ্দ্যেশ ছিল, ইন্দ্রনাথবাবুর ঠিকানা নিয়ে তাঁর কাছে হত্যে দেব। আমার সৌভাগ্য, এক মন্দিরেই দুই দেবতার দর্শন পাওয়া গেল।
খোসামোদে পাথর গলে, আমিও তুষ্ট হলাম। বললাম, সে কি কথা! অসুবিধে না থাকলে আপনার সমস্যা আমার সামনে বলতে পারেন। পুজোর লেখার খোরাক চাই তো!
হেসে ফেললেন জাম্বুলিঙ্গম। ঝকঝকে সাদা দাঁত মিশমিশে মুখে খুব খারাপ দেখাল না। বলল, সমস্যাটা রক্তের শয়তানকে নিয়ে।
রক্তের শয়তান! সে আবার কী?
ব্লাড ক্যান্সার। আমি রঙ্গ করে নাম দিয়েছি রক্তের শয়তান। আপনি লেখক মানুষ, আমার কৌতুকবোধের তারিফ করবেন নিশ্চয়?
তা করছি, বললাম, আমি, ব্লাড ক্যান্সার মানে, লিউকোমিয়ার এমন বাংলা উপাধি এর আগে শুনিনি। কিন্তু রক্তের শয়তানকে নিয়ে আপনি বিব্রত কেন?
কারণ, ব্লাড ক্যান্সার আমার গবেষণার বিষয়বস্তু বলে।
আপনি–
আমি ব্যাঙ্গালোর ক্যান্সার রিসার্চ ইনস্টিটিউট থেকে আসছি। আসছি পার্সোনাল ক্যাপাসিটিতে। আমার সমস্যার গোড়া থেকে শেষ পর্যন্ত বলতে গেলে একটু সময় লাগবে। তার আগে যদি সাউথ ইন্ডিয়ান ড্রিঙ্ক দিয়ে গলা ভেজানো যেত–
নিশ্চয়, নিশ্চয়! বিষম লজ্জিত হয়ে বললাম, কবিতা, কফি দাও।
জাম্বুলিঙ্গম বাগাড়ম্বরের ধার দিয়েও গেল না। বলল, আপনারা ১৩ জুলাইয়ের কাগজে একটা খবর নিশ্চয় দেখেছেন। খবরটা নিয়ে সম্পাদকীয়ও লেখা হয়েছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ খবর তো। পড়েননি? বেশ, কাগজটা আমি সঙ্গে এনেছি। পড়ে শোনাচ্ছি।
বলে, বুক পকেট থেকে কাঁচি দিয়ে কাটা একটুকরো খবরের কাগজ বার করে ভারী গলায় পড়তে শুরু করল জাম্বুলিঙ্গম, রক্তের ক্যান্সার তথা লিউকোমিয়া নামক জটিল ও কঠিন রোগের নিরাময়কারক ঔষধ আবিষ্কার করিবার কৃতিত্ব যদি কেহ দাবি করেন, তবে বুঝিতে হইবে যে, তিনি মানব জীবনের কল্যাণ সম্ভব করিবার দুরূহ ও মহৎ একটি অঙ্গীকার সফল করিবার কৃতিত্ব দাবি করিতেছেন। দক্ষিণ ভারতের জনৈক চিকিৎসক সিদ্ধ চিকিৎসা-পদ্ধতির তথ্য সম্বলিত একটি পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন করিয়া এবং তদনুযায়ী গবেষণা করিয়া লিউকোমিয়ার ঔষধ আবিষ্কার করিয়াছেন বলিয়া সংবাদ প্রচারিত হইয়াছে। তিনি ভারত সরকারের বৃত্তিধারী গবেষক। সুতরাং, ভারতের সরকারি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের আর কালবিলম্ব না করিয়া এই কৃতিত্বের যথার্থতা বিচার ও বিবেচনা করিয়া দেখা কর্তব্য। এই ঔষধ প্রস্তুত করিবার উপযোগী গাছগাছড়ার অভাব আছে বলিয়া গবেষক-চিকিৎসক যে মন্তব্য করিয়াছেন, তাহার গুরুত্ব ও যথার্থতা সম্বন্ধেও সরকারি কর্তৃত্বে অনুসন্ধান হওয়া প্রয়োজন। কারণ দীর্ঘকালের গবেষণা ও কৃতিত্বে আবিষ্কৃত কোনও ঔষধের জন্য গাছগাছড়ার অভাব থাকিলে তাহা দূরীভূত করিবার ব্যবস্থা দ্রুত গ্রহণ করিতে হইবে। সরকারের পক্ষে সবার আগে জানিয়া লওয়া প্রয়োজন যে, আবিষ্কৃত ঔষধটি সত্যই যথার্থ নিরাময়কারণ ঔষধ।
