পাল্টা আক্রমণের জন্য তৈরি ছিল না ইন্দ্রনাথ। কিন্তু মানুষটা তো মহা ঘুঘু। ভাঙবে তবু মচকাবে না। একমুখ ধোঁয়া ছেড়ে এমন হাসিমুখে তাকাল যেন মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গলের লীগ খেলা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। বলল স্মিত মুখে, রবার্ট ব্লেকের সঙ্গে আমার মিল কোথায়?
ম্যাজিক দেখানোয়। সূত্র নেই, যুক্তি নেই–কেবল ভেলকি। ছছাঃ! বলে যেন কিস্তিমাত করেছি এমনি একটা ভাব দেখানোর জন্যে জম্পেশ টান দিলাম সিগারেটে এবং ফুকফুক করে ছোট ছোট কয়েকটা ধোঁয়ার রিং ছাড়লাম কড়িকাঠের দিকে।
আড়চোখে দেখলাম, সকৌতুকে আমাকে দেখছে ইন্দ্রনাথ। একটু হুঁশিয়ারও হলাম, কেননা, ওর টানা টানা চোখে যে জিনিসটার জিমনস্টিক দেখলাম, নাম তার দুষ্টুবুদ্ধি।
কবিতা টুং-টাং করে চামচ নাড়ছিল কফির পেয়ালায়। কান খাড়া করে শুনছিল দুই বন্ধুর বাকযুদ্ধ। যেন মল্লবীরের পাঁয়তাড়া।
হঠাৎ কবিতাকেই ডাক দিল ইন্দ্রনাথ। বলল, ও বউদি, করছ কী?
কফি। তোমার এবং আমার আরশুলা পতিদেবতার।
বেশ বুঝলাম, কবিতা রাগাতে চায় আমাকে। বুঝেও, রেগে গেলাম। কোন অ্যাংগেলে ওকে ঘায়েল করব ভাবছি; রান্নার দিক দিয়ে, না রূপের দিক দিয়ে, এমন সময়ে ইন্দ্রনাথ ফের বলল কবিতাকে, বউদি, তোমার আরশুলা পতিদেবতার চরিত্রের একটা বিবরণ শুনবে?
আমার চরিত্রের বিবরণ? কী বলতে চায় ইন্দ্রনাথ? বিষম ভাবনা হয়ে গেল আমার। ইন্দ্রনাথের কিন্তু হৃক্ষেপ নেই আমার দিকে। বলছে, রবার্ট ব্লেকের ঠাকুরদা এলেও যা বলতে পারবে না, ম্যাজিশিয়ান ইন্দ্রনাথ রুদ্র এবার তাই বলবে। কি দেখে বলবে জানো?
মুখ দেখে? তেরছা চোখে তাকিয়ে বলল কবিতা।
আরে না, ও-মুখে আছে কি যে দেখব?
আমার শ্রীহীনতা নিয়ে এত বড় একটা খোঁচাও গায়ে মাখলাম না।
উদ্বেগ আমার চারিত্রিক খোঁচা নিয়ে। ইন্দ্রনাথ রুদ্র আমার কলেজ ফ্রেন্ড। স্কটিশ চার্চে পড়বার সময়ে সহপাঠিনীদের সঙ্গে একটু-আধটু রঙ্গ- ইতিহাস আছে বইকি। হতভাগা সেসব ফাঁস করলেই গিয়েছি।
ইন্দ্রনাথ কিন্তু সেসবের ধার দিয়েও গেল না। বল, সিগারেট টানার স্টাইলটা দেখেছ?
কবিতা আড়চোখে আমার দিকে তাকিয়ে নিল, আবার রিং ছাড়া হচ্ছে!
ইন্দ্রনাথ বললে, হা, রিং। ধোঁয়ার রিং। মানে কি জানো?
রিং মানে আংটি, ভুরু নাচিয়ে কবিতা বলল, আংটি মানায় নরম আঙুলে। নরম আঙুল হয় পরী-হুঁরীদের। পরী-হুঁরীরা জন্ম নেয় ধোঁয়া থেকে। ধোঁয়ার আংটি তাদের জন্যে।
মন্দ বলোনি। বলল ইন্দ্রনাথ, লেখকের বউ তে। কল্পনায় ম্যাজিশিয়ান। কিন্তু আমি যা বলব, তা মনোবিজ্ঞানীদের কথা। ধোঁয়ার আংটি যারা রচনা করে, তাদের চরিত্রের একটা বিশেষ প্যাটার্ন আছে।
যেমন? কবিতা বিলক্ষণ কৌতূহলী। ইন্দ্রনাথের ঠোঁটে মিটিমিটি হাসি।
এদের বিশ্বাস করা যায় না–এদের ওপর আস্থা রাখা যায় না।
হাততালি দিয়ে কবিতা বললে, একদম খাঁটি কথা। আর কি?
ধোঁয়ার আংটি যতই দুলতে-দুলতে ওপরে উঠছে, ততই যেন বুক দশহাত হচ্ছে লেখক মহোদয়ের। কীরকম তাকিয়ে আছে দেখছ আংটিগুলোর দিকে? কেন জানো? মনে মনে ফন্দি আঁটছে। সে ফন্দি নিজেকে নিয়ে।
নির্জলা সত্য। কবিতা বিলক্ষণ উল্লসিত।
আরও আছে, বউদি। এ জাতীয় লোকেরা নিজেকে নিয়ে এত ব্যস্ত থাকে যে আর কারও ব্যাপারে মাথা গলানোর গরজ দেখায় না। কারণ, এদের ভাবনার মুখ বাঁকানো থাকে ভেতর দিকে। বাইরের কারও কথা শুনে সায় দিলেও জানবে মনে থেকে সায় দেয় না।
এগজ্যাক্টলি! আমার স্বার্থপর চরিত্ৰকাহিনি শুনে যেন আহ্লাদে আটখানা হল কবিতা।
ঠাকুরপো, হাড়ে ঘুন ধরিয়ে আমি যা জেনেছি, পাঁচ মিনিটে তুমি তা জানলে কী করে?
ওই যে বললাম, সিগারেটে টান মেরে রিং ছাড়ার বহর দেখে। শুনলে মনে হয় যেন খড়ি পেতে গুণে বলছি। অথচ একটু পড়াশুনো থাকলেই এমনি চমক লাগানো যায়। মনে হয় যেন ম্যাজিক। রবার্ট ব্লেকের কীর্তি। তাই না মৃগাঙ্ক?
রাগের চোটে তখন আমার মুখে কথা সরছে না। সিগারেট খাওয়াও মাথায় উঠেছে। তাই কেবল কটমট করে তাকালাম বউয়ের হাসি মাখানো বড় বড় চোখ দুটোর দিকে।
ইন্দ্রনাথ বললে, ভায়া, রাগ করছ কেন? পেট থেকে পড়েই কি কেউ ডিটেকটিভ হয়? নিজেকে তৈরি করতে হয়। তুমি তো জানো, আমি কলেজের বই যত না পড়েছি, তার দশগুণ পড়েছি দশরকম সাবজেক্ট নিয়ে। পড়ার নেশায় পড়েছি। আজকের ডিটেকটিভ পেশায় তা কাজে লাগছে। সুতরাং রবার্ট ব্লেক বলে আমাকে ব্যঙ্গ করা কেন বন্ধু?
আমি কি বলব ভেবে না পেয়ে তারস্বরে বললাম, কফি দাও।
মুখ টিপে হেসে কফি এগিয়ে দিল কবিতা এবং ঠিক সেই সময়ে ডিংডং শব্দে ঘণ্টাধ্বনি হল সদর দরজায়।
একটু পরেই একটা কার্ড এসে পৌঁছোল আমার সামনে। আইভরি কার্ড। উঁচু উঁচু হরফে নাম লেখা–ডক্টর জাম্বুলিঙ্গম। নামের পাশে কয়েকটা ডিগ্রি।
খিঁচড়োনা মেজাজ নিয়ে খেঁকিয়ে উঠলাম, জাম্বুলিঙ্গম! কে জাম্বুলিঙ্গম? আমি চিনি না। বলোগে যা, দেখা হবে না।
ও আবার কি অসভ্যতা! ধমকে উঠল কবিতা। তোমার মতো জাম্বুবানের সঙ্গে দেখা করতে জাম্বুলিঙ্গম আসবে না তো কে আসবে? বঙ্কা, পাঠিয়ে দে বাবুকে।
বঙ্কা বিদায় হল এবং অনতিকাল পরেই ঘরে ঢুকল যেন সাক্ষাৎ জাম্বুবান। শুনেছি, ত্রেতাযুগে ভল্লুকরাজ নাকি দারুণ যোদ্ধা ছিল। স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণকেও একুশ দিন নাজেহাল হতে হয়েছিল জাম্বুবান কে পরাস্ত করতে।
