মাথা মুখ ঢাকা ভেল্কিবাজরা শেরিফের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয় চাবির থোকা। খুলে যায় গারদের দরজা। দুজন চেপে ধরে টম শিপকে। অজ্ঞান হতে তখন তার বেশি দেরি নেই। একজন তাকে শক্ত হাতে ধরে রাখে, আর একজন ঘুসির পর ঘুসি বসিয়ে যেতে থাকে তার মুখের ওপর। টানতে টানতে ওকে আনা হয় বাইরে। আদালত ভবনের সিঁড়ির ওপর থেকে লাথি মেরে গড়িয়ে দেওয়া হয় নীচের লনে। তারপর যখন দড়ির ফাঁস পরানো হয় ওর গলায়, তখন পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়েছে সে। গাড়ির ছাদের ওপর একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে গলা চিরে চিৎকার করতে থাকে–খুন করো ওকে! খুন করো ওকে!
এক মুহূর্তের মধ্যেই গাছ থেকে ঝুলতে থাকে টম শিপ। তারপর টেনে আনা হয় এব স্মিথকে। দু-হাত তার পিছনে বাঁধা। একজন মাতাল জড়িয়ে জড়িয়ে জিগ্যেস করে–কিহে কালো শয়তান, কীরকম লাগছে তোমার? দড়ির অন্য প্রান্তের ফসটি ওক গাছের একটা শাখার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে আনা হয়। এবং নিষ্করুণভাবে ফাসবদ্ধ এই নিগ্রো ছোকরাও খুব দ্রুত ত্যাগ করে তার শেষ নিঃশ্বাস।
ষোলো বছরের হার্ব ক্যামেরন একজন স্ত্রীলোকের সেলে লুকিয়ে পড়ে রেহাই পেয়ে যায় সে যাত্রা। চুরির জন্যে স্রেফ দশদিনের হাজতবাসের গল্প ওরা বিশ্বাস করেছিল কিনা, অথবা ওরকম হাড্ডিসার ছোকরার জন্য দড়ির অপচয় করাটা ওরা অনুচিত মনে করেছিল কিনা তা কেউ বলতে পারবে না। এমনও হতে পারে যে দু-দুটো খুনের পর জনতার হত্যালালসা এবং হাঙ্গামাতৃষ্ণা অনেকাংশে মিটে গিয়েছিল।
এই ভয়াবহ গল্প বিদ্যুৎগতিতে ছড়িয়ে পড়ার পর দুনিয়ার পুলিশরা এসে হাজির হল ম্যারিঅনে। জাতীয় রক্ষীবাহিনীও এল। কিন্তু তখন ক্ল্যানসমেনদের কেউই আর ছিল না সেখানে অন্তত হুড়-পরা অবস্থায় নয়। অপরাধীদের খুঁজে বার করার চেষ্টায় আমি যখন কাজ শুরু করলাম, তখনও কিন্তু বেশ গরম ম্যারিজনের আবহাওয়া। রুচিশীল নাগরিকেরা যে এই বীভৎস হাঙ্গামার জন্যে খুব মুষড়ে পড়েননি, এমন কল্পনাও যেন কেউ না করেন। এমনকী একজন পুরুতও হত্যাকারীদের সনাক্ত করতে যারা পারে তাদের প্রতি আবেদন করার সময়ে প্রকাশ করে ফেলেছিলেন, বহুজনের মতের সঙ্গে তাঁরও মতের মিল আছে এ বিষয়ে। উনি বলেছিলেন, খ্রিস্টের নামে বলছি, জনতার ভয়াবহ জয়লাভের ফলে যারা অত্যাচারিত, তাদের সম্পর্কে সত্য কথা শুনতে চাই আমরা।
সামরিক আইনের আওতায় এসে পড়ে ম্যারিঅন। জনতা আইনের নিয়ম লঙ্ঘন করার মতো সাহস যাদের আছে, তাদেরকে নিয়ে চার হপ্তা ধরে একনাগাড়ে আমি চেষ্টা করলাম ন্যায়চক্রকে ঘূর্ণমান রাখতে। কিন্তু এত তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই ভয়ঙ্কর দৃশ্য যারা দেখেছে, তাদের অত জিজ্ঞাসাবাদ করেও আমি এমন দুজন সাক্ষী পেলাম না যারা দলের পাণ্ডাদের নাম বলতে রাজি আছে। দুজন তো দূরের কথা, এরকম লোক আমি একজনকেও পেলাম না। কেউই বলল না–আমি দেখেছি–নিগ্রোদের গলায় ফাঁস পরাতে। আমি ওকে চিনি। ভালোভাবেই চিনি। আমার ভুল হতে পারে না এবিষয়ে। বহুবার তার গলাও আমি শুনেছি।
গুজব শোনা গেল, ক্ল্যান পান্ডারা জর্জিয়া পালিয়েছে। কিন্তু এ সম্বন্ধে আর করণীয় কিছুই ছিল না। পরবর্তী কর্মপন্থাকে কার্যকরী করতে গেলেই আমাকে প্রমাণ করতে হবে ব্যাপারটা দুই দেশের মধ্যে সন্ধি সম্বন্ধে আবদ্ধ অপরাধ। অর্থাৎ আন্তঃ প্রদেশ কিডন্যাপিং অথবা আন্তঃপ্রদেশ যোগাযোগ। কিন্তু তা অসম্ভব ছিল। গভর্নমেন্টের পক্ষেও করণীয় কিছু ছিল না। কাজে কাজেই কেসটা ছেড়ে দেওয়া হল প্রদেশ কর্তৃপক্ষ এবং পুলিশের হাতে।
জেম্স এম ওগডেন নামে এক সাহসী অ্যাটর্নি জেনারেল শেষ পর্যন্ত ম্যারিঅনের ক্ল্যানদের দলপতি হিসেবে দুজন পুরুষকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত প্রমাণাদির অভাবে কোর্ট এ অভিযোগ নাকচ করে দেয়।
হার স্বীকার করার পর ম্যারিঅন ছেড়ে এসেছিলাম আজ হতে প্রায় পঁচিশ বছর আগে। এর মধ্যে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে দক্ষিণ অঞ্চলে, সুদিন এসেছে, উন্নতি ঘটেছে। যদিও হেথায়-সেথায় এখনও জাতিবিদ্বেষ ফুটে রয়েছে দুষ্ট কীটগ্ন ফুলের মতো, তবুও বেশির ভাগ আমেরিকান তাকিয়ে আছেন সেই সুদিনের দিকে যেদিন এই বিষ চিরতরে মুছে যাবে সমাজের বুক থেকে।
* জন কোন্যালী (আমেরিকা) রচিত কাহিনি অবলম্বনে।
রক্তের শয়তান
ইন্দ্রনাথ রুদ্র প্রাইভেট ডিটেকটিভ। অতএব সে সবজান্তা। এইরকম একটা ধারণা স্বয়ং ইন্দ্রনাথের মধ্যেই উঁকিঝুঁকি মারছিল নিশ্চয়। নইলে ইদানীং কথায় কথায় নিজের জয়ঢাক নিজে পিটবে কেন?
সত্যি কথা বলতে কি, হামবাগ ভাবটা আমি দু-চক্ষে দেখতে পারি না। সুনাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ইন্দ্রনাথের চরিত্রেও হামবড়া জিনিসটা আসছে দেখে মেজাজ খিঁচড়েছে কতবার।
সেদিন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলাম যখন ইন্দ্রনাথ টিপ্পনী কাটল আমার লেখা নিয়ে। এই একটি ব্যাপারে কে খোঁচা মারলে আমি আর শিব হয়ে বসে থাকতে পারি না। গিন্নিকেও রেয়াত করি না।
ফট করে ইন্দ্রনাথ বলে বসল, মৃগাঙ্ক হল লেখক, আর আরশুলা হল পাখি।
বলুন দিকি, অর্ধাঙ্গিনীর সামনে এ জাতীয় কথায় মেজাজ ঠিক রাখা যায়? আমিও ঠিক রাখতে পারলাম না।
রেগে তিনটে হয়ে বললাম, রবার্ট ব্লেক যদি গোয়েন্দা হয়, তুমিও তাহলে ডিটেকটিভ।
