নদীতীরে প্রেমিক-প্রেমিকার ওপর চড়াও হওয়ার কথা স্বীকার করেছিল টম শিপ। বাকি দুজনেই স্বীকার করেছিল, হ্যাঁ তারাও ছিল টম শিপ-এর সঙ্গে।
ম্যারিঅনের সীমানার বাইরে কু কুক্স ক্ল্যান-এর সভার নির্ধারিত সময় ছিল ৭ আগস্টের রাত দুটো। সবাই মিলিত হবার পর নিষিদ্ধ জিন-এর স্রোত বয়ে গেল নির্বাধে। সেই সঙ্গে চলল নিগ্রোদের প্রতি অবাধে বিষেণচাঁদগার। আলোচনা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে পেতে শেষ পর্যন্ত মতলব স্থির হয়ে গেল : ঠিক হল, দল বেঁধে সবাই হামলা দেবে জেলের মধ্যে। সভা যখন ভঙ্গ হল, তখন বেশির ভাগ ক্ল্যানসমেন-ই মদে চুর চুর এবং নষ্টামির জন্যে উদগ্রীব। জেলার প্রত্যেককে ডেকে তুলে বিরাট দল গড়ার পরিকল্পনাও হয়েছিল। স্লোগান তৈরি হল, কুত্তা নিগারগুলোকে যেভাবেই হোক পাঠাতে হবে যমালয়ে!
সকাল দশটা নাগাদ আদালত ভবনের দিকে যে-কটা রাস্তা এসেছে, সবকটায় জড়ো হল কাতারে কাতারে লোক। পিল পিল করে আরও লোক আসছিল ম্যারিঅনের বাইরে থেকে। রাগে গনগনে প্রত্যেকেরই মেজাজ। সত্যি কথা বলতে কি আসন্ন হাঙ্গামার সম্ভাবনায় দেখতে দেখতে থমথমে হয়ে উঠল চারপাশের আবহাওয়া। জেলের বাইরে জনতা যে কিছু গোলমাল শুরু করার জন্যেই ওত পেতে রয়েছে, এ সম্পর্কেও হুঁশিয়ার করে দেওয়া হল শেরিফ ক্যাম্পবেলকে। কয়েদিদের চুপিসারে ম্যারিঅনের বাইরে পাচার করে দেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হল তাঁকে।
কিন্তু নিজের ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখতেন শেরিফ। তাই জবাব দিলেন–অর্থাৎ সবাই ভাবুক যে ভয়ের চোটে ল্যাজ গুটিয়ে সরে পড়ছি আমি। ওসব কিসসু হবে না। এ অঞ্চলের সবচেয়ে দুর্ভেদ্য জেল হল এইটা। কারও ক্ষমতা নেই দরজা ভেঙে এর ভেতরে উৎপাত করবে।
দারুণ ভুল করেছিলেন ক্যাম্পবেল। কেননা, খুব জোর ঘণ্টা তিনেক, কি তারও একটু পরেই জয়জয়কার পড়ে গেল সেই আইনের। যে আইন কোনও আইনের পরোয়া না করে নিজ হাতেই তুলে নেয় অপরাধীকে দণ্ড দেওয়ার গুরুভার। কড়া রোদ্দুরের মধ্যে ঝুলতে লাগল দু-দুটো নিষ্প্রাণ দেহ। আনুষ্ঠানিক বিচার প্রহসন বেমালুম কেটে হেঁটে সংক্ষিপ্ত করে আনলে জনতা। রক্তের তৃষ্ণা মিটোনোর এই বীভৎস দৃশ্যে কিন্তু একটি জাতীয় রক্ষীও উপস্থিত ছিল না একাজ থেকে তাদের নিবৃত্ত করার জন্যে।
জেলের ওপর সর্বপ্রথম হামলা শুরু হয় চারজন মাথা মুখ ঢাকা ক্ল্যানসমেন-এর প্রচেষ্টায়। রাস্তার কোণ থেকে লোহার ট্রাফিক সিগন্যালটা মাটি খুঁড়ে তুলে আনে ওরা। তারপর, শুরু হয় আদালত ভবনের লোহার খিলমারা ওককাঠের ভারী দরজাটার ওপর আঘাতের পর আঘাত। কিন্তু এক চুলও নড়ে না পাথরের মতো শক্ত দরজাটা। বাধ্য হয়ে লোহার খেটে নামিয়ে রেখে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয় ওরা। রীতিমতো ঘামতে ঘামতে বিস্তর গালিগালাজ বর্ষণের পর আবার নতুন উদ্যমে শুরু হয়ে তাদের প্রচেষ্টা।
ইতিমধ্যে একটা কঁদুনে গ্যাসের বোমা এসে পড়ে জনতার মাঝে তাদের ছত্রভঙ্গ করার জন্যে। কিন্তু একজন অতি-তৎপর ক্ল্যান হাঙ্গামাকারী চট করে বোমাটা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দিলে যেদিক থেকে এসেছে সেইদিকেই। দরজা-ভাঙার খেটে এবার আর ব্যর্থ হয় না। দরজার পাশে পাশে গাঁথুনিতে ফাটল দেখা যেতেই মুহুর্মুহু বিজয়ের উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে এদিকে-সেদিকে। হুড পরা একজন চিৎকার করে ওঠে–ওহে হাত লাগাও সবাই, বাস্টার্ডদের এবার আমরা হাতের মুঠোয় পাব। হাতে হাতে চালান হয়ে গেল জিন মদের একটা বোতল। উইজার্ড অর্থাৎ জাদুকরের পোশাকের নীচ থেকে বেরিয়ে এল একটা দড়ি। এবং আরও রাশি রাশি লোক ছুটে এল হাত লাগানোর জন্যে।
জেলের বাইরের পৈশাচিক উল্লাসে উন্মত্ত হাঙ্গামাকারীদের নিরোধ করা যাবে না–এমন ধারণা কিন্তু তখনও জেলের ভেতরে শেরিফ ক্যাম্পবেলের মাথায় আসেনি। আগের চাইতেও জনতা বৃদ্ধি পেয়েছিল। কাণ্ড দেখার জন্যে গাড়ির ছাদে ওপরেও উঠে পড়েছিল বিস্তর মানুষ। কেউ কেউ আবার আদালত ভবনের দরজা ভাঙার দৃশ্যটা ছেলেমেয়েদের দেখানোর জন্যে তাদেরকে তুলে নিয়েছিল নিজের কাঁধের ওপর। এ হেন হামলা স্বচক্ষে দেখে বিকৃত তৃপ্তি পাওয়ার জন্যে এসেছিল অনেকে। এ কাজে অংশ নেওয়ার অত সাহস তাদের ছিল না। বাধা দেওয়ার মতো সাহস বা সদিচ্ছাও কারও ছিল না।
জানলা থেকে তারস্বরে চেঁচিয়ে ওঠে ক্যাম্পবেল–থামো! দরজার দিকে আমি মেশিন গানের মুখ ঘুরিয়ে রেখেছি। প্রথমেই যে ঢুকবে, তার আর নিস্তার নেই।
বিকট চিৎকার আর উল্লাসধ্বনির মধ্যে অব্যাহত থাকে হামানদিস্তা পেটার মতো দমাদম শব্দ। শেষকালে খসে পড়ে পাথর আর ইটের বাঁধুনি এবং বিজয়মাল্য এসে পড়ে কু ক্লক্স ক্ল্যানদের গলে। ধুলো আর চুন-বালি-শুরকির কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হুড়মুড় করে জনতা ঢুকে পড়ে ভেতরে। তারপর যে দৃশ্যের সৃষ্টি হয়, তা উন্মাদদের প্রলয়নাচন ছাড়া আর কিছুই নয়।
বেপরোয়া জনতার ওপর গুলি চালানোর ভয় দেখালেও শেষ পর্যন্ত তা আর করলেন না ক্যাম্পবেল। এ সম্পর্কে কোনও স্থির সিদ্ধান্তে আসা বাস্তবিকই বড় সহজ কাজ নয়। উনি জানতেন ভিড়ের মধ্যে তাঁর বন্ধু আছে, প্রতিবেশী আছে, হয়তো দু-একজন আত্মীয়ও আছে। কয়েদিদের প্রতিরক্ষার জন্যে জন বারো কি তারও বেশি মানুষকে সাবাড় করাটা ন্যায়সঙ্গত কিনা, তা তাঁকে ভাবতে হয়েছে ওইটুকু সময়ের মধ্যেই। এবং তার চাইতেও দরকারি হল এই যে জনতার ওপর বেধড়ক গুলি চালিয়েও কি কয়েদিদের বাঁচাতে পারেন উনি?
