গুরু গম্ভীর গলা শোনা যায়, ওহে খোকাখুকুরা, বেয়াড়াপনা করলেই বিপদে পড়বে। ভালো চাও তো গুটি গুটি নেমে এসো দিকি গাড়ির ভেতর থেকে।
বিনা দ্বিধায় হুকুম তামিল করে ছেলেটি। মেয়েটি গাড়ির মধ্যেই বসে থাকে। এবার পিস্তলধারীর সংকেত পেয়ে অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে আরও দুজন ছায়ামুর্তি। ছেলেটির পকেট হাতড়ে তাকে কপর্দকহীন করে ওরা–খুচরোগুলোও নিতে ভোলে না। তারপর দলের পাণ্ডার হুকুম হয় মেয়েটিকে দেখাশুনা করার। ওদের মধ্যে একজন সুট করে ঢুকে পড়ে গাড়ির ভেতর এবং পর মুহূর্তে মেয়েটির ভয়ার্ত চিৎকার ভেসে আসে ছেলেটির কানে। মরিয়া হয়ে ওঠে সে। নিজের বিপদ তুচ্ছ করে আচমকা এক মোক্ষম ঘুসি বসিয়ে দেয় পিস্তলধারীর মুখের ওপর।
এ কাজে রীতিমতো সাহসের দরকার বিশেষ করে একজন অল্পবয়সি ছেলের পক্ষে এতখানি সাহস দেখানো বড় সোজা কথা নয়।
একটু টলে ওঠে পিস্তলধারী। তার পরেই সামলে নিয়ে পর পর তিনবার গুলিবর্ষণ করে। হাতে এবং পেটে গুলিবিদ্ধ হয়ে আছড়ে পড়ে ছেলেটি। ক্ষতমুখ দিয়ে ফিনকি দিয়ে ছুটে আসা রক্তের মধ্যে গড়িয়ে গিয়ে জ্ঞান হারায় সে।
হানাদার তিনজন তিরবেগে দৌড়ে গিয়ে উঠে পড়ে নিজেদের গাড়িতে। পুরোনো মডেলের একটা টি ফোর্ড গাড়ি। এবং সাংঘাতিক ভাবে আহত ছেলেটির পানে এক পলক দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়েই ঝড়ের মতো বেগে গাড়ি চালিয়ে উধাও হয় সব্বাই।
প্রিয়তম ছেলেটির পায়ে নতজানু হয়ে বসে পড়ে মেয়েটি। ঘটনার আকস্মিকতায় এমনই অভিভূত হয়ে পড়েছিল বেচারি যে প্রথমেই আর্তস্বরে চিৎকার করে ওঠে সে। কিন্তু তার চিৎকার শুনে ছুটে আসার মতো লোক ধারে কাছে কেউই ছিল না। শেষকালে নিরালা জায়গাটা ছেড়ে সে দৌড়তে থাকে একটা খামারবাড়ি লক্ষ্য করে সাহায্যের আশায়। রাত তখন দশটা কুড়ি মিনিট।
গুলিবর্ষণের এই দৃশ্যটি যেখানে ঘটে, সে জায়গাটি ম্যারিঅনের বাইরে। কাজেই শহরের পুলিশরা সাফ বলে দিলে তদন্তটা পড়ছে কাউন্টি কর্তৃপক্ষের এক্তিয়ারে। ডাক পড়ল স্টেট হাইওয়ে পেট্রলের। শেষে ঠিক হল গ্রান্ট কাউন্টির শেরিফ জেক ক্যাম্পবেল হাতে নেবেন এই কেস।
ক্যাম্পবেল লোকটি ছিলেন ঝানু পুলিশ অফিসার। সাহসেরও তার অভাব ছিল না। এবং অভাব যে বাস্তবিকই নেই, তা প্রমাণিত হয় তাঁর খুঁড়িয়ে চলার ধরন থেকেই। পিস্তলযুদ্ধে গুরুতরভাবে পায়ে চোট পেয়েছিলেন ক্যাম্পবেল। এ কেস যখন হাতে নিলেন, তখন ডাক্তারেরা উঠে পড়ে লেগেছেন ছেলেটির জীবন বাঁচানোর জন্যে। মেয়েটির জবানবন্দি থেকে ঘটনার নিখুঁত বিবরণও পাওয়া গিয়েছিল।
গুলিবর্ষণের পরেই সেই রাত্রে ম্যারিঅনে হাজির ছিলেন ক্যাম্পবেল। একটা সেকেলে মডেলের টি ফোর্ড গাড়ির মধ্যে তিনজন নিগ্রোকেও দেখেছিলেন। ওয়াশিংটন স্ট্রিট বরাবর বিকট স্বরে চেঁচাতে চেঁচাতে গাড়ি চালাচ্ছিল ওরা। ওদের এই হুল্লোড় আর আচরণ দেখে তখন কিন্তু উনি বিশেষ কিছু ভাবেননি। উনি জানতেন, মেজাজ খিঁচড়ে গেলে, খুব মুষড়ে পড়লে মানুষমাত্রই, তা সে কালো হোক আর সাদাই হোক, একটু বেসামাল হয়ে ওঠে। হাবভাবে আচার ব্যবহারে তখন অনায়াসেই একটা বেখাপ্পা বেয়াড়া ভাব লক্ষ্য করা যায়। যাই হোক, টি মডেল গাড়িটাকে দাঁড় করালেন উনি। দেখলেন, রেজিস্ট্রেশন হয়েছে টম শিপ-এর নামে। এই কাণ্ডর একটু পরেই ক্যাম্পবেল এবং তাঁর ডেপুটিরা রওনা হলেন টম শিপ-এর ঠিকানা খুঁজে বার করার জন্যে শহরের যে অঞ্চলে কালো চামড়ার লোকেরা থাকে সেই দিকে।
কোঠা বাড়িটায় রঙের কোনও বালাই ছিল না। আধা-অন্ধকারের মধ্যে বাড়িটা দেখে মনে হচ্ছিল যেন বয়সের ভারে বেজায় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে বেচারী নিজেকে খাড়া করে দাঁড় করিয়ে রাখার মতো শক্তিও তার নেই। গ্যারেজের ভেতরে হানা দিতেই ফোর্ড গাড়িটা চোখে পড়ল পুলিশ অফিসারদের। অ্যাক্সেলের চার পাশে ঘাস এবং গুল্ম লেগেছিল। মিসিসিনউয়া নদীর তীরে গেলে যে ধরনের ঘাস-গুল্ম পাওয়া যায়–ঠিক সেই রকমের।
পর্দা দেওয়া দরজাটা লাথি মেরে দুহাট করে খুলে ফেললেন ক্যাম্পবেল। এলোমেলো বিছানার ওপর জামাকাপড় পরেই চিৎপাত হয়ে শুয়ে ছিল টম শিপ। ঘুম ভাঙানোর পর সে স্বীকার করলে, হ্যাঁ, এক স্মিথ আর হার্ব ক্যামেরন নামে দুই বন্ধুর সঙ্গে সে একটু ফুর্তি করতে বেরিয়েছিল বটে। শিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন ক্যাম্পবেল। ডেপুটিরা পাকড়াও করে আনলেন স্মিথ আর ক্যামেরনকে।
আব্রাহাম স্মিথের বয়স উনিশ বছর। আর হার্ব ক্যামেরনের বয়স মাত্র ষোলো। উপবাসশীর্ণ ফিনফিনে চেহারা তার। হাতকড়া লাগিয়ে দুজনকে নিয়ে যাওয়া হল ম্যারিঅনের পুরোনো আদালত ভবনে। লাল ইট আর গ্রানাইট দিয়ে তৈরি সে বাড়ি।
নদীতীরে গুলিবর্ষণের অকুস্থলে এবং তার পরের ভয়াবহ উপসংহার নিয়ে তদন্তে ব্যস্ত থাকার সময়ে ক্যাম্পবেল অনেক কথা আমায় বললেন সে রাতের ঘটনা প্রসঙ্গে। কিন্তু গ্রেপ্তার করবার পর সেই রাতেই ডেপুটিরা এই তিনটি কালোচামড়া ছেলেদের নিয়ে আসলে কি যে করছিলেন, তার কোনও বৃত্তান্তই আমি বার করতে পারলাম না কারও কাছ থেকে। শুনেছিলাম থার্ড ডিগ্রি নামক পদ্ধতিটিও বাদ যায়নি। কেউ কেউ বললে, ছেলেগুলোর পেট থেকে স্বীকরোক্তি আদায় করার পর নাকি বেদম হাঁপিয়ে পড়েছিলেন ডেপুটিরা।
