বিষ?
হ্যাঁ। দুধে বিষ মেশানো ছিল। পাশে শামাদানে জ্বলন্ত মোমবাতি ছিল। দরজার বাইরে পেট্রোলের টিন ছিল। রানীর প্ল্যান ছিল, বিষ খাইয়ে আগে রাজাকে খুন করা। তারপর পেট্রোল ঢেলে শামাদান উল্টে আগুন লাগিয়ে দেওয়া। সবাই জানবে, হঠাৎ আগুন লেগে রাজা ভৈরব পুড়ে মরেছে। রানীকে কেউ সন্দেহ করবে না।
কিন্তু রাজার মনে খটকা লাগল। তাই রানী যেই অন্য দিকে ফিরেছে, রাজা অমনি দুধ অর সুরার গেলাস পালটা পালটি করে দিল। রানী সেই দুধ খেয়ে রাজার সামনেই মারা গেল। দারুণ উত্তেজিত রাজা শামাদান নিয়ে যেই ঘর থেকে বেরোতে যাবে, অমনি পেট্রোলের টিনে হুমড়ি খেয়ে পড়ল। পেট্রোল গড়িয়ে গেল মেঝেতে–শামাদানের জ্বলন্ত মোমবাতি ছিটকে গিয়ে পড়ল পেট্রোলে। সঙ্গে সঙ্গে দাউ দাউ করে আগুন লেগে গেল দোতলায়। ফলে রাজা জ্যান্ত পুড়ে মরল। আর পুড়ল রানীর মৃতদেহ।
ডাক্তার থামতেই আমি শুধোলাম–এ গল্প কবেকার?
পাঁচ বছর আগেকার।
আপনি কী করে জানলেন?
কেন না, দুধে আমিই বিষ মিশিয়ে দিয়েছিলাম। রানী সুরুচির সঙ্গে আমার গোপন প্রেম ছিল। কিন্তু খবরদার, এ কথা যেন পাঁচ কান না হয়। বলেই ডাক্তার আমার সামনেই অদৃশ্য হয়ে গেল।
* উল্টোরথ পত্রিকায় প্রকাশিত। ভাদ্র, ১৩৭৭।
ম্যারিঅন-এর ঘটনা
কাপড়ের আবরণে মাথা-মুখ ঢাকা যেন চলমান প্রেতমূর্তিগুপ্ত সমিতির সদস্য–এদের আমি দেখেছিলাম। সাদা পোশাক পরে ছিল সবাই। ঘোড়ায় চেপে স্রোতের মতো এসেছিল তারা। প্রদোষের ম্লান আলোয় ঘোড়সওয়ার মূর্তিগুলোকে সাক্ষাৎ শয়তানের মতো দেখাচ্ছিল। আমার তখন বয়স খুব অল্প। নেহাতই ছেলেমানুষ। ফ্লোরিডার মেরিয়ানার কাছাকাছি একটা গ্রামে আমি থাকতাম। অনেক রাত আমার জীবনে এসেছে, কিন্তু সে রাতটাকে আমি আজও ভুলতে পারিনি। ভুলতে পারিনি কীভাবে মাথা-মুখ আচ্ছাদিত লোকগুলো একটা জ্বলন্ত ক্রশ ঝুলিয়ে দিয়েছিল ক্যাথলিক গির্জের বাইরে; তারপর ভেতরকার উপাসনারত সবাইকে হুকুম করেছিল বাইরে বেরিয়ে আসতে। বয়স তখন খুবই অল্প হলেও এ-সবের অর্থ যে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ভয়াবহ সূচনা, তা বোঝার মতো বুদ্ধি আমার ছিল।
ক্যাথলিক, নিগ্রো, ইহুদি–এদের প্রত্যেককে ঘৃণা করত মাথামুখ ঢাকা এই লোকগুলো। গায়ের রং যাদের সাদা নয়, দক্ষিণদেশের মানুষ না হলেও যারা তাই মনে করে নিজেদের–এদের প্রত্যেককে মনেপ্রাণে ঘৃণা করত এরা, এই মাথা-মুখ আচ্ছাদিত লোকেরা। দীর্ঘদিন ধরে আমাদের গ্রামের সবার এবং খেত-খামারের চাষি মানুষদের অন্তরে বিভীষিকা রচনা করে এসেছে এই কু ক্লক্স ক্ল্যান-য়েরা।
ছেলেবেলায় প্রথমদিকের স্মৃতি, বিশেষ করে এই সবের স্মৃতি কোনওদিনই মুছে যায় না মনের পট থেকে। পঞ্চাশ বছর আগেকার ঘটনা হলেও আজও আমি যখন জীবনে প্রথম দেখা মাথা-মুখ ঢাকা সেই লোকগুলোর কথা মনে করি, স্নায়ুতে স্নায়ুতে উপলব্ধি করি সেদিনকার রক্তজমানো আতঙ্ক।
পরে এদের সম্বন্ধে আরও অনেক তথ্য আমি জেনেছিলাম। জেনেছিলাম কীভাবে গৃহযুদ্ধের সময়ে সর্বপ্রথম শুরু হয় কু কুক্স ক্ল্যান-য়ের তৎপরতা। তারপর দাসত্ব প্রথা লোপ পাওয়ার পর আরও দুর্ধর্ষ হয়ে ওঠে এরা। সে সময়ে অজ্ঞতা, আতঙ্ক আর কুসংস্কার–এই সবকটিকেই কাজে লাগাত ওরা। অনেক নিগ্রোর দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, ক্ল্যান্সমেনরা সত্যি সত্যিই সাদা ভূত এবং তাদের অলৌকিক ক্ষমতাও তাই সীমাহীন।
কলেজে পড়ার সময়ে ক্ল্যানদের তৎপরতা সম্বন্ধে আরও অনেক তথ্য আমি পড়েছিলাম। এদের বিচিত্র অনুষ্ঠান-পদ্ধতি যা শুনলে উপকথা বলে মনে হয়, এদের মৃত্যুর শপথ এবং কোনও সভ্যের নাম ফাঁস করে দেওয়ার দুঃসাহস যে দেখায় তার প্রতি পাশবিক দন্ডদানের বিধান–সবই আমি জানতে পারলাম। কশাঘাত এবং লাঞ্ছনার সে এক গা শিউরোনো কাহিনী। গ্র্যান্ড ইম্পিরিয়েল উইজার্ড অ্যান্ড মোগল ইত্যাদি গালভরা নামগুলো শুনলে হাসি পেলেও কিন্তু বাস্তবিকই এদের অস্তিত্ব ছিল। ধর্মগত এবং জাতিগত বিদ্বেষকে জিইয়ে রাখার জন্যে যারা জীবন পণ করেছে, এ নাম ছিল তাদেরই।
তারপর বহু বছর পরের কথা। বড় হয়েছি আমি। দেহ-মনে পরিপূর্ণতা লাভ করেছি এবং অপরাধী সন্ধানী হিসেবে কিছু সুনামও হয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে আমাকে পাঠানো হল একটা কু ক্লক্স ক্ল্যান হত্যার তদন্তে। সমাজের দুষ্ট ব্রণস্বরূপ আমেরিকার রীতিনীতির পরিপন্থী এই গুপ্ত সমিতির কফিনে আরও এটা পেরেক পোঁতার জন্যে আমার সর্বশক্তি বিনিয়োগ করা সংকল্প নিয়ে রওনা হলাম আমি।
১৯৩০ সালের ৭ আগস্ট ইন্ডিয়ানার ম্যারিঅনে পৌঁছোলাম আমি। বিধির কি বিড়ম্বনা। এক সময়ে এই ম্যারিঅনের নামডাক ছিল অন্য কারণে। অবরুদ্ধ দক্ষিণ অঞ্চল থেকে বহু নিগ্রো ক্রীতদাস মাটির তলার রেলপথ দিয়ে সটকান দিয়েছিল এইখান দিয়েই।
ম্যারিঅনের ঘটনাটা আসলে দু-পরিচ্ছেদে ভাগ করা একটিমাত্র কাহিনি–যার শুরু এবং শেষ মাত্র চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে। ফেয়ারমন্ট জায়গাটা খুব কাছেই। ফেয়ারমন্টের একটি খামার থেকে একটি ছেলে তার আঠারো বছরের বান্ধবীর সঙ্গে দেখা করার জন্যে এসেছিল ম্যারিঅনে। ঘটনার শুরু এইখান থেকেই। সিনেমা দেখতে গিয়েছিল দুজনে। তারপর একটা ড্রাগ স্টোরে দাঁড়ায় সোডা খাওয়ার জন্যে। সেখান থেকে দুজনে গাড়ি হাঁকিয়ে যায় মিসিসিনউয়া নদীর দিকে। গাড়ি দাঁড় করানোর পর নদীর ধারে দুজনেই একটু ফুর্তিউচ্ছল হয়ে ওঠে। লক্ষ লক্ষ তরুণ-তরুণীরা এ ধরনের পরিবেশে এসে যেরকম আনন্দে মেতে ওঠে, এ-ও তাই। কিন্তু এ হেন কবিতার ছন্দপতন ঘটল আচম্বিতে আতঙ্ক আর বিভীষিকার এক ঘন কালো মেঘের আবির্ভাবে। আচমকা এক ঝটকায় খুলে গেল গাড়ির দরজা এবং একটা ছায়ামূর্তি, নিগ্রো বলেই মনে হয়েছিল তাকে, একটা রিভলভার তুলে ধরল দুজনের পানে।
