সেই সুরুচির সঙ্গে দেখা হল বিকানীরের প্রান্তে মরুভূমির মধ্যে। সুরুচি দূর থেকে মাথা হেঁট করে আমার দিকেই আসছিল। আমি বিজন প্রান্তরে মানবী দেখে দৌড়ে গিয়েছিলাম। গিয়েই চেনা-চেনা ঠেকেছে। তারার আলোয় সুরুচিও আমার চোখে চোখ রেখেছে। সঙ্গে সঙ্গে আমি চিনেছি। ওই চোখ ভোলবার নয়, সুরুচির সম্বল ছিল শুধু ওই চোখ। শুধু চোখের মধ্যে দিয়ে মনের সব ভাষাও ফোঁটাতে পারত। কথার প্রয়োজন যত না ওর অতলান্ত চাহনিই যা বলবার তা বলত।
সুরুচি সেই চাহনিই মেলে ধরল আমার ওপর। দেখলাম, দুই চোখে গভীর বিষাদ।
আমি সচমকে বললাম–আপনি? সুরুচি দেবী?
হ্যাঁ, নিষ্প্রাণ গলায় বলল সুরুচি। পথ হারিয়েছেন?
সুরুচি চিরকালই কম কথা বলে। সেদিনও বলল। বাকিটুকু আমি হৃদয় দিয়ে অনুভব করলাম। সুরুচি আমাকে সঙ্গ দিতে চাইছে। আমাকে পথ দেখাতে চাইছে। কোনও কথা বললাম না! উত্তর যেন নিষ্প্রয়োজন। সুরুচি যেন মনের কথা মন দিয়ে পড়ে। পাশাপাশি দুজনে হাঁটলাম। মানুষের সঙ্গ যে এত মধুর হতে পারে, সেইদিন সেই প্রথম জানলাম। হে পতি দেবতা, দোষ নিও না! সত্যি কথাই বললাম। তখনকার অনুভূতির কথাই বললাম।
জিগ্যেস করলাম–আর কদ্দূর?
মৃদুস্বরে সুরুচি বলল–আমার বাড়ি কাছেই। আপনার পথেরও শেষ সেইখানে।
আমি কিন্তু আপনাকে বেশি বিরক্ত করতে চাই না।
বিরক্ত হব না। বাড়িতে পঞ্চাশটা শোবার ঘর আছে। ব্যবহার করা হয় মাত্র দুটি। আমি আর স্বামী ছাড়া কেউ থাকে না।
আপনার স্বামী মানে হিজ হাইনেস–
রাজা ভৈরব নামেই ওঁকে সবাই চেনে।
আমি গেলে মনে মনে অসন্তুষ্ট হবেন না তো?
না। আমরা মানুষ ভালোবাসি৷ বলে হাসল সুরুচি। তারার আলোয় ঝিকিমিকি দাঁতের সারি দেখলাম। দেখলাম, চিত্রতারকার জৌলুস এখনও বজায় রেখেছে সুরুচি।
একটা বালিয়াড়ি পেরোতেই একটা প্রাসাদ দেখলাম। বেশ বড়। অন্ধকারে বেশ খানিকটা জমাট অন্ধকার ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। সামনের ফটকে কেরোসিন তেলের বড় বাতি জ্বলছে দেখলাম।
সবিস্ময়ে বললাম-ইলেকট্রিক লাইন এখানে আসেনি?
না, সংক্ষিপ্ত জবাব দিল সুরুচি। একটু থেমে বলল–উনি পছন্দ করেন না।
বাড়ির মধ্যে ঢুকে রাজা ভৈরবের পছন্দের আরও নমুনা দেখলাম। বড় বড় শামাদানে জ্বলছে বিস্তর মোমবাতি। কোথাও কেরোসিনের প্রদীপ। বিশাল বড় লণ্ঠনগুলো ঝুলছে–কিন্তু বাতি জ্বলছে না।
ঘরের পর ঘরে গালিচা আর অয়েল পেইন্টিং, পাথরের মূর্তি আর ইস্পাতের হাতিয়ারের সমাবেশ।
একতলায় খাবার ঘরে আমি বসলাম। একসঙ্গে বারো মোমবাতির আলোয় শিশমহলের মতো ঝলমল করতে লাগল ঘরটা। ভালো ভালো খাবার সাজিয়ে দিল সুরুচি। এত অল্প সময়ে এত সুখাদ্যের আয়োজন দেখে অবাক হলাম।
ঘরের এককোণে বড় ডিভান পাতা ছিল। আমি সেখানে বসলাম। সুরুচি বলল–আমি যাচ্ছি। বলে পাশের ঘরে গেল। ফিরে এল একটা ট্রে নিয়ে। রূপোর ট্রে। দু-গেলাস গরম দুধ আর দু-পাত্র সোনালি মদিরা নিয়ে ওপরে চলে গেল।
আমি ডিভানে গা এলিয়ে দিলাম। শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম, শূন্য পুরীর শূন্যতা কেন? রাজা আর রানী ছাড়া প্রাসাদে আর কেউ নেই কেন? দাসদাসী ছাড়া প্রাসাদ কি মানায়? এ কেমনতর রাজ পরিবার? ভাবতে-ভাবতে ঘুমিয়ে পড়লাম।
হঠাৎ উঠে বসলাম আমি। জানলা দিয়ে দেখলাম চাঁদের আলো মেঝেতে পড়েছে। আর দেখলাম ধোঁয়া ঢুকছে। পটপট শব্দ হচ্ছে।
ধড়মড়িয়ে জানলায় গিয়ে দাঁড়ালাম। আগুনের লাল আভা দেখে চমকে উঠলাম। দোতলায় আগুন লেগেছে। সিঁড়ির দিকে দৌড়ে গেলাম। উঠতে পারলাম না। সিঁড়িতে আগুন ও ধোঁয়া দুর্ভেদ্য বেড়াজালের সৃষ্টি করেছে।
বৃথাই চেষ্টা করলাম। সুরুচি দেবীর নাম ধরে ডাকলাম। কারও সাড়া না পেয়ে দৌড়ে বাইরে চলে এলাম। ঊধ্বশ্বাসে দৌড়োতে লাগলাম। আশ্চর্য এবার কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই যোধপুর-বিকানীর সড়ক দেখতে পেলাম। চাঁদের আলোয় দৌড়োতে দৌড়োতে কতক্ষণ পরে যে বিকানীর পৌঁছলাম–তা বলতে পারব না। স্টেশনের সামনে চৌকিদারের কাছে হাঁপাতে হাঁপাতে আগুন লাগার খবর দিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলাম।
জ্ঞান ফিরে আসতে দেখলাম হাসপাতালে শুয়ে আছি। মাথার কাছে ডাক্তার দাঁড়িয়ে। ঘরে আর কেউ নেই।
চোখ মেলতেই ডাক্তার বলল–কী হয়েছিল?
আমি বললাম কী হয়েছিল। জিগ্যেস করলাম আগুন নেভাতে দমকল গেছে কিনা। ডাক্তার হাসল। বলল–মরুভূমিতে আগুন লাগলে আর নেভে না। তা ছাড়া এখানে দমকল কোথায়?
তাহলে? সব পুড়ে যাবে যে?
পুড়ে গেছে। পাঁচ বছর আগেই পুড়ে গেছে।
সে আবার কি কথা?
আপনি যে বাড়িতে গিয়েছিলেন, সে বাড়িতে এখন আর কেউ থাকে না। পাঁচ বছর আগে সেখানে থাকত রাজা ভৈরব আর রানী সুরুচি। রাজা ছিল বিকৃত মস্তিষ্ক এবং খেয়ালী। রানীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল। তাই একদিন রাজাকে মেরে রাজ সম্পত্তি হাতানোর প্ল্যান করে।
আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে লাগলাম।
ডাক্তার বলল–একদিন রাত্রে দু-গেলাস গরম দুধ আর মদ নিয়ে রাজার কাছে গেল রানী। খুব যত্ন করে রাজাকে খাওয়াতে গেল। রাজার সন্দেহ হল! কেন না, যত্ন করে কিছু করা রানীর কুষ্ঠিতে লেখেনি। দাস-দাসী না থাকায় সুরুচি দেবী খুবই অশান্তিতে ছিলেন। তাই সুরার সঙ্গে দুধ দেখে রাজার সন্দেহ হয়। রানী দুধ নিয়ে গিয়েছিল বিষের গন্ধ ঢাকবে বলে। পেস্তাবাদাম মেশানো দুধ নিয়ে হঠাৎ খাতিরের বহর দেখে অপ্রকৃতিস্থ রাজার খটকা লাগল।
