গ্রেপ্তার এবং অপরাধী সাব্যস্ত হওয়ার কয়েক মাস পরে একদিন খুব ভোরে তাকে হিড়হিড় করে টেনে আনা হল ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে। ককিয়ে কাঁদতে কাঁদতে অনুনয় বিনয় করতে লাগল সে। তার পরেই একসঙ্গে গর্জে উঠল রাইফেলগুলো এবং চিরকালের মতো নির্বাক হয়ে গেল এযুগের সবচেয়ে কুখ্যাত মেয়ে-খুনে কাউন্ট সিজারে সারভিয়াত্তি।
* কম্যান্ডাটোর যুসেপেপদোসা (রোম ইতালি) রচিত কাহিনি অবলম্বনে।
মোমের আগুন
আমার বউ নন্দিনী ফ্যামিলি প্ল্যানিং প্রচারক। প্রচারক শব্দের স্ত্রীলিঙ্গ আমার জানা নেই। নন্দিনীর কাজ হল গ্রামে গ্রামে শহরে শহরে টো টো করা। আর দুটি বা তিনটি সন্তান, সুখী ইনসান–এই সরকারি বাণী প্রচার করা। কিছুদিন আগে রাজস্থান সরকারের কাছ থেকে নন্দিনী আমন্ত্রণ পেল–জয়পুরে ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেমিনার হচ্ছে। সব প্রদেশ থেকেই অভ্যাগতরা আসছেন। নন্দিনীর আসা চাই। নন্দিনী রাজি হয়ে গেল।
আমি গেলাম না ছুটি পেলাম না বলে। নন্দিনী সহকর্মীদের সঙ্গে গেল রাজপুতদের দেশে। পরে চিঠি পেলাম। সেমিনার নামক প্রহসন শেষ হয়েছে। ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের বাজেট খসিয়ে ওরা এখন রাজপুতানা দেখতে বেরিয়েছে। তার পরেই একটি চিঠি এল বিকানীর থেকে। নন্দিনী লিখছে?
প্রিয়তম স্বামী আমার,
তুমি তো জান, ভূত দেখতে আমি ভালোবাসি। ভালোবাসি বলেই ভূতরা আমায় দেখা দেয় না। নিরুপায় হয়ে এর ভূতের গল্প পড়ি। সম্প্রতি এমন একটা ঘটনা আমার জীবনে ঘটল যা আমার ভূতদর্শনের সাধ জন্মের মতো মিলিয়ে দিয়েছে। আমার ধাত ছেড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।
সেমিনার করতে এসে সবারই দেখি ফুর্তির প্রাণ গড়ের মাঠ। সরকারি পয়সা ফুট কড়াই হচ্ছে হোক, পো-পোয়াতীর ভাবনা সোয়ামীরা ভাবুক–আমরা ঘুরি দেশ। এই মন্ত্র সম্বল করে আমরা তো জয়পুর থেকে আজমীর হয়ে চিতোরগড়ে এলাম। তারপর উদয়পুর, মাউন্ট আবু ঘুরে গেলাম যোধপুর। সবশেষে বিকানীরে। মরুভূমির দেশ বিকানীর। এখানে এসেই আমার স্নায়ু জখম হবার উপক্রম হয়েছে। বেলা তিনটে নাগাদ একাই মরুভূমির দিকে গিয়েছিলাম। আমার সৃষ্টিছাড়া খেয়ালের সঙ্গে কারো মেজাজ খাপ খায় না। আমি ভালবাসি মরুভূমি, কাঁটাঝোঁপ, জঙ্গল আর ভাঙা কেল্লা। ওরা ভালোবাসে প্রাসাদ আর সরোবর। বাগিচা আর ফোয়ারা। আমি চাই রুক্ষ, ধূসর, পরিত্যক্ত অঞ্চল। যেখানে মানুষ যেতে ভয় পায়। যেখানকার ধূ-ধূ শূন্যতা বুক কাঁপায়। যেখানকার ভয়াল বন্যতা রক্ত হিম করে দেয়। আমার এই বাউণ্ডুলে বিদঘুঁটে মেজাজের সঙ্গে তুমি পরিচিত।
বিকানীর থেকে একটা উটের পিঠে চেপে মরুভূমির কিনারায় তাই একাই এলাম। উট ছেড়ে দিলাম। ঠিক করলাম, একা-একা মরুভূমির সূর্যাস্ত দেখব। কঁকড়ার গর্ত দেখব, বালির কান্না শুনব। তারপর ফিরে এসে যোধপুর বিকানীর সড়ক ধরে যে-কোনও গাড়িতে চেপে শহরে আসব।
উট থপথপ করে বিদেয় হতেই আমি বালিয়াড়ি পেরিয়ে এগিয়ে চললাম। ছোট ছোট বালির পাহাড় ডিঙোনোর মধ্যে সে যে কি আনন্দ, হে পতি দেবতা, তা তোমায় বোঝাতে পারব না। সে এক আশ্চর্য শিহরন। পায়ের নীচে বালি সরে যাচ্ছে। চড়াইতে উঠতে গিয়ে মাঝে মাঝে হুমড়ি খাচ্ছি কিন্তু তার মধ্যেই যে রোমাঞ্চ, যে পুলক, যে মুক্তির উল্লাস–তা শুধু উপলব্ধির বিষয়। কী ভাবছ? স্নায়ু সত্যিই জখম হয়েছে? পাগল হয়েছি? আজ্ঞে না মশাই–।
বালির পাহাড় ডিঙোতে ডিঙোতে হঠাৎ একটা পরিত্যক্ত গাঁয়ে পৌঁছোলাম। মরুভূমির গ্রাম। বুঝতেই পারছ অবস্থাটা। খান কয়েক কাঠামো আর ভাঙাচোরা ইটের গাঁথনি ছাড়া আর কিছু চোখে পড়ল না। একটা কেল্লার ধ্বংসস্তূপ দেখলাম। সূর্যের পড়ন্ত আলোয় ভাঙা পাথরের বুকে যেন আর এক চিরে দেখলাম। শৌর্য, বীর্যের ইতিহাস যেন মূর্ত হয়ে উঠল।
হেঁটে হেঁটে পা ব্যথা হয়ে গিয়েছিল। ভাঙা পাঁচিলের আড়ালে ছায়ায় বসলাম। ঝোলা থেকে রুটি মাখন আর ডিম বার করলাম। খেয়ে দেয়ে সামান্য ঝিমুনি এসেছিল। মুক্ত পরিবেশে মনটাও নির্মেঘ হয়ে গিয়েছিল। আচমকা চোখ খুলে দেখলাম গোধুলির আলোয় আকাশ রাঙা হয়ে গিয়েছে।
এবার ফেরা দরকার। যে দিক দিয়ে এসেছিলাম, সেই দিকেই পা বাড়ালাম। দিব্বি কিছু দূর গেলাম। ইতিমধ্যে আলো আরও নিভে এল। বালির ওপর পায়ের ছাপ দেখে দেখে হাঁটছিলাম। অন্ধকার গাঢ় হতে সে ছাপও আর দেখতে পেলাম না। তারপর বুঝলাম, আমি পথ হারিয়েছি।
উঁচু উঁচু বালিয়াড়ির মধ্যে আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম। চারপাশে জমাট অন্ধকারের মতো বালির পাহাড় আমার ওপর ঝুঁকে রইল। ভয় ডর আমার বড় একটা নেই। কিন্তু সেদিন আমি অস্বস্তি অনুভব করলাম। তাছাড়া চারদিক এমন নিথর নিস্তব্ধ যে মাথার মধ্যে যেন মহাশূন্যের শূন্যতা অনুভব করলাম। সে এক বিচিত্র অনুভূতি।
ঠিক এই সময়ে দেখা হল সুরুচির সঙ্গে। সুরুচিকে তোমার মনে পড়ে?
দশ বছর আগে ধূমকেতুর মতো ছায়াছবি মহলে যে মধ্য গগনে উঠে গিয়েছিল। সুরুচির মতো প্রতিশ্রুতিময়ী চিত্রতারকা সিনেমা লাইনে বড় একটা দেখা যায়নি। প্রতিটি ছবি হিট করার পর অকস্মাৎ সুরুচি রূপোলি দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিল। কারণ সেই চিরন্তন। কোনও এক হিজ হাইনেস মহারাজা নাকি সুরুচির পাণিপীড়ন করে এবং সুরুচি তখন মহারাজার কণ্ঠলগ্না হয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়।
