বটে, তাহলে এই ব্যাপার। মাস কয়েক মুহূর্ত আগেও আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, কুখ্যাত খুনেটার কোমরে বেড়ি পরানোর সম্মান এবার লা স্পেজিয়ার পুলিশ-মহলই পাবে। কিন্তু রোম তা ছিনিয়ে নিয়ে গেল একদিন আগে এসে।
কেসটা নিয়ে আলোচনা হল কমিশনার এরিকো আর আমার মধ্যে। শুনলাম খুনেটার হদিশ বার করার জন্যে তারা নাকি সম্পূর্ণ অন্য ধরনের একেবারে নিজস্ব একটা পদ্ধতিমাফিক তল্লাসি পর্ব চালিয়েছিলেন। তদন্ত পর্বের প্রথম দিকেই একজন রোম গোয়েন্দা বলেছিলেন পাত্র-পাত্রী বিজ্ঞাপন থেকে হয়তো সূত্র পাওয়া যেতে পারে। তৎক্ষণাৎ বিভিন্ন দৈনিকের ফাইল ঘাঁটা শুরু হল। অনেক পরিশ্রমের পর সম্ভাবনাময় কয়েকটা পয়েন্টও পাওয়া গেল।
এরপর গোয়েন্দারা তৎপর হয়ে উঠল কয়েকটা লোককে নিয়ে। এরা প্রত্যেকেই মনোমত গিন্নি লাভের আশায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিল কাগজে। এদের প্রত্যেকের গতিবিধি আর চরিত্র নিয়ে জোর গবেষণা চলল কিছুদিন। কিন্তু বৃথাই। এমন একটি লোককেও পাওয়া গেল না যার ওপর টেনেটুনে এতটুকু সন্দেহের ছায়া ফেলা যায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত একজন নাছোড়বান্দা টিকটিকির নজরে পড়ল বহু পুরোনো একটা বিজ্ঞাপন। লা স্পেজিয়া শহরের এক অজ্ঞাতনামা পুরুষ বিবাহের আমন্ত্রণ জানিয়েছে বিজ্ঞাপনে। বিজ্ঞাপন-বার্তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু শহরের নামটি। খবরটা এইরকম ।
সম্ভ্রান্ত পুরুষ, বিত্তবান, যুবাপুরুষ নয়, কিন্তু উদার এবং কোমল স্বভাব, পারিবারিক বন্ধনবিহীন তরুণী, কন্যার সঙ্গে বিবাহের জন্যে পত্রালাপ করতে ইচ্ছুক।
রোম-পুলিশ এই বিজ্ঞাপনের সঙ্গে একটি উধাও-হওয়া মেয়ের যোগসূত্র বার করে ফেললে। মেয়েটির বয়স বছর তিরিশ। একটা বাড়ির সাংসারিক কাজকর্ম দেখাশুনো করত সে। নভেম্বরের গোড়ার দিকে ভোজবাজির মতো মিলিয়ে যায় সে। অন্নদাতাদের কাছে অবশ্য সে খোলাখুলি বলে গিয়েছিল তার গন্তব্য শহরের নামটা। সে নাকি পাত্র-পাত্রী বিজ্ঞাপনের উত্তর দিয়েছিল এবং তার ভবিষ্যৎ স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাৎকারের বন্দোবস্ত হয়েছে লা স্পেজিয়া শহরে। এরপর থেকে তার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। পুলিশ আরও জানাল, মেয়েটির বাঁ-পা খোঁড়া ছিল, পা টেনে টেনে চলতে হত তাকে। আর ঠিক এই শারীরিক বিকৃতিটুকুই নিহত মেয়েটির লাশ পরীক্ষা করতে গিয়ে ডাক্তারদের নজরে পড়েছিল।
লা স্পেজিয়া শহরে উদার এবং কোমলস্বভাব সম্ভ্রান্ত পুরুষটির হদিশ বার করা এমন কিছু কঠিন কাজ নয়। তৎক্ষণাৎ রোম থেকে গোয়েন্দাদের পাঠানো হল এ শহরে–লীলাখেলা যে সাঙ্গ হয়েছে এ খবর জানার আগেই তাকে গ্রেপ্তার করা দরকার। কমিশনার এরিকো যখন তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে এসে পৌঁছোলেন, তখন সবেমাত্র রোম অভিমুখে রওনা হয়েছে কাউন্ট সিজারে সারভিয়াত্তি। রোমের একটা হোটেলে পাওয়া গেল তাকে। ভদ্রলোককে হাজতে পুরে তারা ফিরে এলেন লা স্পেজিয়াতে। এলেন সেই ঘরটিতে যে ঘরটি সারভিয়াত্তি ভাড়া নিয়েছিল বিজ্ঞাপনের টোপ গিলে আসা হতভাগিনী মেয়েগুলোকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে।
আগেই বলেছি, খুনে বদমাশটার বদলে কমিশনারকে গ্রেপ্তার করতে উদ্যত হয়েছিলাম–এ তথ্য জানার পর রীতিমতো খিঁচড়ে গিয়েছিল আমার মনমেজাজ। কিন্তু তবুও একদিক দিয়ে আমার ওই তিক্ত মেজাজে সন্তোষের বারি সিঞ্চন হয়েছিল। বেশির ভাগ সাক্ষ্য প্রমাণ জুগিয়েছিলাম আমিই এবং এই সাক্ষ্য-প্রমাণের বলেই চরম দণ্ড নেমে এসেছিল সারভিয়াত্তির শিরে। আমি আরও প্রমাণ করে দিয়েছিলাম যে পাওলিনা গোরিয়াত্তিই হচ্ছে সারভিয়াত্তির সর্বশেষ শিকার। রোমের যে মেয়েটি সংসারের কাজকর্ম দেখাশুনো করার কাজ ছেড়ে একদিন নিপাত্তা হয়ে গিয়েছিল, পাওলিনা গোরিয়াত্তি তারই নাম। বিবাহের প্রতিশ্রুতির প্রলোভন দিয়ে আসার পর যে-কটি মেয়েকে যমালয়ে পাঠানো হয়েছে, এ হচ্ছে তাদের সর্বশেষ। প্রতিটি মেয়ে আসবার সময়ে সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ নিয়ে এসেছে এবং তাকে খুন করা হয়েছে এই কাঞ্চন লোভেই। তারপর দেহটাকে কেটে টুকরো করে পাচার করা হয়েছে নানাদিকে।
কাহিনির উপসংহারে এসে বিলক্ষণ বিরাগ সত্ত্বেও আর একটি নাম মনে পড়ছে। বেল গিনেস একটি অসুন্দর আমেরিকান মহিলার নাম। বিয়ের লোভ দেখিয়ে টাকাকড়িসমেত পুরুষদের ভুলিয়ে আনত সে নিজের খামার বাড়িতে। তারপর যথাসময়ে তাদের খুন করে দেহগুলি থোড়কুচি করত। এবং এই থোড়াকুচি পর্বটি যে কাঠের ব্লকটির ওপর হতো, তার ওপরেই জবাই করা শুয়োর কেটে কুচিকুচি করত বেল গিনেস। এই একই নারকীয় ব্যবসায় হাত পাকিয়েছিল কাউন্ট সারভিয়াত্তি। একটা অপরিচ্ছন্ন হোটেল মালিক ছিল ভদ্রলোক। সেখানে হানা দিতেই আরও দুই হতভাগিনীর দেহাবশেষ পেয়েছিলাম আমি।
তাদের একজনের নাম বিসে মারগারুচ্চি। স্থানীয় দাঁতের ডাক্তার তার দাঁতের চিকিৎসা করেছিলেন একবার এবং তারও রেকর্ডও রেখেছিলেন তিনি। তাই মেয়েটির দাঁত দেখেই তাকে সনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল ডাক্তারের পক্ষে।
ইটালিতে আজকাল আর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় না বটে, কিন্তু যে সময়ের কাহিনি লিখলাম সে সময়ে মুসোলিনী কয়েকটি অপরাধের শাস্তি এইভাবেই দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কাউন্ট সারভিয়াত্তিও রেহাই পেল না এই হুকুমনামা থেকে।
