ছুরিটা সম্পর্কেই ভাবছিলাম। ভাবছিলাম কী কী কাজে দরকার হতে পারে ছুরিটার। আর তার পরেই আচমকা ছিলে-ছেঁড়া ধনুকের মতো লাফিয়ে দাঁড়িয়ে উঠলাম আমি। তারস্বরে হুকুম দিয়ে ডাকিয়ে আনলাম আমার এক সহকারীকে এবং দুজনে মিলে তৎক্ষণাৎ গাড়ি হাঁকালাম হারানো প্রাপ্তি অফিসের দিকে। ছুরিটাকে নিয়ে রাখলাম আমাদের জিম্মায়। পুলিশ ল্যাবরেটরির রিপোর্ট থেকে জানা গেল ফলার ওপর যে দাগগুলো পাওয়া গেছে, আসলে তা মানুষের রক্ত ছাড়া আর কিছু নয়। অর্থাৎ পায়ের কাজ আরও কিছুটা বাড়লো। শহরে যে-কটা জিনিসপত্রের, কাঁচের বাসনপত্রের আর স্টেশনারি দোকান ছিল, সবকটার মালিক আর কর্মচারীদের প্রশ্নে প্রশ্নে বিপর্যস্ত করে ফেললাম। শেষকালে যে প্রমাণের জন্যে এত পরিশ্রম, তা পাওয়া গেল। একজন সেলসম্যানের মনে পড়ল ওই রকম আকারের একটা ছুরি একদিন সে বিক্রি করেছিল হৃষ্টপুষ্ট চেহারার মাঝবয়সি ছুঁচালো গোঁফওয়ালা এক ভদ্রলোকের কাছে। রোম এক্সপ্রেসে লোকটার যেরকম বর্ণনা পাওয়া গিয়েছিল, সেলসম্যানের বর্ণনার সঙ্গে হুবহু মিলে গেল । আবিষ্কার শুধু এই একটাই নয়। কেননা কয়েকটা বাড়ি পরেই আরও একটা দোকান দেখলাম আমরা। এই দোকান থেকেই আমাদের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গোঁফওয়ালা বন্ধুটি কিনেছিলেন তিন-তিনটে আঁশের তৈরি সুটকেস।
খুনে বদমাশটাকে যে এই লা স্পেজিয়াতেই পাওয়া যাবে, এ বিষয়ে আর তিলমাত্র সন্দেহ রইল না আমাদের মনে। এ কাজে যে ধরনের গোয়েন্দাদের দরকার, তাদের প্রতিজনকে পাঠিয়ে দিলাম আমি বাড়ি বাড়ি তল্লাসির হুকুম দিয়ে। একটা বাড়িও বাদ গেল না। তারপর শুধু একটা বিশেষ অঞ্চলে সঙ্কীর্ণ করে আনলাম এই চিরুনি দিয়ে আঁচড়ানো তদন্ত-পর্ব। এবং শেষ পর্যন্ত তা সীমিত হয়ে এল একটি মাত্র বিশেষ রাস্তায়।
খুনটা আবিষ্কার হওয়ার ঠিক একমাস পরে ১৯৩২ সালের ১৫ই ডিসেম্বর আমি নিশ্চিন্ত হলাম। নিশ্চিন্ত হলাম এবার ঠিক কোন কোন জায়গাটিতে অভিযান চালাতে হবে, সে সম্পর্কে। জানলাম, লা স্পেজিয়ার দরিদ্রতম অঞ্চলের পাথর দিয়ে বাঁধানো এবড়োখেবড়ো সঙ্গীর্ণ রাস্তা ভায়া ডেনোভার একটা শ্রীহীন বাড়ির পাঁচ তলায় উঠে এবার তৎপর হতে হবে আমাদের। সেইদিনই দুজন গোয়েন্দাকে নজর রাখতে বলেছিলাম বাড়িটার ওপর। তারা খবর পাঠালে, সারাদিনের মধ্যে বাড়ি ছেড়ে কেউ বাইরে আসেনি। স্থির করলাম, আর নয়, এবার ঢুকে পড়া যাক।
পিস্তল বাগিয়ে অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে কাঁচকেঁচে সিঁড়ি বেরিয়ে ওপরে ওঠার সময়ে দারুণ উত্তেজনায় কি প্রচণ্ড শব্দে ধ করেছিল হৃদযন্ত্রটা, তা আজও আমার মনে আছে। শুধু এই মুহূর্তটির জন্যে কি প্রচণ্ড খাটুনিটাই না গেছে ডিপার্টমেন্টের প্রত্যেকের। এসেছে সেই মুহূর্ত–পরিশ্রমের ফল হাতের মুঠোর মধ্যে এসে গেল প্রায়। পাঁচতলায় পৌঁছনোর পর আমার পিছু পিছু এল একজন গোয়েন্দা। দেখলাম, করিডরের দুটো দরজার মধ্যে একটা সামান্য খোলা রয়েছে। পা টিপে টিপে ভেতরে ঢুকে দেখলাম ঘরটাকে রান্নাঘরই বলা উচিত। ঘরে ঢোকামাত্র যে জিনিসটা সবার আগে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল, তা হচ্ছে একটি বালতি। দেওয়ালের পাশেই বসানো ছিল বালতিটা। বালতিটার কিনারা পর্যন্ত উঁচু হয়েছিল কাঠের কুচো–যে ধরনের কুচো দিয়ে প্যাক করা হয়েছিল লাশটার মুন্ডুটা–হুঁবহু সেই রকমই।
রান্নাঘরের ভেতরের দরজা দিয়ে যাওয়া যায় আর একটি ঘরে। দরজাটা খুলে ভেতরে ঢুকলাম আমি। ঘরটা পুরোনো কিন্তু জমকালো আসবাবপত্রে একদম ঠাসা। দুজন পুরুষ আমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়েছিল। বিদ্যুৎবেগে ঘুরে দাঁড়িয়েই আমার হাতে পিস্তল দেখামাত্র নিমেষের মধ্যে তারা হাত বাড়িয়ে দিলে নিজের নিজের পকেটের দিকে।
হুঁশিয়ার করে দিই আমি–নড়বেন না। নড়লেই গুলি চালাব।
মাথার ওপর হাত তুলে দেয় দুজনে। একজন বললেন–আমাদের পরিচয়টা দেওয়া দরকার। আমি হলাম রোম ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের কমিশনার এরিকো। আর ইনি আমার অ্যাসিস্ট্যান্ট, সিগনর মুস্কো।
পরিচয় শোনার পর আমার রসনায় আর কোনও কথাই ফুটল না। মাথার মধ্যে রাগ, অপমান, হতাশার তুমুল দাপাদাপির চাইতেও হতভম্ব হয়েছিলাম সবচাইতে বেশি। তার কারণও ছিল যথেষ্ট। বুদ্ধিকৌশল দক্ষতার প্রতিযোগিতায় আমারই এক্তিয়ার শহরে বসে টেক্কা মারা হল আমার ওপর। শুধু তাই নয়। যে দুই আইন রক্ষক অফিসার এইভাবে আমার গালে চুনকালি লেপে দিলেন, সমস্ত তদন্তপর্বটা তারা পরিচালনা করেছেন ২৫০ মাইল দূরে বসে। তারপর লা স্পেজিয়াতে এসেছেন তাঁদের পরিকল্পনার এতটুকু আভাস কাউকে না জানিয়ে।
কাউন্ট সিজারে সারভিয়াত্তি কোথায়? এ বাড়িতে যার বাস এবং যাকে গ্রেপ্তার করার জন্যেই আমাদের আগমন, তাকে রেখেছেন কোথায়?–শুধোলাম আমি।
খরখরে চোখে আমার দিকে তাকালেন কমিশনার এরিকো। জবাব দিলেন–আপনি লা স্পেজিয়ার ডোসি। আমার বোঝা উচিত ছিল।
এবার হতভম্ব হয়ে তাকানোর পালা তার। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে তারপর উত্তর দিলেন আমার প্রশ্নের–টুকরো টুকরো করে কাটা মেয়েটার হত্যাকারী হিসাবে আমরাও তাকে সনাক্ত করেছিলাম। গতকাল সারভিয়াত্তিকে গ্রেপ্তার করেছি আমরা। এখন সে রয়েছে রোমের রেজিনা কোয়েলি জেলখানায়।
