নরম-গরম জলের শাওয়ারটা খুলে দিয়ে গলা ছেড়ে গান গাইছে, এসেছি, একা যাইব একলা, কেউ তো সঙ্গে যাবে না, হাত থেকে সড়াৎ করে পিছলে গেল সাবানটা। হেঁট হয়ে মেঝে থেকে কুড়িয়ে নিতে গিয়ে হামাগুড়ি দিয়েছে সবে, এমন সময়ে…
শাওয়ারের ঠিক পাশেই গ্লেজড টালি উড়ে গেল পরপর তিনটে। খান-খান হয়ে এসে পড়ল গজাননের মাথাতেই খটাং খট করে।
তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে ঘাড় বেঁকিয়ে তাকিয়েছিল গজানন। টালির জায়গায় তিনটে গর্ত দেখেই চোখ কপালে উঠে গেছিল ক্ষণেকের জন্যে। তারপরই চোখ ঘুরিয়ে দেখলে স্নানকক্ষের প্রবেশ পথের দামি পরদাটাতেও তিনটে ছাদা পাশাপাশি। তখনও ধোঁয়ার সুতো বেরোচ্ছে পরদা থেকে।
অল্পের জন্যে বেঁচে গেছে গজানন–শুধু ওই হড়কে যাওয়া সাবানটার জন্যে। পরদা ফুটো করে টালি উড়িয়ে দেওয়ার পথেই তো ছিল গজাননের প্রিয় নিরেট মাথাটা। এতক্ষণে তারও উড়ে যাওয়ার কথা।
অতএব দিগম্বর গজানন আরও একটু সরে গেল কলতলার বাথটবের দিকে। নজর পরদার দিকে। পরদা দুলে উঠল। প্রথমে দেখা গেল একটা বিদঘুঁটে অস্ত্র। পেটমোটা রিভলভার। জন্মে এমন রিভলভার দেখেনি গজানন।
রিভলভার ধরে যে লোকটি ঢুকল ঘরের মধ্যে, তাকে যেন চেনা-চেনা মনে হচ্ছে। চোখে তার বাঘের চাহনি, পা ফেলার ভঙ্গিমাও বাঘের মতো। লাফ দেয় আর কী!
লোকটা দেখে ফেলেছে শাওয়ারের নিচে প্রত্যাশিত বস্তুটা নেই; অর্থাৎ গজাননের কবন্ধ দেহ নেই। চকিতে বিদঘুঁটে রিভলভার বাগিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে যাচ্ছে, তার আগেই যেন বাজ ভেঙে পড়ল মাথায়।
গজানন, ন্যাংটা গজানন, এখন ফুল ফর্মে। ক্যারাটে গুরু কি বৃথা মার শিখিয়েছেন? বোধহয় আলোর চেয়ে বেশি গতিবেগে দিশি গাঁট্টা মেরেছে গুপ্তঘাতকের মাথায়। ক্যারাটের মশলা মিশোনো গাঁট্টা তো–এক মারেই চোখে সর্ষে ফুল দেখতে-দেখতে বাথটবের মধ্যে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে বদমাশটা। গরম জলের কলটা খুলে দিল গজানন। মুখে ফোঁসকা পড়ুক আগে-পরে আরও পেটানো যাবে।
আগে দেখা যাক বিদঘুঁটে অস্ত্রটা। গাঁট্টার চোটে হাতিয়ার ঠিকরে গেছে কলতলার বাইরে ঘরের কার্পেটে। হেঁট হয়ে পাশে বসল গজানন। কার্পেট পুড়ছে কেন? আশ্চর্য আগ্নেয়াস্ত্রের পেটটা দেখে মনে হচ্ছে যেন গভীর জলের মাছ জেলের জালে পড়ে উঠে এসে পড়ে আছে সমুদ্রের বালির ওপর হাওয়া ঢুকে পেটটা ফুলেই চলেছে। একটু যেন লালও হয়ে উঠেছে। গনগনে আভা ছাড়ছে। কার্পেট পুড়ছে সেই কারণেই।
সভয়ে চেয়ে রইল গজানন। ফাটবে নাকি? কিন্তু একটু আগেই তো এই অস্ত্র ধরেই আততায়ী তার মাথা ওড়াতে গেছিল। নলচেটা বেঁটে, কিন্তু বেশ ফঁদালো। রিভলভার এরকম হয় নাকি? জল-পিস্তল বলেই তো মনে হচ্ছে। দোল খেলার সময়ে পিচকিরির মতো জল ছুঁড়ে দেওয়ার খেলনা।
কিন্তু এ খেলনার মুখ থেকে বেরোয় সাক্ষাৎ মৃত্যু। এ আবার কী ধরনের মারণাস্ত্র?
বিমূঢ় গজাননের চোখের সামনেই বিচিত্র মারণাস্ত্রের উদর আরও একটু স্ফীত হল। গগনে আভা আরও একটু প্রকট হল। কোনও ধাতু যে এভাবে রবারের মতো ফুলতে পারে, তা তো জানা ছিল না গজাননের।
হঠাৎ গজাননের গজ-মস্তিষ্কের কোষগুলোয় কী সঙ্কেত বিনিময় ঘটল, তা দেবা না জানন্তি। মৃত্যুকে সামনে দেখলেই বরাবরই ও এমনিভাবে হাত বাড়িয়ে মৃত্যুকে কাঁক করে ধরতে যায়।
চ্যাপটা হাতল ধরে মারণাস্ত্রটা তুলে দূরের খাটের দিকে তাগ করল গজানন।
সঙ্গে-সঙ্গে একটা জার্ক লাগল হাতে। প্রচণ্ড আঁকুনি। কিন্তু হাত স্টেডি রইল। কানে ভেসে এল একটা বিস্ফোরণের শব্দ।
খাটের ওদিকের স্টিল আলমারিটা বিস্ফোরিত হয়েছে। বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে যে বস্তুটি তা খাটের গদির এদিক থেকে ঢুকে ওদিক দিয়ে বেরিয়েছে।
কী ভয়ানক শক্তি অদৃশ্য বিস্ফোরকের। মাখনের মতো গদি ফুটো করে বেরিয়ে গিয়ে শক্ত আলমারিতে আছড়ে পড়তেই ফাটিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে আলমারি।
হাতের মারণাস্ত্রের দিকে তাকিয়ে থ হয়ে গেল গজানন। পেটের ফুলোটা হঠাৎ এত কমে গেল কী করে? গনগনে আভাটাও আর নেই।
ভয়ে-ভয়ে আজব অস্ত্রকে কার্পেটে নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়াল গজানন। যার হাতে এই অস্ত্র একটু আগে শোভা পেয়েছে সেই ব্যাটাচ্ছেলেকে মনের সুখে এবার ধোলাই দেওয়া যাক।
কলতলার দিকে ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল পরদা সরিয়ে বিহ্বল দৃষ্টি মেলে দাঁড়িয়ে ঘাতক মহাশয়। বিস্ফারিত চক্ষু যুগল নিবদ্ধ কার্পেটের ওপর রাখা বিটকেল অস্ত্রটার দিকে। একটু আগে আলমারি বিস্ফোরণের শব্দ শুনে এবং গরম জলের ছ্যাকা খেয়ে নিশ্চয় সম্বিৎ ফিরে পেয়েছে।
এখন আবার সম্বিৎ হারাবে নাকি? ওরকম আতঙ্কঘন চোখে চেয়ে আছে কেন পেটমোটা দানব অস্ত্রর দিকে?
গজানন যখন এই প্রশ্নটা মাথার মধ্যে এনে মন্থরগতিতে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সুযোগে লোকটা সোজা ডাইভ মারল মারণাস্ত্রের দিকে।
নিমেষে গজানন ফিরে এল গজাননের মধ্যে। বাঁ-পায়ের শট ওর চিরকালই প্রচণ্ড। ঘাতক প্রভু যখন মেঝের ছইঞ্চি ওপর দিয়ে ধেয়ে যাচ্ছে মারণাস্ত্রের দিকে ঠিক তখনি পাশ থেকে বাঁ পায়ে পেনাল্টি কিক করল গজানন–লোকটার পেটে।
কোঁক-ধড়াম–ধুম। পুরো বপুটা নিক্ষিপ্ত হল শূন্য পথে। খাটের ওপর দিয়ে ছিটকে পড়ল জানলার সামনে।
মারণাস্ত্র পাকড়ে ধরে সেইদিকেই তাক করল গজানন। অমনি নরকের বিভীষিকা যেন ফেটে পড়ল খুনে লোকটার চোখেমুখে।
