অপরাধ সম্পর্কীয় যে-কোনও তদন্তে পুলিশি তৎপরতা যদি সর্বত্র ছড়িয়ে থাকত তাহলে অবিশ্বাস্যরকমের মসৃণগতিতে অব্যাহত থাকত, চালু থাকত পুলিশ মেশিনের অপরাধসমাধান পর্ব। কিন্তু তা যখন নয়, ব্যাপক, সুষ্ঠু আর নিখুঁত পুলিশি তৎপরতার যেখানে অভাব সে ক্ষেত্রে বুঝে নিতে হবে যে গোয়েন্দাদের সাফল্যের পরিমাপ সাধারণত এই কটি অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হয়? অসীম সহিষ্ণুতা আর হাল ছেড়ে না দিয়ে অহোরাত্র সজাগ থাকা সম্ভাবনা ও দশভাগের সাত ভাগ, সহজজ্ঞান অথবা দিব্যচক্ষেদর্শন–সম্ভাবনা : দশভাগের দু-ভাগ, ভাগ্য সুপ্রসন্ন হওয়া–সম্ভাবনা? দশ ভাগের এক ভাগ! ধীশক্তির তথাকথিত চমক লাগানো নিদর্শন চেয়ারে বসা গোয়েন্দা আর রহস্য উপন্যাস লিখিয়েদের জন্যে বাস্তব জীবনে আমাদের ক্ষেত্রে তার কোনও স্থান নেই।
স্কোয়াড্রা মোবাইল (নরহত্যা স্কোয়াড) হতভাগিনী মেয়েটার সনাক্ত করার প্রচেষ্টা শুরু করল। টুকরো টুকরো অংশে আবিষ্কৃত হয়েছিল তার দেহ। তাই বিভিন্ন সময়ে দেশের নানাস্থান থেকে যে কয়েকশো মেয়ে বেমালুম উবে গিয়েছিল, তাদের নামের তালিকা নিয়ে বসলেন তারা কোনও হদিশ পাওয়ার আশায়। কিন্তু বৃথাই, কোনও সূত্রই পাওয়া গেল না! রাশি রাশি টেলিগ্রাম টেলিপ্রিন্টার বার্তা ঘোষণা, বিজ্ঞপ্তি ইটালির পুলিশ স্টেশনগুলোয় পর পর এসে পৌঁছোতে লাগল–কিন্তু রহস্যের তিমিরে এতটুকু আলোকের সন্ধান পাওয়া গেল না।
এ ধরনের দৈহিক বর্ণনার মানুষ খোঁজার ব্যাপারে সুফল লাভ কেউই ঠেকিয়ে রাখতে পারে যদি জনসাধারণের সক্রিয় সহযোগিতা পাওয়া যায়। কিন্তু এই বিশেষ তদন্তটিতে স্কোয়াড্রা মোবাইলের এই জাতীয় সাহায্যের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল যে আদেশটি তা স্বয়ং মুসোলিনীর। তার নিষেধাজ্ঞা বেরিয়ে গিয়েছিল কোনও খবরের কাগজ এ-কেসের খুঁটিনাটি ছাপতে পারবে না। তদন্তের মোটামুটি যে বিবরণ পুলিশের তরফ থেকে ছাড়া হত কাগজে প্রকাশের জন্য তার দৈর্ঘ্য তিরিশ লাইনের ওদিকে যেত না। এ আদেশের কারণও দেখিয়ে ছিলেন মুসোলিনী। বলেছিলেন, ফ্যাসিস্ট ইটালিতে এরকম পিশাচের মতো খুন-খারাপি করাটাই নাকি একদম অসম্ভব। আর যদিও বা কেউ করে থাকে তবে তা নিয়ে যত অল্প কথা বলা যায় ততই মঙ্গল।
যাই হোক শেষ পর্যন্ত তদন্ত যখন ন যযৌ ন তস্থৌ অবস্থায় এসে দাঁড়াল, তখন দৈনিকগুলো একযোগে ইল দুচের নিষেধ-বিজ্ঞপ্তিতে আর কোনও গুরুত্ব না দিয়ে খুঁটিনাটি জনসাধারণে প্রকাশ করে দেওয়াই সঙ্গত মনে করলে। প্রথম পাতা জুড়ে ছবি বেরুল খণ্ডবিখণ্ড মেয়েটার।
আর ঠিক তখন থেকেই সত্যি সত্যিই রহস্যের তিমিরাবগুণ্ঠন উঠে যেতে লাগল আস্তে আস্তে। প্রথম ট্রেনের দুজন যাত্রী খবর দিল যে হৃষ্টপুষ্ট চেহারার মাঝবয়সি এক ভদ্রলোক তাদের কম্পার্টমেন্টে ঢুকেছিল। ভদ্রলোকের গোঁফের ডগা বেশ পাকানো এবং ছুঁচোলো। লাগেজ র্যাকে দুটো আঁশের তৈরি সুটকেস রেখে এক কোণে বসেছিল ভদ্রলোক। একচোট ঘুম দিয়ে উঠে দুজনে দেখলেন নেপলস্ যাওয়ার পথে রোমের মধ্যে ঢুকছে তাদের ট্রেন, ভদ্রলোক অদৃশ্য হয়েছে কামরার ভেতর থেকে, কিন্তু মালপত্র দুটি ফেলে গেছে তাকের ওপর।
সুটকেসের মালিকের এহেন দৈহিক বর্ণনা পাওয়া যাবার পর স্কোয়াড্রা মোবাইল ভদ্রলোকের খোঁজ পেল না স্পেজিয়াতে। এইখান থেকেই রোম আর নেপলস্ যাওয়ার এক্সপ্রেস ধরেছিল ভদ্রলোক। পিসা পর্যন্ত ট্রেনভ্রমণ করেছিল। রওনা হবার পর প্রথম স্টপ ওইখানেই পিসাতে ট্রেন থেকে নেমে ফিরতি ট্রেন ধরে সে ফিরে আসে লা স্পেজিয়াতে।
এই তথ্য জানার পরেই খুনটা এসে পড়ল আমারই অফিসের আওতায়। তার কারণ, ওই সময় লা স্পেজিয়া নরহত্যা স্কোয়াডের চিফ ছিলাম আমি। লা স্পেজিয়া একটা সদাব্যস্ত বন্দর। টাইরেনিয়ান উপকূলে তার অবস্থান। এতক্ষণ পর্যন্ত সমস্যাময় জটিল কেসটা আমাদের সবার আলোচনার খোরাক জোগালেও মূল রহস্যভেদের সবটুকু দায়িত্বই ছিল রোমের পুলিশের। কিন্তু এই নতুন আবিষ্কারের বৃত্তান্ত শুনলেই খুবই সম্ভব যে অনুমানটি সবার আগে মাথায় আসে তা হল এই যে খুনি এই লা স্পেজিয়া শহরে আমাদেরই মধ্যে থাকলেও থাকতে পারে–সেক্ষেত্রে তার সমুচিত দণ্ডবিধানের দায়িত্ব তো আমাদেরই। আমার ডিপার্টমেন্টে এমন লোক একটিও ছিল না যে ওই নররাক্ষসটার মণিবন্ধে লোহার গয়না পরিয়ে দেওয়ার আগ্রহকে ক্ষুরের মতো শাণিত করে রাখেনি। নির্দিষ্ট সময়ের চাইতেও আরও অনেক বেশি ঘণ্টা আমরা ব্যয় করতে লাগলাম হোটেলে হোটেলে এবং প্রতিটি বোর্ডিং হাউসের মালিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে। একমাত্র আশা, হয়তো গুরুত্বপূর্ণ কোনও তথ্য পাওয়া যাবে তাদের কাছ থেকে। বন্দর-অঞ্চলে আমাদের টিকটিকিরা অগুন্তি গণিকালয় আর পানাগারে তল্লাসি চালাল। কিন্তু কোথাও এতটুকু কানাঘুসোও শুনলাম না রাক্ষসটার সম্বন্ধে।
তার পরেই আচম্বিতে একদিন নীলাকাশ থেকে বাজ নেমে আসার মতো বিপুল সৌভাগ্য খসে পড়ল আমাদের তদন্ত-পর্বে। কি করে বরাত খুলল, সেই কথাই বলি এবার। তন্ন তন্ন করে তল্লাসি চালানোর পর যখন কোনওদিনই কোনও আলোর সন্ধান পেলাম না, তার দুদিন পর অফিসে বসে স্থানীয় খবরের কাগজটার পাতা ওলটাচ্ছি, এমন সময়ে নজরে পড়ল ছোট্ট একটা পরিচ্ছেদ। রেলওয়ে স্টেশনের কাছে রাবিশের স্তূপের ওপর একটা বড় সাইজের ছুরি পড়ে থাকতে দেখেছিল একটি অল্পবয়সি ছেলে। এ জাতীয় ছুরি রান্নাঘরের কাজেই লাগে। ছেলেটির মনে কোনও অসাধুতা ছিল না। তাই ছুরিটা পাওয়ামাত্রই সে জমা দিয়ে দেয় হারানো-প্রাপ্তি অফিসে।
