কয়েক বছরের মধ্যেই সম্পত্তির বাকিটুকু ঠুকে শেষ করে ফেললে সিজারে। কোনও কাজের শিক্ষা সে কোনওদিন পায়নি। পেশার কথা উঠতেই পারে না। কাজেই একটা মেয়েলোকের বাঁধা প্রেমিক হিসেবে শুরু হল তার নতুন জীবন। লা স্পেজিয়াতে মেয়েদের টুপি, জরি, পোশাকের বিরাট দোকান ছিল স্ত্রীলোকটার। নাম তার রোজ। সারভিয়াত্তির চাইতে বয়সে বছর দশেকের বড় সে। প্রথম কটা দিন ভালোই কাটল কপোত কপোতীর। তারপর শুরু হল ঝগড়াঝাটির পালা। সম্ভবত রোজ যত টাকা দিতে প্রস্তুত ছিল তার চাইতেও বেশি টাকার দাবি জানাত সিজারে–ঝগড়ার সূত্রপাত এইখান থেকেই। দোকানের কোনও কাজই হত না সিজারেকে দিয়ে ব্যবসার শ্রীবৃদ্ধি হওয়া তো দূরের কথা। ফলে, যতই দিন যেতে থাকে, ততই চোখমুখের চেহারার সজীবতা চনমনে খুশি-খুশি ভাব হারিয়ে ফেলতে থাকে রোজ।
এই কাহিনির উপসংহার ঘটল সেই দিনই যেদিন রোজ তার প্রেমাস্পদকে জানাল যে সে মা হতে চলেছে। কথাটা শুনে এমনিই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল সারভিয়াত্তি যে তখুনি আগুনের চুল্লী থেকে আগুন খোঁচাবার লোহার ডান্ডাটা তুলে নিয়ে উন্মাদের মতো রোজকে পিটিয়ে মেরে ফেলল। বাড়ির পেছনকার বাগানে লাশটা পুঁতে ফেলে কবরস্থানের ওপর সযত্নে পাথর-বাঁধানো একটা রাস্তা বানিয়ে রাখল।
একটা মুহূর্তের জন্যও উদ্বেগের ছায়ামাত্র দেখা যায়নি সারভিয়াত্তির মনে। রোজের প্রতিবেশীদের আর মক্কেলদের সে জানিয়ে দিলে যে রোমের শৌখিন মহলে একটা নতুন ব্যবসা ফেঁদেছে সিগনোরা। সিজারেকে এখানে রেখে গেছে সম্পত্তি উপযুক্ত দামে বেচে ফেলার জন্যে। লা স্পেজিয়ার এই কাজটুকু শেষ করেই সে রোজের কাছে চলে যাবে রোমে। মালপত্রসমেত দোকানটা জলের দামে বেচে দিল সে এবং বিক্রি করার অধিকার তার বাস্তবিকই আছে কিনা, এ প্রশ্নও কেউ তাকে জিগ্যেস করল না।
অতি সহজে লোক ঠকিয়ে নিজেকে সন্দেহমুক্ত রাখার এই ক্ষমতাই সারভিয়াত্তিকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে এক খুন থেকে আরেক খুনের দৃশ্যে। শেষকালে তার মুখোশ খুলে পড়ল মরণের সওদাগর হিসেবে। তার সমস্ত তৎপরতাকে সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলে একটা খবরের কাগজ মাত্র কয়েকটা শব্দের মধ্যে। ফ্যালো কড়ি মাখো তেল-এর পদ্ধতিতে খুন–মেয়েরা এনেছে অর্থ আর কাউন্ট সরিয়ে দিয়েছে তাদের দেহগুলো।–এই ছিল খবরে কাগজের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা। তার কবলে পড়ে কত মেয়ে যে প্রাণ হারিয়েছে, তার সঠিক হিসেব জানা যায়নি। শুধু এইটুকুই বলা চলে যে সারভিয়াত্তির সঙ্গে মোলাকাত হওয়ার পর বেমালুম অদৃশ্য হয়ে গেছে–এরকম মেয়ের সংখ্যা বড় কম নয়। সারভিয়াত্তি কিন্তু চিরকুমার থেকেছে সমস্ত জীবন–যেন দিনের পর দিন খুঁজে বেরিয়েছে তার উপযুক্ত গৃহিণীকে–এই রকম একটা ভাব দেখিয়েছে সে।
পর পর দুটি দিন বিভিন্ন ট্রেনে মালপত্রের সঙ্গে খণ্ড-বিখণ্ড লাশ আবিষ্কার হওয়ার পরেই সেই প্রথম পুলিশ জানতে পারে সমাজের মধ্যে নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছে একটা নররাক্ষস। ১৯৩২ সালের ১৬ই নভেম্বর টুরিন থেকে মর্নিং এক্সপ্রেস সবে এসে দাঁড়িয়েছে নেপলস্-এর বিশাল খিলেনওয়ালা স্টেশনে। দুজন রেলওয়ে পুলিশ (ফ্যাসিস্ট শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের অনতিকাল পরেই একটা বাহিনী সৃষ্টি করেছিলেন মুসোলিনী) করিডর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা সেকেন্ড ক্লাস কমপার্টমেন্টে দুটো বড় বড় সুটকেস দেখতে পেল। আঁশের তৈরি পেল্লায় সুটকে দুটো কে বা কারা ফেলে গিয়েছিল কামরার মধ্যে। সদ্যকেনা না হলেও খুব পুরোনো বলে মনে হল না সুটকেস দুটো। ওজনেও দারুণ ভারী। পুলিশ অফিসার দুজন সুটকেস দুটো নামিয়ে নিয়ে গিয়ে জমা দিয়ে দিলেন হারানো প্রাপ্তি অফিসে। একটা সুটকেসকে তাকের ওপর তুলে রাখার সময়ে খুট করে খুলে গেল তালাটা এবং সঙ্গে সঙ্গে ফাঁক দিয়ে গড়িয়ে পড়ল একটা মুন্ডু–মেয়েমানুষের মুন্ডু। পুরু বাদামি কাগজের লাইনিং দিয়ে মোড়া ছিল সুটকেসটা। গাঢ় লালচে রঙের কাঠের কুচো দিয়ে প্যাক করা ছিল ভেতরকার বস্তু। একজন অফিসার নিঃশব্দে তুলে ধরলে মুন্ডুটা। অপরজন চাড় দিয়ে দড়াম করে খুলে ফেলল দ্বিতীয় সুটকেস। ভেতর থেকে পাওয়া গেল–হতভাগিনীর হাত আর পা।
হাত-পা মুন্ডুবিহীন ধড়টা এসে পৌঁছোল পরের দিন ট্রেনে। লাস্পেজিয়া থেকে রোমে এসে পৌঁছোল যে ট্রেনটি, সেই ট্রেনেই এল এই ধড়টি। প্রথমবার যেভাবে পাওয়া গিয়েছিল সুটকেস দুটি, দ্বিতীয় আবিষ্কারটিও ঘটল ঠিক এ ভাবেই। সেকেন্ড ক্লাস কমপার্টমেন্টে একটা বড় সুটকেস খোলার পর ভেতর থেকে পাওয়া গেল উলঙ্গ ধড়টা। অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো যে একই দেহের, তা প্রমাণ করতে বিশেষ বেগ পেতে হল না ডাক্তারদের। হতভাগিনীর চেহারার মোটামুটি এবং বিশ্বাসযোগ্য একটা বিবরণও দিলেন তারা। বয়স তার তিরিশ। উচ্চতা মাঝামাঝি। লালচে বাদামি চেস্টনাট রঙের চুল আর চোখ। বাঁ-পা-টা সামান্য বেঁকা। অনেকরকম পুরোনো ক্ষতচিহ্নও ছিল সারা দেহে।
পেছন থেকে ছুরি মারা হয়েছিল মেয়েটিকে। ছুরি মারার সঙ্গে সঙ্গে মারা যায়নি বেচারি এবং যখন প্রমাণ পাওয়া গেল জীবন্ত অবস্থাতেই মেয়েটিকে টুকরো টুকরো করে কাটতে শুরু করেছিল খুনে জানোয়ারটা তখন এই বিভীষিকা উপাখ্যানের ওপর চড়ল আর এক পোঁচ বিভীষিকার রং।
