জিনিয়াস হলেও সৃষ্টিকর্মগুলো তো আসল নয়। কাজেই এমন জিনিস ফেরি করতে বেরিয়ে পরিণাম সম্বন্ধে সতর্ক হয়ে রইলেন ফাসোলি আর তার প্রবঞ্চক সতীর্থ। কোনও স্ট্যাচু সম্বন্ধে কোনও মিউজিয়াম সন্দিগ্ধ হয়ে উঠলেই সঙ্গে-সঙ্গে টাকা ফেরত দিয়েছেন দুজনে। এত সতর্কতা সত্ত্বেও ১৯২৮ সালে জব্বর দুটো ভুল করে ফেললেন ঠগযুগল। চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে ঠকাতে গেলেন ডোসেনাকে এবং নকলি স্ট্যাচুগুলো বিক্রি করতে গেলেন ফ্রিক কালেকশন অফ নিউইয়র্কে।
দুষ্প্রাপ্য সামগ্রীগুলো দেখে আকৃষ্ট হয়েও কিন্তু হুঁশিয়ার রইলেন মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ। টাকাকড়ি মিটিয়ে দেওয়ার আগে ঠিক করলেন নিজেদের এক্সপার্টদের পাঠাবেন ইটালিতে যাচাই করে নেওয়ার জন্যে। বড় অশুভ লগ্নে এসে পৌঁছল আমেরিকান বিশেষজ্ঞরা। আর একজন সাক্ষাৎ প্রার্থী এসে চমকপ্রদ একটা সমাচার দিয়ে গিয়েছিল ডোসেনাকে–তাঁর শিল্পসামগ্রী নাকি আসল রেনেসাঁ সামগ্রীরূপে প্রদর্শিত হচ্ছে বার্লিন মিউজিয়ামে।
আঁতকে উঠলেন ডোসেনা। সর্বনাশ! তাহলে তো দেখা যাচ্ছে তার সব শিল্পকর্ম অসৎ উদ্দেশ্যে কিনেছে তার এতদিনের দুই উপকারী দোস্ত। তিনি নিজেও তো এই প্রতারণার শরিক হয়ে পড়েছেন নিজের অজান্তেই! ভয়ের চোটে মামলা দায়ের করে বসলেন ডোসেনা।
খবরটা যাতে ফ্রিক প্রতিনিধিদের কানে না পৌঁছয়, সে চেষ্টার কসুর করেননি ফাসোনি আর প্যালেসি। কিন্তু অচিরেই চাঞ্চল্যকর খবরটা ছড়িয়ে পড়ল আটলান্টিকের দুই পারের দুই মহাদেশের সবকটা খবরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় বড়-বড় হেডলাইনের আকারে। হিসেব করে দেখা গেল, ডোসেনার জাল মাল বেচে ফাসোলি, প্যালেসি আর একটি বেনামী আন্তর্জাতিক ললিতকলার কোম্পানি পকেটস্থ করেছে প্রায় এক কোটি আশি লক্ষ টাকা! শুধু একটা খোদাই কর্মই বিক্রি হয়েছে এক কোটি পঁয়ত্রিশ লক্ষ টাকায়।
জোর তদন্ত চালালেন ইটালিয়ান গভর্নমেন্ট। প্রমাণ করে দিলেন তিপ্পান্ন বছর বয়স্ক ডোসেনার কোনও দোষই নেই। প্রবঞ্চক দুজনকে বাধ্য করলেন প্রতারিত ক্রেতাদের অন্তত কিছু টাকা ফিরিয়ে দিতে।
এত কাণ্ড হয়ে যাওয়ার পরেও রেনেসাঁ স্টাইল নিয়ে কাজ চালিয়ে গেলেন ডোসেনা– যা তার প্রাণ, যা তাঁর সাধনা–তা ছাড়েন কী করে? এই সাধনার মধ্যেই ছিলেন তিনি আমৃত্যু মারা যান সাত বছর পরে মৃত্যুর পরে কিন্তু একটা শ্লেষাত্মক উপসংহার গজিয়ে উঠল তার কাহিনিতে।
১৯৩৩-এর ৯ই মার্চ নিউইয়র্কের হোটেল প্লাজায় গ্র্যান্ড বলরুমে অ্যালসিও ডোসেনার অনুপম ললিতকলার ৩৯টি সংগ্রহ নিলেম করে বিক্রি করে দেয় ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি। একটির পেছনে সবচেয়ে বেশি দাম ওঠে মাত্র ৬২৭৫ টাকা। পুরো সংগ্রহটি বিক্রি হয় ৮২,১২৫ টাকায়। প্রতি ক্রেতাকে একটা রুচিসুন্দর প্রশংসিকা অর্পণ করেন ইটালিয়ান গভর্নমেন্ট। ভাবগম্ভীর ভাষায় তাতে গ্যারান্টি দিয়েছিলেন সরকার–প্রতিটি শিল্পসামগ্রী আসল নকল!
কে জানে, শিবপুরম নটরাজনের জালিয়াত ভাস্কর ডোসেনাকেই গুরু বলে মেনে নিয়েছিলেন কিনা!
* ক্রাইম পত্রিকায় প্রকাশিত।
মেয়ে খুনে কাউন্ট সারভিয়াত্তি
যখনই নতুন কোনও খুনের তদন্তে তলব পড়ে আমার ডিপার্টমেন্টের, তখনই আপনা হতেই আমার ভাবনার পটে ভেসে ওঠে এ শতাব্দীর সবচেয়ে কুখ্যাত খুনে–কাউন্ট সিজারে সারভিয়াত্তির উপাখ্যান। আর বাস্তবিকই, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।
অপরাধ-তদন্ত নিয়ে যারা দিনরাত মাথা ঘামায়, তাদেরকে হামেশাই যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়, তার প্রতিটাই ছিল কাউন্ট সারভিয়াত্তির কেসে। কিন্তু মাদকদ্রব্যর বেআইনী আমদানির নতুন নতুন ঝামেলায় অথবা অতিদুত্থাপ্য ডাকটিকিটের অতি-চমৎকার জালিয়াতির খবর পেয়ে অনামী কারিগরকে বার করার কাজে আমাকে যতখানি বেগ পেতে হয়, কাউন্টের কেস হাতে অবশ্য তার চেয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হয়নি।
সারভিয়াত্তির শিকার ছিল মেয়েরা। কৌশলে মুঠোর মধ্যে এনে মেয়েগুলোকে খুন করত ও। এবং করত শুধু টাকার জন্যে। তারপর লাশগুলো এমনভাবে টুকরো টুকরো করে কাটত যেন পাকা কশাই সে। আর বাস্তবিকই সে তাই ছিল। ওর কপাল মন্দ। তাই কলঙ্কিত রক্ত নিয়েই ওর জন্ম। ওর বাবা ছিলেন ইটালিয়ান আর্মির ক্যাপ্টেন। পয়লা নম্বরের উচ্চুঙ্খল। বুদ্ধিজীবী মহলে তাঁর আত্মম্ভরিতারও সীমা-পরিসীমা ছিল না। ভদ্রলোক যখন ওপারের পথে রওনা হলেন সিজারের বয়স তখন মাত্র চোদ্দো। বাবার কাছে সে উত্তরাধিকারসূত্রে পেল ছোটখাটো একটা ঐশ্বর্য, শিল্পকলার প্রতি প্রীতি আর একটা অতি-দুষ্ট দর্শন-বাদ।
এক বছর আগে ছেলেকে গণিকালয়ে নিয়ে গিয়ে তত্ত্বকথা শুনিয়েছিলেন ভদ্রলোক–মেয়েদের অস্তিত্ব শুধু আমাদের আনন্দ দেওয়ার জন্যে। তোমার সুখ-সুবিধার জন্যেই ওরা এসেছে এই দুনিয়ায় এবং এটুকু বাদ দিলে নিরেট মাথা শুয়োর ছাড়া আর কিছুই নয়।
দুর্ভাগ্যক্রমে, যে ধরনের মহিলারা এই জঘন্য উপদেশ যে নিতান্তই অসার, তা প্রমাণ করে ছেলের স্নেহ-ভালোবাসা অর্জন করার চেষ্টা করতেন–ওর মা ঠিক এই ধরনের মহিলা ছিলেন না। অতি সাধারণ শ্রেণির জীব ছিলেন এই ভদ্রমহিলা। ঘন ঘন সুরাপান ছিল তাঁর প্রিয় নেশা। উৎকৃষ্ট আসবাব আর দুষ্প্রাপ্য সুরা ছাড়া অন্যকিছুর ভক্ত ছিলেন না তিনি। আরথ্রাইটিসে ভোগার ফলে মেজাজটা হয়ে গিয়েছিল বেজায় খিটখিটে। অহোরাত্র সুরাপাত্র কানায় কানায় টলটলে মদিরায় ভরিয়ে রাখার জন্য পতিদেবতার অতি কষ্টে সংগৃহীত মূল্যবান সম্পদগুলো একে একে বিক্রি করে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করলেন না তিনি। তারপর তিনিও যখন ইহলোকের ধুলো ঝেড়ে পরলোকে গেলেন, তখন সিজারের বয়স মাত্র আঠারো। মায়ের সঙ্গে থেকে চিরতরে মুক্তি পাওয়ায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচল ও।
